‘এবারের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম’

আপডেট : ১১ মার্চ ২০২১, ২১:৪৮

স্বাধীনতার শ্রেষ্ঠ নায়ক, বাংলার হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ পুরুষ যার প্রজ্ঞা, নেতৃত্ব, সাহস, বলিষ্ঠতা ও ত্যাগের বিনিময়ে ‘স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা’ সম্ভব হয়েছে তাকে খাটো করার এবং তার অবদানে কালিমা লেপনে বর্তমানে খালেদা গং বদ্ধপরিকর। জিয়া সাহেব ২৫শে মার্চের রাতে ঘোষণা দিয়েছেন বলে বিএনপি-জামায়াতের দাবি, তাহলে আমি কী অপরাধ করলাম? আমি তো ১লা মার্চে যখন দুপুরবেলার সংবাদ শুনতে পেলাম যে পাকিস্তানের সামরিক প্রধান প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ঘোষণা দিয়েছেন যে, সংসদ অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করা হলো—আমরা তো তখন সঙ্গে সঙ্গেই রাস্তায় নেমে পড়ি এবং জোরগলায় আওয়াজ তুলি স্বাধীন বাংলাদেশের। জিয়া সাহেবের আগেই আমার মতো আরো অনেকেই স্বাধীনতার ঘোষণা দেন ঐদিন পূর্বাণী হোটেলে আমরা যারা উপস্থিত হই, সবাই তো স্বাধীনতার ডাক দেন। জিয়া সাহেব তো ২৫ তারিখ পর্যন্ত পাকিস্তানের সেনাবাহিনীতে চাকরি করেন, আমি তো তার আগেই চাকরি ছেড়ে সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ি। ২২শে মার্চ ১৯৭১ সালে চাকরি ছেড়ে দিই। আমার মতো অনেক অনেক তরুণ, যুবক, অনেক অনেক প্রবীণ নেতৃত্ব ১লা মার্চের পর থেকে ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা’ দেন। তবে যেহেতু স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার আইনসম্মত কোনো অধিকার আমাদের ছিল না, আমি নির্বাচিত সংসদ সদস্য ছিলাম না, বা বাংলাদেশের অবিসংবাদিত নির্বাচিত নেতা ছিলাম না, সেজন্য আমাদের ঘোষণা আইনসংগত নয়—নিরর্থক। বস্তুত ‘স্বাধীনতার ঘোষণা’ দেওয়ার একমাত্র আইনসংগত অধিকার ছিল শুধু একজনেরই এবং তিনি হচ্ছেন বাংলাদেশের নির্বাচিত নেতা, সাড়ে সাত কোটি বাংলাদেশি জনতার অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

আমার মনে পড়ে, ৩রা মার্চ তত্কালীন বাংলাদেশের সত্যিকার রাষ্ট্রনায়ক যার আদেশে চাকা চলে, গাড়ি ঘোড়া চলে, ব্যাংক চলে, অফিস-আদালত চলে, যার আদেশে লোকজন অফিসে যায়, সেই মহাপুরুষ জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর ধানমন্ডির ৩২ নম্বর রোডে যখন উপস্থিত হই, তখন অনেকের হাতে বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত (স্বাধীনতার পর তা পরিবর্তিত হয়) লাল-সবুজ পতাকা এবং অনেকেই তখন ‘স্বাধীন বাংলাদেশের’ স্লোগান দিচ্ছিলেন, তার সঙ্গে আমরাও শামিল হই। মেজর জিয়া ৩ তারিখ নয়, ২৬ তারিখ রাতে স্বাধীনতার সংগ্রামে শরিক হন। আমাদের অনেক পরে।

৭ই মার্চ সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনে একটি সমাবেশ হয় এবং তাতে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়। দুপুর থেকেই আমরা যখন বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক রেসকোর্সের বক্তৃতা শোনার জন্য জমায়েত হই তখন ওপরে বারবার সামরিক হেলিকপ্টার ও বিমান চলে এবং আমরা তখন স্থির নিশ্চিত যে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ডাক দেবেন।  আমাদের আশা কিন্তু তিনি পূরণ করেন। তার অপূর্ব বলিষ্ঠ ভাষণের প্রতিটি শব্দ আমাদের হূদয় পুলকিত করে, রক্ত গরম করে, স্বাধীনতার দৃঢ় প্রত্যয়ে আমরা উজ্জীবিত হই। তিনি অর্বাচীনের মতো বলেননি ‘আমি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করলাম’। তার পরিবর্তে তিনি বলেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। শুধু তাই বলে ক্ষান্ত হননি। তিনি আরো বলেন, ‘...আপনারা জানেন ও বোঝেন...মনে রাখবা আমি যদি হুকুম দেবার নাও পারি তোমাদের যা আছে তাই দিয়েই শত্রুর মোকাবিলা করো।...ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো।’ বঙ্গবন্ধু তার ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে স্বাধীনতার ঘোষণা আইনের মারপ্যাঁচে হুবহু না দিলেও ‘আখলবন্ধ’ স্বাধীনচেতা সংগ্রামী বাঙালিদের কীভাবে কী করতে হবে তার নির্দেশনা দিয়ে যান। ‘আমি যদি হুকুম দেবার নাও পারি...’ বক্তব্যের মধ্যে তিনি জাতিকে সজাগ করে দেন যে, তাকে যদি পাকিস্তানি বাহিনী হত্যা করে বা কারারুদ্ধ করে তখন আমাদের কী করতে হবে। ‘ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো...যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে...এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম...।’ আনুষ্ঠানিকভাবে একে ‘স্বাধীনতার ঘোষণা’ না বলা হলেও তার ভাষণে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য কী কী করা প্রয়োজন তার সব ইঙ্গিত ও নির্দেশনা এতে রয়েছে। সুতরাং যারা আজ এখানে দর্জালের মতো এই সত্য বাণীকে, এই সত্য উপলব্ধিকে ঘোলাজলে মাছ ধরার চেষ্টা করছেন জাতি কি তাদের কখনো ক্ষমা করবে?

১৯৭১ সালের ৪ঠা এপ্রিলে আমি যখন আমাদের সিলেটের বাসার সামনে পাকিস্তানি সেনানীর কড়া হুকুম ‘যার বাসার সামনে ব্যারিকেড তৈরি হবে সে বাড়িটি ধ্বংস করে দেওয়া হবে’ উপেক্ষা করে ব্যারিকেড তৈরি করি, তখন জিয়া সাহেব স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন, না হান্নান সাহেব দিয়েছেন, না যদু মধু দিয়েছেন, তা আমাদের মোটেই ধর্তব্য ছিল না। কেউ না দিলেও আমরা আমাদের মুক্তিযুদ্ধ চালিয়ে যেতাম। কারণ ৭ই মার্চে বঙ্গবন্ধু আমাদের স্পষ্টত নির্দেশনা দিয়ে গেছেন, ‘...যার যা কিছু আছে তাই দিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করো।’ সিলেট শহরে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয় আমাদের বাড়ি থেকে ৪ এপ্রিলে, ঐদিন বিকালে বাড়ি থেকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ওপর গুলি চালালে তারা আমাদের বাড়িটি মর্টার দিয়ে ধ্বংস করে দেয়। তখন আমাদের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন ইপিআর বাহিনীর ডজনখানেক বাঙালি বীর সন্তান। এর আগের দিনে তাদের যখন বলা হয়—তাদের হাতিয়ার জমা দিতে, তারা ইপিআরের ছাউনি থেকে পালিয়ে এসে আমাদের বাড়িতে আশ্রয় নেয়। তাদের কেউ-ই তখন জানে না ‘স্বাধীনতার ঘোষণা’ কেউ দিয়েছে কি না—তবে তারা জানে স্বাধীনতা ছাড়া বাঙালির কোনো ভবিষ্যত্ নেই। এর পেছনে যার নেতৃত্ব সর্বোচ্চ তিনি হচ্ছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

বঙ্গবন্ধুর প্রগাঢ় রাজনৈতিক ধীশক্তি ও প্রজ্ঞা থাকায় তিনি তার ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের বক্তৃতায় এক অপূর্ব সম্মিলনী সৃষ্টি করেছেন। এই ভাষণের পরিপ্রেক্ষিতে স্বাধীনতাকামী সব বাঙালি বঙ্গবন্ধুর ওপর নির্যাতন হলে বা তাকে বন্দি করলে সঙ্গে সঙ্গেই স্বাধীনতার যুদ্ধে অবতীর্ণ হবে। তবে সরকার যদি তাকে বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা হিসেবে চিত্রিত করে ফাঁসি দেওয়ার পাঁয়তারা করে, তাহলে এ বক্তৃতা তাদের হতাশ করবে। যেসব বাংলাদেশি পাকিস্তানের পক্ষে ছিলেন তাদের কাছে এ বক্তৃতা ‘স্বাধীনতার ইঙ্গিত’ নয়—তারা তাদের তালে এর তাফসির করে।

১৯৭১ সাল। ২২শে মার্চ ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আওয়ামী লীগ নেতা তাজউদ্দীন আহমদ, মোল্লা জালাল উদ্দিন, নারায়ণগঞ্জের গোলাম সারওয়ার প্রমুখ ইমার্জেন্সিতে আসেন আহত কর্মীদের দেখতে। মেডিক্যাল হাসপাতালের বারান্দায় তাদের সঙ্গে দেখা, জিজ্ঞাসা করলাম কীসের জন্য এসেছেন। বললেন, ‘আহত কর্মীদের দেখতে এসেছেন।’

তাজউদ্দীন সাহেব জানালেন যে, ইয়াহিয়া-মুজিব আলোচনা খুব উত্তম নয়। তার কথার ভঙ্গিতে বুঝতে অসুবিধা হয়নি যে, অবস্থা খারাপ হতে পারে। তিনি বিশেষ করে বাচ্চাদের ঢাকার বাইরে নিয়ে যেতে উপদেশ দিলেন। সুতরাং পরের দিন ২৩শে মার্চ বড় বোনের বাচ্চাদের নিয়ে সিলেটে পাড়ি দিই এই আশায় যে ঢাকায় যদি আন্দোলন চলে, সিলেটে হয়তো কম হবে। তা ছাড়া আমার বস ছিলেন তখন এক উর্দুভাষী পাঞ্জাবি—১ মার্চের পর থেকেই কাজে ঠিকমতো যাচ্ছি না তার জন্য তিনি অসন্তুষ্ট ও সন্দেহের চোখে দেখছেন। মূলত ১লা মার্চের পর থেকে অফিস-আদালত বাদ দিয়ে আমি তখন সার্বক্ষণিক সভা- শোভাযাত্রা নিয়েই মহাব্যস্ত।

২৫শে মার্চের বিভীষিকাময় ঢাকার হত্যাযজ্ঞ আমি দেখিনি। তবে পরের দিন সিলেটে থমথমে ভাব, ঢাকার খবরাখবর নেওয়ার জন্যে আমরা হন্তদন্ত হয়ে অস্থিরতা প্রকাশ করছি। ২৭শে মার্চ খবর পেলাম যে বঙ্গবন্ধু পাকসেনার হাতে বন্দি হওয়ার আগে স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন এবং ২৮শে মার্চ প্রথম রেডিওতে মেজর জিয়াউর রহমানের কণ্ঠে শুনতে পেলাম, ‘আমি জিয়া বলছি—আমাদের মহান নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করা হয়েছে...’।

আমরা তাতে আনন্দিত হলাম যে, বাঙালি জোয়ানরাও আমাদের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করেছেন। আমি কিন্তু জিয়ার কণ্ঠে স্বাধীনতার ঘোষণা শুনেছি ২৮ মার্চে। পরবর্তীকালে আমার বন্ধু তত্কালীন সময়ে চাটগাঁ রেডিও স্টেশনে কর্মরত আবদুল্লাহ আল ফারুক এবং স্বয়ং মেজর জিয়া সাহেবের মুখে শুনেছি যে, তিনি ২৭ তারিখে প্রথম চাটগাঁ বেতারে ঘোষণাটি দেন।

মেজর জিয়াউর রহমানের একটি লেখা যা অধুনালপ্ত ‘সাপ্তাহিক বিচিত্রায়’ ১৯৭৪ সালের ২৬শে মার্চ প্রকাশিত হয়। তাতে তিনি নিজেই কীভাবে ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে স্বাধীনতাসংগ্রামে যোগ দিলেন তা সবিস্তারে লিপিবদ্ধ করেন। তার একান্ত সহচর কর্নেল (অব.) অলিও কীভাবে তারা মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করলেন তা সবিস্তারে লিখেছেন। তাদের কারো বক্তব্যে মেজর জিয়া ২৫শে মার্চ কালরাতে স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন বলে কোনো স্বীকারোক্তি নাই।

স্বাধীনতার জনক একজনই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বাংলার সাড়ে সাত কোটি জনতা একজনের বলিষ্ঠ নেতৃত্বে স্বাধীনতাসংগ্রামে ঝাঁপ দেয়। তিনি হচ্ছেন বাংলার গৌরব। বাংলার শ্রেষ্ঠ পুরুষ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

n লেখক :পররাষ্ট্রমন্ত্রী, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার।