পুরান ঢাকার ঐতিহাসিক বাহাদুর শাহ পার্ক। এলাকাবাসী ও আশপাশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের বিনোদনের একমাত্র খোলা জায়গা। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত বিশ্রাম, ব্যায়াম, আড্ডাস্থল। এই পার্কই আবার মাদকসেবীদের নিরাপদ আশ্রয়। দিন ও রাতে প্রকাশ্যে গাঁজা, ইয়াবা, ড্যান্ডিসহ নানা ধরনের মাদকদ্রব্য সেবন চলে হরদম। আট থেকে আঠারো বছরের নিচের শিশুকিশোররাই মাদকে বেশি আক্রান্ত। মাদকসেবী শিশুকিশোররা জানায়, তাদের অনেকের বাবা-মা নেই। অনেকের বাবা-মা থাকলেও তারা খোঁজখবর নেয় না।
এ সুযোগে একটি চক্র জোর করে তাদের ভিক্ষাবৃত্তি ও চুরির জন্য বাধ্য করে। ভিক্ষা ও চুরি না করলে তাদের ওপর নেমে আসে নির্যাতনের খড়গ। মানসিক ভারসাম্যহীন ও অক্ষম করতে তাদের ড্যান্ডির নেশায় আসক্ত করা হয়। বাহাদুর শাহ্ পার্কে ২০-২৫ জন শিশুকিশোর নিয়মিত আড্ডা দেয়। তাদের মধ্যে মেয়েও কয়েক জন। অধিকাংশের হাতে পলিথিন ব্যাগ। তার মধ্যে হলুদ রঙের এক ধরনের বস্তু। খানিক পর পর ব্যাগের মুখে মুখ লাগিয়ে দীর্ঘ শ্বাস নেয় তারা । তাদের ভাষায় এটা আঠা বা ড্যান্ডি। যা এক ধরনের গ্লু-গাম বা আঠা জাতীয় উদ্বায়ী পদার্থ। সাধারণ তাপমাত্রায় সহজেই এটি বাষ্পে পরিণত হয়। এর রাসায়নিক ক্রিয়া মস্তিষ্কে আঘাত হানে। আর এতে শরীরে ঝিমঝিম অনুভূতি সৃষ্টি করে। আর এভাবেই আঠা নেশায় আসক্ত হয়ে পড়ে তারা।
১৪ বছর বয়সি হূদয় জানায়, বাবা মারা যাওয়ায় মা আরেক বিয়ে করেছেন। থাকেন মোহাম্মদপুরে। ছোট আরেকটি ভাই আছে। মা যেতে বললেও সত্ বাবার কারণে সে বাসায় যায় না। আগে চুরি করত। চুরি বাদ দিতে চায় সে। কিন্তু তা বাদ দেওয়ায় কেরানীগঞ্জের মামুন নামে এক যুবক তার পায়ুপথে ও শরীরের বিভিন্ন জায়গায় ছুরিকাঘাত করে। তাকে জোর করে মহিলাদের ব্যাগ থেকে চুরি করানো হয়। চুরি না করলে আঙুল কেটে নেওয়া বা মেরে ফেলার হুমকি দেয় সে।
মাদক সেবনের কারণ তারা জানে না। তবে তাদের নাকি জোর করে একটি চক্র ড্যান্ডি খাওয়ানো শিখিয়েছে। ১১ বছর বয়সি সজিবরা পাঁচ ভাই বোন। বাবা ফরিদপুরে সিএনজি অটোরিকশা চালায়। মা মিরপুরে বাকি ভাই বোনদের নিয়ে থাকেন। সে বাহাদুর শাহ পার্কে থাকে। ভিক্ষা করে খায়। পাশে নজরদারির উদ্দেশ্যে শাকিল নামে এক তরুণ। সেই তাদেরকে চুরি করতে বাধ্য করায়। রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় টার্গেট দেখিয়ে দিয়ে সে দূরে দাঁড়িয়ে থাকে। সজল (৯) গুলিস্তানের এক মাদ্রাসায় পড়ে। বাহাদুর শাহ পার্কের একটি চক্র তাকে ভুলিয়ে ভালিয়ে সেখান থেকে নিয়ে আসে। তাকে প্রথমে ড্যান্ডি খাওয়ানো শেখায়। এরপর তাকে দিয়ে ভিক্ষাবৃত্তি ও চুরি করানো হয়। ভিক্ষাবৃত্তিতে কম টাকা পেলে তাকে মারধর করা হয়।
আজাদ সিনেমা হলের সামনে থেকে তাকে চক্রটি তাদের কব্জায় নিতে চাইলে সে মারধরের ভয়ে কান্নাকাটি করে। এ সময় আশপাশের লোকজন এগিয়ে আসলে সে শুধু তার মায়ের নাম শিউলি বলতে পারে। পুলিশকে খবর দিলে তারা তাকে নিয়ে যায়। অমিত (১৫) তিন ভাইয়ের মেঝ। বড় ভাই একটি সরকারি হাসপাতালে কাজ করে। সেও মাঝে মধ্যে সেখানে যায়। ড্যান্ডির ডিব্বা নিয়ে বসে থাকা এ কিশোর জানায়, ডিব্বা খুললেই এখনই শেষ হয়ে যাবে। সবাই আকাশে উড়বে। চাঁদ-তারার সঙ্গে খেলা করবে তারা। মাদকাসক্ত এ শিশুকিশোররা জানায়, ড্যান্ডি ছাড়াও গাঁজা, কেউ কেউ ইয়াবাও সেবন করে। শিশু কিশোর ছাড়াও যুবক ও মধ্যবয়সি মাদকসেবীদের ভিড় থাকে পার্কে।
জানা গেছে, পার্কে অবস্থানরত কয়েক জন মহিলা ও কেরানীগঞ্জের একটি চক্র এ শিশুকিশোরদের জোর করে মাদক সেবন ও চুরি করিয়ে থাকে। বাহাদুর শাহ পার্কের কর্তব্যরত পুলিশ সদস্যরা জানান, পার্কে সব সময় এ পথশিশুরা থাকে। তাদের পুনর্বাসনকেন্দ্রে পাঠানো হলেও তারা আবার ফিরে আসে। তাদের বিভিন্ন উপায়ে তারা মাদকের পথ থেকে ফেরানোর চেষ্টা করেন তারা। কিন্তু তা সম্ভব হয় না।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ও লাইফ অ্যান্ড আর্থ সাইন্সের সাবেক ডিন অধ্যাপক ড. কাজী সাইফুদ্দিন বলেন, সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন এ পথশিশুরা সামাজিক ও অপরাধমূলক আচরণের পার্থক্য বোঝে না। তারা মাদক সেবন ও চুরিকে অপরাধ হিসাবে মনে করে না। আর সব সময়ের জন্য মাদক সেবনের কারণে তারা মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন। তারা ছোটখাট চুরির মতো অপরাধ করতে করতে বড় অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। পরবর্তীতে তারা বড় সন্ত্রাসীতে পরিণত হয়। অনেক রাজনৈতিক দলের হাতিয়ার হিসাবেও ব্যবহার হয় তারা। লালবাগ জোনের এডিসি হাফিজ আল আসাদ বলেন, পথশিশুদের নিয়ে মূলত কাজ করে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়। তবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনায় পুনর্বাসনের জন্য পথশিশুদের তথ্য সংগ্রহ করেছেন তারা।
