পবিত্র মিরাজের তাত্পর্য ও শিক্ষা

আপডেট : ১১ মার্চ ২০২১, ২১:৩৪

নবুওয়াতকে শক্তিশালী করার জন্য অন্য নবি-রসুলদের মতো মহানবী (স)কেও দেওয়া হয়েছে অগণিত মুজিজা। তন্মধ্যে মিরাজ অন্যতম। হিজরতের প্রাক্কালে ৬২০ খ্রিষ্টাব্দের ২৬ রজব দিবাগত রাতে নবিজি আল্লাহপ্রদত্ত বাহনে চড়ে মিরাজ গমনের মাধ্যমে মহান আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ করেন। প্রত্যক্ষ করেন সপ্তাকাশ, বেহেশ্ত, দোযখসহ আল্লাহর সৃষ্টিরহস্য।

মিরাজের এই ঘটনা নবি করিম (স)-এর জীবনে সংঘটিত হয়েছিল যে সময়টি ছিল তার জীবনের সবচেয়ে দুর্যোগময় মুহূর্ত। কুরাইশরা তাকে ও তার অনুসারীদেরকে সামাজিকভাবে বয়কট, প্রিয় সহধর্মিণী খাদিজাতুল কুবরা (রাযি) ও একমাত্র অভিভাবক চাচা আবু তালিবের ইন্তেকাল, তায়েফবাসীর লাঞ্ছনা এসব কিছু নবিজিকে মানসিকভাবে মর্মাহত করে তুলেছিল। আর এ সময়েই বন্ধুর সান্ত্বনার জন্য মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে আমন্ত্রণ এসেছিল সাক্ষাতের।

মিরাজের ঘটনা কুরআনুল কারিমে সংক্ষিপ্ত ও আংশিকভাবে এসেছে। তবে বিস্তারিত ঘটনা বেশ কিছু সহীহ্ হাদিসে উল্লেখ করা হয়েছে। মক্কা শরীফের মাসজিদুল হারাম থেকে ফিলিস্তিনের মাসজিদুল আকসা পর্যন্ত ভ্রমণকে কুরআনে ‘ইসরা’ বা রাত্রিকালীন ভ্রমণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সুরা বনী ইসরায়ীলের প্রথম আয়াতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআলা ইরশাদ ফারমান—‘পবিত্র ও মহিমাময় তিনি, যিনি তার বান্দা (মুহাম্মদ) কে রজনীর একাংশে ভ্রমণ করিয়েছেন মাসজিদুল হারাম থেকে মাসজিদুল আকসা পর্যন্ত। যার পরিবেশকে আমি করেছিলাম বরকতময়। তাকে আমার নিদর্শন দেখাবার জন্যে। নিশ্চয় তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।’

এখানে ‘আসরা’ বলে যে শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে তার উত্পত্তি ‘ইসরা’ শব্দ থেকে। আভিধানিক অর্থে ‘ইসরা’ বলা হয়—রাতের ভ্রমণকে। শরীয়তের পরিভাষায়— রাতের কোনো এক অংশে মহানবি (স) জান্নাতী বাহন বোরাকে চড়ে মাসজিদুল হারাম থেকে মাসজিদুল আকসা পর্যন্ত যে ভ্রমণ করেছিলেন তাকে ‘ইসরা’ বলা হয়। ‘মিরাজ’ শব্দটিও আরবি। এ শব্দটির উত্পত্তি হয়েছে ‘উরজুন’ শব্দ থেকে। আভিধানিক অর্থ হচ্ছে—সিঁড়ি বা সোপান। শরীয়তের পরিভাষায়-মাসজিদুল আকসা থেকে সপ্ত আসমান ও তদূর্ধ্বে মহানবি (স) সশরীরে জাগ্রতাবস্থায় যে ভ্রমণ করেছিলেন সে সফরকে ‘মিরাজ’ বলা হয়।

মিরাজের ঘটনা সম্পর্কে আল-কোরআনের সুরা নজমের ১৩-১৮ আয়াত পর্যন্ত ইরশাদ হয়েছে—‘নিশ্চয় সে তাকে আরেক বার দেখেছিল সিদরাতুল মুনতাহার নিকটে; যার কাছে অবস্থিত রয়েছে বসবাসের জান্নাত। যখন বৃক্ষটি যা দ্বারা আচ্ছন্ন হওয়ার তদ্বারা আচ্ছন্ন ছিল। তার দৃষ্টি বিভ্রম হয়নি এবং সীমালঙ্ঘনও করেনি। নিশ্চয় সে তার পালনকর্তার মহান নিদর্শনাবলি অবলোকন করেছে।’ কোরআনুল কারিমে মহানবি (স) এর মিরাজ সম্পর্কে এতটুকুই উল্লেখ করা হয়েছে। তবে বুখারী, মুসলিমসহ অসংখ্য সহীহ্ হাদিসে ইসরা ও মিরাজের দীর্ঘ বর্ণনা এসেছে।

মহানবি (স)-এর মিরাজ হয়েছে সশরীরে। তার দেহ ও আত্তা উভয়ই মিরাজে গমন করেছে। হযরত আনাস (রা) সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন নবিপাক (স) মিরাজের ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন—আমি একবার কাবাঘরের নিকট ঘুমন্ত ও জাগ্রত অবস্থার মাঝামাঝি অবস্থায় ছিলাম। এমন সময় হিকমত তথা জ্ঞান ও ইমানে পরিপূর্ণ একটি স্বর্ণের পাত্র আনা হলো। আমার বক্ষ ফেঁড়ে যমযমের পানি দ্বারা ধৌত করে তা ইমান ও হিকমতের মাধ্যমে পরিপূর্ণ করে দেওয়া হলো। তারপর আমার নিকট জান্নাতি বাহন বোরাক পেশ করা হলো। আমি বোরাকে চড়ে প্রথমে বায়তুল মুকাদ্দাসে গেলাম। জিবরাইল (আ) আমার সঙ্গেই ছিলেন। মসজিদের দরজার কড়ার সঙ্গে বোরাক বেঁধে রাখা হলো। আমি সেখানে নবিদের ইমাম হয়ে দুই রাকায়াত নামাজ পড়ালাম। এরপর জিবরাইল (আ) সিঁড়ির মাধ্যমে ঊর্ধ্বাকাশে ভ্রমণ আরম্ভ করলেন। নবি করিম (স) বলেন, আমি যখন দুনিয়ার আকাশের নিকটবর্তী হলাম প্রথম আসমানের দরজার নিকট পৌঁছতেই ওপর থেকে আমাদের পরিচয় জানতে চেয়ে জিগ্যেস করা হলো—কে এসেছেন? জিবরাইল বললেন, আমি জিবরাইল। আবার জানতে চাওয়া হলো—আপনার সঙ্গে কে এসেছেন? উত্তরে জিবরাইল বললেন, আমার সঙ্গে মুহাম্মদ (স) এসেছেন। বলা হলো—ওনাকে কি আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। আসমানের ফেরেশ্তারা বললেন, স্বাগতম, শুভ হোক তার আগমন। নবিজি বলেন, প্রথম আসমানে আমি আদম (আ)-এর সঙ্গে সাক্ষাত্ করে তাকে সালাম দিলাম। তিনি আমাকে স্বাগত জানিয়ে বললেন, আমার গর্বিত সন্তান ও নবির আগমন শুভ হোক। দ্বিতীয় আসমানে যাওয়ার সময় আমাদের একই প্রশ্ন করা হলো। সেখানে গিয়ে আমি ইসা এবং ইয়াহইয়া (আ)-এর সাক্ষাত্ পেলাম। উভয়ে আমাকে সাদর সম্ভাষণ জানালেন। তৃতীয় আসমানে ইউসুফ (আ)-এর দেখা পেলাম। তিনি আমাকে স্বাগত জানিয়ে বললেন, আমার ভাই ও নবির আগমন শুভ হোক। এমনিভাবে চতুর্থ আসমানে ইদ্রিস (আ), পঞ্চম আসমানে গিয়ে হারুন (আ), ষষ্ঠ আসমানে মুসা (আ)-এর সাক্ষাত্ পেলাম। পরিশেষে সপ্ত আসমানে ইবরাহিম (আ)-এর সঙ্গে আমার দেখা হলো। তাকে সালাম জানালে তিনি বললেন, আমার সন্তান ও নবিকে স্বাগতম। সাত আসমান সাক্ষাত্ শেষে নবিজি জিবরাইল (আ)-এর সঙ্গে পৌঁছলেন ‘সিদরাতুল মুনতাহায়’। সিদরাতুল মুনতাহা হচ্ছে পৃথিবীর ঊর্ধ্ব জগতের শেষ সীমা। এর ওপরে মহান আল্লাহর আরশ। এই সফরে নবিজিকে জান্নাত-জাহান্নামের দৃশ্য দেখানো হয়েছে। ফেরেশ্তাদের ইবাদতের জন্য নির্মিত ‘বাইতুল মামুরের’ দৃশ্যও দেখানো হয়েছে। সিদরাতুল মুনতাহায় গিয়ে জিবরাইল (আ) বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! এই জায়গাটি হচ্ছে আমার বিচরণের শেষ সীমানা; এর ওপরে আমার যাবার অনুমতি নেই—আপনাকে একাই যেতে হবে। নবিজির জন্য ‘রফরফ’ নামক এক বিশেষ বাহন সেখানে প্রস্তুত রাখা হয়েছিল, তাতে করে নবিজি আল্লাহর আরশে পৌঁছলেন। সেখানে আল্লাহর সঙ্গে তার দিদার হয়, সরাসরি কথা হয়। প্রভুর এই সাক্ষাতে উম্মতের জন্য নবিজিকে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ হাদিয়া স্বরূপ দেওয়া হয় এবং ভবিষ্যতের কর্মপরিকল্পনা হিসেবে প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনাও দেওয়া হয়।

পবিত্র মিরাজ আমাদেরকে মহান আল্লাহর অপার মহিমা ও কুদরতের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। মিরাজ রাসুলুল্লাহ (স)-এর শ্রেষ্ঠত্ব ও উচ্চতম মর্যাদার সাক্ষ্য বহন করে। মিরাজে গিয়ে নবি করিম (স) আমাদের কল্যাণের কথা ভেবেছেন। নবিজির এই উদারতা আমাদেরকে তার ভালোবাসায় উজ্জীবিত করে। মিরাজ মহাকাশ গবেষণায় এক নবদিগন্ত উন্মোচিত করে। মিরাজের সর্বোত্কৃষ্ট দান হলো পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ। নামাজের মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর নৈকট্য লাভ করে। নামাজের মাধ্যমেই চরিত্র সংশোধিত হয় এবং যথাযথভাবে নামাজ কায়েমের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী ইসলামি সমাজের ভিত্তি রচিত হয়। তাই নামাজের ব্যাপারে সব গাফলতি ঝেড়ে ফেলে নামাজে নিষ্ঠাবান হওয়া মিরাজের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। নবিজির জীবনে মিরাজ সংগঠিত হওয়ার পরে সুরা বনি ইসরাইল নাজিল হয়। এ সুরার তৃতীয় ও চতুর্থ রুকুতে অনেকগুলো নীতিমালা নির্দেশ আকারে পেশ করা হয়েছে। এ নির্দেশগুলোই মিরাজের শিক্ষা। সুন্দর সুশৃঙ্খল সমাজ বিনির্মাণে সেই নির্দেশনাগুলো হচ্ছে—. আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক না করা, ২. পিতামাতার সঙ্গে সদাচরণ করা, ৩. আত্মীয়স্বজন, অভাবী অসহায় মানুষের সেবা করা, ৪. অপচয়-অপব্যয় ও অসত্ পথে ব্যয় না করা, ৫. কৃপণতা পরিহার করা, ৬. ব্যভিচার ও অশ্লিল কাজের কাছেও না যাওয়া, ৭. অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা না করা, ৮. এতিমের সম্পদ আত্মসাত্ না করা, ৯. প্রতিশ্রুতি ও ওয়াদা পালন করা, ১০. ওজনে কম না দেওয়া, ১১. যে বিষয়ের জ্ঞান নেই সে সম্পর্কে কিছু না বলা। আল্লাহ আমাদেরকে মিরাজের শিক্ষা বাস্তবায়নের তাওফিক দান করুন। আমিন!

l লেখক :আজিমপুর দায়রা শরীফের বর্তমান সাজ্জাদানশীন পীর ও মুতাওয়াল্লী