রুবেল-বরকতের সম্পদের হিসাব দিলো পরিবার

আপডেট : ১১ মার্চ ২০২১, ০১:৫৮

ফরিদপুর প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি ইমতিয়াজ হাসান রুবেল ও ফরিদপুর শহর আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদ হোসেন বরকতের সম্পদের হিসাব দিয়েছে তাদের পরিবার। রুবেলের মেয়ে জাওয়াতা আফনান রাদিয়া এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য তুলে ধরেন।

ফরিদপুরের আলোচিত দুই ভাই রুবেল ও বরকতের নামে সম্পদ জব্দের হিসাবের যে বিবরণ (৫৭০৬ বিঘা জমি, ১৮৮টি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট এবং বাস, ট্রাক ও প্রাইভেট কার ৫৫টি গাড়ি) বিভিন্ন গণমাধ্যমে এসেছে তা ভুল বলে দাবি করেন রাদিয়া। তিনি বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করেন, ‘আমার বাবা ও চাচার নামে জমির পরিমাণ প্রকৃতপক্ষে হবে ১২.৫০০০ একর। কিন্তু দুদক যখন এসিল্যান্ড অফিসে জমির পরিমাণ চেয়েছিল তখন তাদের পাঠানো চিঠিতে জমির পরিমাণ ভুলে ১২৫০০০ একর উল্লেখ করা হয়। পরবর্তী সময়ে আমার বাবা জেলা প্রশাসকের কাছে এ বিষয়ে চিঠি দিয়েছিলেন।’

 

রাদিয়া আরো বলেন, ‘আমার বাবা ২০০০ সাল থেকে সরকারি ঠিকাদারি ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। ফরিদপুর থেকে তিনবার সেরা করদাতা নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। তার নামে থাকা জমির পরিমাণ ১৫৯ বিঘা, এর মধ্যে ৩০ বিঘা চরাঞ্চলে। চরে জমিপ্রতি বিঘা মূল্য ২০০০০-২৫০০০ টাকা। তার প্রতিষ্ঠানের তিনটি ড্রাম ট্রাক ও দুটি জিপ গাড়ি রয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক কাজে ব্যবহারের জন্য পে-লোডার ও রোলার এবং পুরনো দুটি পানির গাড়ি আছে। ঢাকায় কোনো ফ্ল্যাট বা জমি নেই তার। এমনকি ফরিদপুর মূল শহরে কোনো বাড়ি বা ফ্ল্যাট নেই। আমরা দাদার পৈতৃক ভিটায় থাকি।’

চাচা বরকত প্রসঙ্গে রাদিয়ার ভাষ্য, ‘আমার চাচা সাজ্জাদ হোসেন বরকতের নামে ২০০ বিঘা জমি আছে। চরাঞ্চলে ৪০০ বিঘা জমিতে নির্মিত একটি অ্যাগ্রো ফার্ম আছে। চরের জমি বিক্রি করলে ১ কোটি থেকে ১ কোটি ৭ লাখ টাকা পাওয়া যেতে পারে। চাচার নিজের নামে ১০টি টাটা বাস এবং লিজিং কোম্পানির নামে ১০টি বাস রয়েছে। এছাড়া ৫-৭টি ড্রাম ট্রাক আছে। ঢাকায় কোনো ফ্ল্যাট নেই তার। পৈতৃক বাড়িতে থাকেন তিনি। ক্রয়কৃত জমিতে কিছু সেমি পাকা দোকান রয়েছে। ফরিদপুর থেকে দুইবার সেরা করদাতা নির্বাচিত হয়েছেন তিনি।’

 

রুবেল ও বরকতের বিরুদ্ধে সিআইডির পরিদর্শক এস এম মিরাজ আল মাহমুদ বাদী হয়ে গত বছরের ২৬ জুন ঢাকার কাফরুল থানায় অর্থপাচারের অভিযোগে মামলা করেন। মামলায় দুই ভাইয়ের বিরুদ্ধে দুই হাজার কোটি টাকার সম্পদ অবৈধ উপায়ে উপার্জন ও পাচারের অভিযোগ আনা হয়। ২০১২ সালের মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন সংশোধনী-২০১৫-এর ৪ (২) ধারায় মামলাটি করা হয়।

মামলাটির কিছু বিষয়ে অসঙ্গতি রয়েছে জানিয়ে রাদিয়া বলেন, ‘একই কারণে সিআইডি করলো ২০০০ কোটি টাকার মামলা আর দুদক করলো ৭২ কোটি টাকার মামলা। গত বছরের ৭ জুন গ্রেফতারের পর পুলিশ সুপার প্রেস ব্রিফিংয়ে বললো বদরপুর থেকে তাদের গ্রেফতার করা হয়েছে যা ৯ জুন সব পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। অথচ অস্ত্রসহ সব মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, বাইপাস থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে তাদের।’

রাদিয়ার মন্তব্য, ‘২০০০ কোটি টাকার মামলাকে অতিরঞ্জিত করা হচ্ছে। মামলায় বলা হয়েছে, আব্বু ও চাচার কাছ থেকে ৩৭৫ কোটি ৬০ লাখ টাকার বৈধ উৎস পাওয়া গেছে। এটাও সম্পূর্ণ ভুল। আব্বু ও চাচার সম্পত্তি মিলে প্রায় ১০০ কোটি টাকা পাওয়া যাবে। এর বেশি না।’

 

মামলার এজাহারে বলা হয়, ২০১০ সাল থেকে ফরিদপুরের এলজিইডি, বিআরটিএ, সড়ক বিভাগসহ বিভিন্ন সরকারি বিভাগের ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণ করে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদের মালিক হয়েছেন বরকত ও রুবেল। এছাড়া তাদের বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসা ও ভূমি দখলের অভিযোগ আনা হয় এজাহারে। এভাবে উপার্জিত অবৈধ অর্থ দিয়ে এসি, নন-এসিসহ ২৩টি বাস, ড্রাম ট্রাক, বোল্ডার, পাজেরো গাড়ির মালিক হয়েছেন তারা। নিজেদের টাকার উল্লেখযোগ্য অংশ হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে পাচার করেন তারা।

এজাহারে আরও বলা হয়, একসময় এই দুই ভাই রাজবাড়ী রাস্তার মোড়ে একজন বিএনপি নেতার কর্মী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তখন তাদের সম্পদ বলতে তেমন কিছু ছিল না।

রাদিয়ার কথায়, ‘আমার চাচা ও বাবা দুইজন সম্পূর্ণ আলাদা ব্যবসা করেন। চাচা রাজনীতি করলেও আমার বাবা সেভাবে রাজনীতির সঙ্গে জড়িত নন এবং তার কোনো পদ-পদবী নেই। বাবা ও চাচাকে হাইব্রিড নেতা বলা হয় এবং তারা নাকি বিএনপির এক নেতার সহযোগী ছিলো। কিন্তু কেউ কি বলতে পেরেছে যে, বিএনপির কোনো মিটিং-মিছিলে বা পদে আমার বাবা ও চাচা ছিলেন? এরপরও তাদের হাইব্রিড বললে কিছু বলার নেই। বাদশাহ মণ্ডল নামে বাবার কোনো আপন চাচা নেই এবং আবুল কালাম আজাদ ওরফে বাচ্চু রাজাকার নামে আমাদের কোনো আত্মীয় নেই।’

গত বছরের ১৬ মে রাতে ফরিদপুর শহরের গোয়ালচামট মহল্লার মোল্লা বাড়ি সড়কে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সুবল চন্দ্র সাহার বাড়িতে দুই দফা হামলা হয়।  এ ঘটনায় তিনি অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে ফরিদপুর কোতয়ালী থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে শহরের বদরপুরসহ বিভিন্ন মহল্লায় অভিযান চালিয়ে বরকত ও রুবেলসহ মোট ৯ জনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তাদের বাড়ি তল্লাশি করে বিদেশি অস্ত্র, গুলি, বিদেশি মদ, ইয়াবা, ডলার, রুপি ও নগদ ২৯ লাখ টাকা এবং ১২০০ বস্তা চাল জব্দ করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।

রাদিয়ার অভিযোগ, ‘আমাদের বাসা ও অফিসে অভিযানের সময় কোনো সাংবাদিক বা ম্যাজিস্ট্রেটকে উপস্থিত না রেখে নিজেদের ইচ্ছামতো জব্দ তালিকা তৈরি করে মদ ও ইয়াবা দিয়ে মামলা সাজানো হয়েছে। আমাদের বাসা ও অফিসে তল্লাশির নামে পুলিশ যে তাণ্ডব চালিয়েছে তা খুবই দুঃখজনক।’

পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এ বছরের ২৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকার মহানগর দায়রা জজ কে এম ইমরুল কায়েস অর্থপাচার মামলায় বরকত ও রুবেলের ৫ হাজার ৭০৬ বিঘা জমি ক্রোকের আদেশ দেন। এছাড়া বরকত-রুবেলসহ পাঁচজনের ৮৮টি ব্যাংক হিসাব ক্রোক করার আদেশ দিয়েছেন আদালত। একইসঙ্গে তাদের ব্যাংক হিসাবে থাকা প্রায় ১০ কোটি টাকা এবং তাদের মালিকানাধীন ৫৫টি বাস, ট্রাক ও ব্যক্তিগত গাড়ি ক্রোক করার আদেশ দেন আদালত।

 

ইত্তেফাক/জেএইচ