নারীর ক্ষমতায়নে এক মহীয়সী নারীর প্রেরণা

আপডেট : ১১ মার্চ ২০২১, ২১:৩৬

সব সীমাবদ্ধতার ঊর্ধ্বে উঠে কেবল মুমিনাগণ নয় বরং সমগ্র বিশ্বের নারীসমাজ যার থেকে নারীর ক্ষমতায়ন, অধিকার এবং ব্যক্তিত্ব নিয়ে চলার প্রেরণা পান তিনি হলেন উম্মুল মুমিনিন খাদিজাতুল কুবরা (রা)। তিনি অন্যতম শ্রেষ্ঠ মডেল নারী, যার কাছে নারীর উন্নয়ন, অধিকার, সামাজিক মর্যাদা অনেকাংশে ঋণী। তত্কালীন আরবের অপ্রতিদ্বন্দ্বী শ্রেষ্ঠ ব্যবসায়ী, শ্রেষ্ঠ বংশের প্রতিনিধিত্বকারী এ নারী ইসলাম প্রতিষ্ঠায় অনেক অবদান রেখেছেন। যার ইন্তেকালে রাসুল (স) কেঁদেছেন, যার মৃত্যুর বছরকে ‘আমুল হাযান’ বা শোকের বছর ঘোষণা দিয়েছেন, যাকে আল্লাহ তাআলা সালাম পাঠিয়েছেন, প্রথম ইসলাম গ্রহণ করেছেন, ইসলামের স্বীকৃতি দিয়েছেন সর্বোপরি রাসুল (স)কে একজন আদর্শ স্ত্রী হিসেবে আগলে রেখেছেন।

সব হাদিস গ্রন্থ, তাফসিরের কিতাব এক বাক্যে খাদিজাতুল কুবরার (রা) অবদানকে স্বীকৃতি দিয়েছেন। উম্মাহাতুল মুমিনিনদের পারিবারিক কার্যক্রমের ব্যাপারে বিশাল বিশাল গবেষণাগ্রন্থ আছে। কারো কারো ব্যাপারে কোনো কোনো কাজের ব্যাপারে ইখতেলাফ থাকলেও খাদিজা (রা)-এর ব্যাপারে কোনো ইখতেলাফ উত্থাপিত হয়নি। এ বিষয়টি কেবল মুসলিম বিশ্বে নয় পশ্চিমা গবেষকদেরও ভাবিয়েছে এবং এখনো ভাবাচ্ছে। বিবিসি বিশ্বের অন্যতম স্বীকৃত গণমাধ্যম। সেখানে একটি রিপোর্ট বা ডকুমেন্টারি প্রকাশ করা সহজ নয়। তারা পাশ্চাত্য ও প্রতীচ্যে যারা নারী অধিকার ও ইসলামী সংস্কৃতি নিয়ে গবেষণা করেন তাদের সাক্ষাত্কার নিয়ে একটি ডকুমেন্টারি করেছেন যাতে দেখানো হয়েছে কেবল মুসলমান নয় বিশ্বের অন্য ধর্মে বিশ্বাসী অনেকেই খাদিজা (রা)-কে তাদের অনুপ্রেরণা হিসেবে গ্রহণ করেছেন। একবার চিন্তা করলেই তার মধ্যে যে প্রতিভা ও আলো আছে এর স্বচ্ছ প্রমাণ পাওয়া যায়। বুখারি শরিফের প্রথম দিকে ‘কাইফা কানা বাদয়ুল ওহি’ পরিচ্ছেদে আয়েশা (রা) বর্ণিত হাদিসে ওহি নাজিলের অসাধারণ বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। সে হাদিসের এক স্থানে যখন রাসুল (স) ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে খাদিজা (রা)-এর কাছে আসলেন এবং বললেন, ‘জাম্মিলুনি..জাম্মিলুনি...’ তখন খাদিজা প্রথমে তাকে দৃঢ়তার সঙ্গে অভয় দিলেন এবং বললেন, আল্লাহর কসম, কখনই নয়! আল্লাহ আপনাকে কখনোই লাঞ্ছিত করবেন না। আপনি তো (১) আত্মীয় স্বজনের সঙ্গে সদাচরণ করেন, (২) অসহায়-দুস্থদের দায়িত্ব বহন করেন, (৩) নিঃস্বকে সহযোগিতা করেন, (৪) মেহমানকে আপ্যায়ন করেন এবং (৫) পথের দুর্দশাগ্রস্তকে সাহায্য করেন। খাদিজার (রা) স্পষ্ট বিশ্বাস ছিল, এই পাঁচটি সামাজিক দায়বদ্ধতা যার আছে, তাকে কখনো আল্লাহ অপমাণিত করবেন না। নিশ্চয়ই এর মধ্যে কোনো সুসংবাদ আছে। বর্তমান সভ্যতার এ সময়ে বসে আমরা কি চিন্তা করতে পারি একজন স্বামীকে কতটুকু বিশ্বস্ত ও দায়িত্বপূর্ণ হিসেবে দেখলে একজন স্ত্রী এরূপ সাহসী কথা উচ্চারণ করতে পারেন? বলা যায়, খাদিজার এ শক্ত ও দায়িত্বপূর্ণ কথায় তিনি আস্বস্ত হয়েছিলেন। খাদিজা তাকে চাচাতো ভাই ওয়ারাকা বিন নওফলের কাছে নিয়ে গেলেন এবং সব কথা শোনার পর রাসুল (স)কে তাওরাত ও ইঞ্জিলে বর্ণিত ঐতিহাসিক সত্য তা রাসুলের সুখবর দিয়ে বলেন, আগন্তুতুক! তিনি তো সেই দূত যিনি মুসা (আ)-এর নিকট এসেছিলেন।’ তিনি রাসুল (স)-এর রেসালাতের স্বীকৃতি দিলেন। রাসুলের স্বীকৃতির পর খাদিজা (রা)-প্রথম ব্যক্তিত্ব যিনি বিনা বাক্যে রাসুল (স)-এর রেসালাতকে স্বীকৃতি দিয়ে প্রথম মুসলিমা হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন।

রাসুল (স)-কে খাদিজা (রা) সিরিয়ায় বাণিজ্যে পাঠিয়ে তার সততা ও নেতৃত্বের যোগ্যতায় মুগ্ধ হয়েছিলেন। বাণিজ্য কাফেলায় রাসুল (স)-এর সংযুক্তি এবং পরবর্তীকালে বিবাহ করার সিদ্ধান্ত বলা হয় তিনি এককভাবে নিয়েছিলেন। প্রথম রাসূল (স)-এর সঙ্গে বিবাহে পিতা অমত করলেও পরবর্তীকালে তার সম্মতিতেই বিবাহ সম্পন্ন হয়েছে এবং বিবাহের সব খরচ খাদিজা (রা) নিজেই করেছেন। ম্যানচেস্টারের প্রখাত ইমাম আসাদ জামান বিবিসির সঙ্গে এক সাক্ষাত্কারে বলেন, খাদিজা (রা) ছিলেন ধনী এবং ক্ষমতাশালী, একজন সম্মানিত ব্যক্তিত্ব। সে যুগের অনেক নামি ও সম্ভ্রান্ত পুরুষ তাকে বিয়ে করতে চেয়েছিলেন। তিনি তাতে সাড়া দেননি। শেষ পর্যন্ত তিনি অবশ্য বিয়ে করেছিলেন, দুবার। তার প্রথম স্বামী মারা গিয়েছিলেন, আর তার দ্বিতীয় স্বামীর সঙ্গে তার বিচ্ছেদ হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। এরপর তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন আর বিয়ে করবেন না... যত দিন পর্যন্ত না সেই মানুষটির সঙ্গে তার পরিচয় হয়—যিনি হবেন তার তৃতীয় এবং শেষ স্বামী। সেই মানুষটির মধ্যে বিবি খাদিজা এমন কিছু অসামান্য গুণাবলী দেখেছিলেন—যা বিয়ে সম্পর্কে তার মনোভাব বদলে দেয়। তাকে বেছে নেওয়া এবং বিয়ের প্রস্তাব দেওয়া—দুটিই করেছিলেন খাদিজা নিজেই। সে যুগে এটা খুব স্বাভাবিক ব্যাপার ছিল না। খাদিজার বয়স তখন ৪০। আর তার ভবিষ্যত্ স্বামী ছিলেন ২৫ বছর বয়সের অর্থনৈতিকভাবে অপেক্ষাকৃত দুর্বল পরিবার থেকে আসা এক যুবক। কিন্তু এটা কোন প্রেমের গল্প নয়, বরং তার চেয়ে অনেক বেশি কিছু। এটি হচ্ছে পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মের সূচনার কাহিনি। খাদিজার সেই নতুন স্বামী আর কেউ নন, তিনি ইসলামের নবি মুহাম্মদ (স)।’ প্রাচ্য গবেষক হোইর্যান্ড বলেন, ‘খাদিজা ছিলেন স্বাধীনচেতা ও অত্যন্ত দৃঢ় ইচ্ছাশক্তিসম্পন্ন এক নারী। এর দৃষ্টান্ত হিসেবে বলা যায়, তিনি এক সম্পর্কীয় ভাইকে বিবাহ করতে অস্বীকার করেছিলেন। কিন্তু তখন এটাই নিয়ম ছিল।’ ঐতিহাসিক বোটানিহিউজ ও নারীবাদী লেখিকা স্পষ্টতই বলেন ‘স্পষ্টতই তিনি তার নিজের পথ নিজে তৈরি করে নিতে অভ্যস্ত ছিলেন। প্রকৃতপক্ষে তার এই যে ব্যাবসায়িক দক্ষতা এটাই তাকে এমন এক জায়গায় নিয়ে গিয়েছিল যা শেষ পর্যন্ত পৃথিবীর ইতিহাস বদলে দেয়।’ ফোজিয়া বোরা বলছিলেন, ইসলাম প্রচার শুরুর সময় নবিকে একঘরে করে দিয়েছিলেন মক্কার সমাজের অনেকেই—যারা এক আল্লাহ বিশ্বাসের বিরোধী ছিলেন। ফোজিয়া বোরা বলছিলেন, ‘কিন্তু খাদিজা তাকে সেই সমর্থন এবং সুরক্ষা দিয়েছিলেন—যা নবির তখন অত্যন্ত প্রয়োজন ছিল। হিউজ বলেন, ‘পরবর্তী ১০ বছরে খাদিজা তার স্বামীকে সমর্থন দেওয়া এবং সেই নতুন ধর্ম সম্প্রদায়ের জন্য অর্থের ব্যবস্থা করতে—তার সমস্ত সম্পদ এবং পারিবারিক যোগাযোগগুলোকে ব্যবহার করেছিলেন।’

ওপরে উল্লিখিত সমস্ত মন্তব্য ও মূল্যায়ন মূলত খাদিজা (রা)-এর ব্যাক্তিত্ব, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাকেই ইঙ্গিত করে। তবে সবচেয়ে শক্তিশালী মন্তব্য করেছেন রাসুল (স) নিজেই। তিনি বলেছেন, যখন কেউ ইসলামের সাহায্যে আসেনি তখন এ বিদুষী মহিলা ইসলামের কল্যাণে এগিয়ে এসেছেন।’ ওহী আগমনের প্রথম দিন থেকে দীর্ঘকাল পর্যন্ত এককভাবে তিনি রাসুল (স) ও ইসলামকে মুশরিকি সমাজের বিরোধিতা থেকে নিরাপদ রাখার সংগ্রাম করে গেছেন এবং তার কারণে আল্লাহর রহমতে সমাজের অনেক বিরোধিতা রাসুল (স) দৃঢ়তার সঙ্গে মোকাবিলা করেছেন। আজকের এদিনে এমন মহীয়সী নারীকে বিশ্বের নারীকূল বিশেষ করে বাঙালি নারীসমাজ নিজেদের আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করলে নিজেরা যেমন একটি আদর্শ পরিবার গঠনে নিজের যোগ্যতার প্রমাণ করতে পারবেন, তেমনি সুষ্ঠুভাবে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় দায়দায়িত্ব পালনেও সক্ষম হবেন।

l লেখক :অধ্যাপক, দাওয়াহ অ্যান্ড ইসলামিক স্ট্যাডিজ বিভাগ, ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া ও ইন্টারফেইথ স্পেশালিস্ট