রাজধানীতে শতবর্ষী হাট

আপডেট : ২৫ জানুয়ারি ২০১৯, ২২:৩৩

আবাসিক এলাকার ছিমছাম পরিবেশ। আধুনিক ব্যবস্থাপনায় গড়ে ওঠা সারি সারি ভবন। সুন্দর পিচঢালা পথ। এর মাঝে এত ভিড় কেন? প্রশ্ন করে জানা গেল, হাট বসেছে এখানে। বলে কী, মাথা ঠিক আছে তো! হাট! এই রাজধানী ঢাকায়! আমাদের চমকে দিয়ে এ হাটের দোকানিরা আরও জানাল, গত একশ বছরের বেশি সময় ধরে এখানে এ হাট বসছে। স্থানীয় ভাষায় ‘মেরাইদ্যা হাট’। নড়াই নদীর পাড়ে নৌকায় পণ্য নিয়ে হাজির হন হাটুরেরা। এখন নদী শুকিয়ে খাল হয়েছে, নৌকার বদলে ভ্যানগাড়িতে আসে পণ্য। কিন্তু সেই হাট টিকে রয়েছে। বনশ্রী আবাসিক এলাকার জে ব্লকে রামপুরা খালের ধারে বসে এ হাট। বিশ্বাস না হলে ঘুরে আসতে পারেন। প্রতি বুধবার এক জমজমাট হাট বসে এখানে। শত শত দোকান, হাজার মানুষের এমন গমগমে হাট গ্রামের হাট ছাড়া দেখার সৌভাগ্য আর হয় না।

জানা যায়, ব্রিটিশ শাসনের মধ্যবর্তী সময়ে জমিদার জানকি বল্লভ এ হাটটি প্রতিষ্ঠা করেন। একসময়ের নড়াই নদীকে সবাই এখন ‘রামপুরা খাল’ নামেই চেনেন। হাতিরঝিলের শেষ সীমানায় রামপুরা ব্রিজের নিচ থেকে এই নড়াই নদী তথা রামপুরা খালের শুরু। যা আফতাবনগর-বনশ্রীর মাঝ দিয়ে আরও পূর্বে গিয়ে বয়ে গেছে। তবে, স্থানীয়দের অভিযোগ, হাটের মূল অংশ দখল করে সেখানে অবৈধ স্থাপনা গড়ে উঠেছে।

আব্দুল খালেক গত ৪০ বছর ধরে এ হাটে বাঁশের তৈরি নিত্যপ্রযোজনীয় ডালা, পাটি সাজিয়ে বসেন। তিনি বললেন, আমি স্বাধীনতার পর থেকে এখানে ব্যবসা করি। বাপ-দাদার কাছে শুনেছি তারাও আসত এ হাটে। তখন আরও বেশি জমজমাট ছিল।

তিনি জানান, নড়াই নদী তীরবর্তী এ স্থানটিতে একটি বড় বটগাছ এবং তার পাশে বিশাল এক পুকুর ঘিরেই বসতে শুরু করে হাট। দূর-দূরান্ত থেকে নৌকায় করে হাটুরেরা এ হাটে আসত।

স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে খুব জনপ্রিয় এ হাট। আশেপাশের এলাকার অনেক দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসে এ হাটে। কেউ আসেন পণ্য নিয়ে। অনেকেই আসেন প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে। তবে, স্থানীয়দের কাছে এ হাট সাপ্তাহিক কেনাকাটার এবং একই সঙ্গে দলবেঁধে আড্ডা ও ঘোরাঘুরির হাট হিসেবেও জনপ্রিয়।

স্থানীয় বাসিন্দা মোঃ মীর হোসেন বললেন, একসময় জলদাসরা মাছ ধরে এনে এখানে নদীর ধারে মাছ বিক্রি করত। সেখানে থেকেই হাটের উত্পত্তি। দিনে দিনে হাটের আকার বাড়তে থাকে। তিনি জানান, হাটের বয়স নিয়ে অনেকেই অনেক কথা বলেন। তবে, একশ বছরের বেশি হবে এটা ধরে নেওয়াই যায়। এখানে আমাদের তিন পুরুষ ধরে এ হাটের কথা শুনে আসছি।

মেরাদিয়া হাটের মূল ক্রেতা মেয়েরা। তারা আসেন দলবেঁধে। একই ভবনের কয়েক ফ্ল্যাটের নারীরা মিলে চলে আসেন হাটে। কেনাকাটাও চলে, চলে দলবেঁধে ঘোরাঘুরি। রামপুরা, বনশ্রীর বাসিন্দারা তো রয়েছেনই, খালের ওপারের আফতাবনগর, বাড্ডা, খিলগাঁও, সাতারকুল, নাসিরাবাদ, মগবাজার, মালিবাগ থেকেও ক্রেতারা চলে আসেন এখানে।

এ হাটের হাটুরেরা আসেন ফকিরখালী, ডেমরা, বাড্ডা, বেরাইদ, ইছাপুরা, রূপগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ থেকেও হাটে বেচাকেনা করতে আসেন। এ ছাড়া নাসিরাবাদ, রামপুরা, বনশ্রী, ভুলতা, চনপাড়া, খিলগাঁওয়ের আশপাশের এলাকা থেকেও আসেন অনেকেই।

স্থানীয় বাসিন্দা মাহফুজা হ্যাপি বললেন, আমি এ এলাকায় ২০০৮ সাল থেকে বাস করি। তখন থেকেই কেনাকাটা করি। এ হাটের জন্য আমাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় কেনাকাটর জন্য অন্য কোথাও যেতে হয় না। বিশেষ করে আমাদের চেনা পরিচিত আশপাশের বাড়ির মেয়েরা দলবেঁধে চলে আসি হাটে। কেনাকাটাও হয়, সঙ্গে ঘোরাঘুরি ফ্রি।

কী নেই এ হাটে! শাক-সবজি, হাঁস-মুরগি, প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। আশেপাশের গ্রামীণ এলাকার বাড়ির লাউ-কুমড়াও ওঠে হাটে। তবে, মাছের আমদানি খুব ভালো। বিশেষ করে আশেপাশে পুকুর নদী-নালার মাছের আমদানি হয় এ হাটে। তাই,  জ্যান্ত মাছের খদ্দের ভিড় থাকে মাছের বাজারকে ঘিরে। এর পাশাপাশি, খাবারদাবার, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের পসরা সাজিয়ে বসেন দোকানিরা। রয়েছে মজাদার মিষ্টির হরেক রকম আয়োজন। কেউ কেউ নিয়ে আসেন নিজের ঘরে পালা গরু, ছাগল, হাঁস-মুরগি, কেউ আনেন  বাড়ির গাভির টাটকা দুধ।

দক্ষিণ দিকে সারিবদ্ধভাবে বসেছে মাছের বিক্রেতারা। এরপরেই সবজির দোকানিরা। রয়েছে শীম, নতুন আলু, লাউ, মিষ্টি কুমড়া, করলা, মুলা, শালগম, বেগুন প্রভৃতি। মাছের মধ্যে উঠেছে বোয়াল, শোল, গজার, সিং, মাগুর, চিংড়ি, ট্যাংরা, দেশি কই প্রভৃতি। এর পাশাপাশি রুই, কাতলা, মৃগেল তো রয়েছেই। তবে, মাছের দাম ঢাকার অন্যান্য বাজারের চাইতে খানিক চড়া। বিক্রেতারা জানালেন, এগুলো বিভিন্ন নদী-নালা, পুকুর, জলাশয়, বিল কিংবা ডোবা থেকে ধরা। চাষের মাছ নয়। সেজন্যই দাম একটু বেশি।

এসবের পাশাপাশি রয়েছে বাঁশের হাতের কারুকাজ করা নানা পণ্য। এখন শীতকাল তাই, শীতকালের সবজি আর মাছে ভরে উঠেছে হাট। বর্ষার সময় খালের ধারে হাট জমে ওঠে। এখন শীতকাল তাই খালের পানি এসেছে কমে। কিন্তু তাই বলে পণ্য আসা কমেনি এতটুকু! পেঁপে, পেয়ারা, আমলকী, কতবেল, লেবু, সুপারি আর রয়েছে হরেক রকমের কলার সমাহার। গাছ থেকে কেটে আনা কলার কাঁদি দেখলেও মন জুড়িয়ে যায়!

এর পাশাপাশি রয়েছে থান কাপড়, সালোয়ার কামিজ আর রেডিমেড পোশাকের বিশাল বাজার। সড়কের পাশে পড়ে থাকা খালি জায়গায় বাহারি পণ্যের ক্রেতা-বিক্রেতার মিলনমেলা।

দখল হয়ে গেছে হাটের মূল অংশ

স্থানীয়দের অভিযোগ হাটের মূল যে এলাকা এতকাল ধরেও অবশিষ্ট ছিল তাও দখল হয়ে গেছে। সেখানে গড়ে তোলা হয়েছে প্রায় দেড়শ দোকান-পাট। আর পুরো হাটকেই নিয়ে আসা হয়েছে এই আবাসিক এলাকার ভেতরে। দখল হতে হতে হাটের যেটুকু এলাকা অবশিষ্ট রয়েছে তাতে পুরো হাটের দোকান-পাটের জায়গা হওয়াও কঠিন।

ঢাকা সিটি করপোরেশন কর্তৃক পরিচালিত মেরাদিয়া একটি পুরনো হাট। মেরাদিয়া মৌজার ১৭৩৮ ও ২১৬০ নম্বর আরএস (রিভিওশনাল সার্ভে) দাগের জমি হাট হিসেবে এক নম্বর খতিয়ানভুক্ত। বর্তমান ৩০০৪ নম্বর সিটি জরিপেও তা হাট হিসেবে উল্লেখ রয়েছে। সরকারের পক্ষে ঢাকা জেলা প্রশাসন ওই জমির তত্ত্বাবধানকারী। অথচ সেই হাটের জমি অবৈধভাবে দখল করে দোকানপাট নির্মাণ করা হয়েছে।

একসময় মেরাদিয়া হাট পুরানো ঢাকার জমিদার জানকি বল্লভ দত্তের তালুক ছিল। হাট ছাড়াও মেরাদিয়া এলাকার শত শত একর জমির বন্দোবস্তকারী ছিলেন ওই জমিদার। সিএস (ক্যাডাস্ট্রাল সার্ভে) জরিপে জানকি বল্লভ দত্তের নাম রয়েছে। তিনি প্রজাদের কাছে জমি পত্তন দিয়ে খাজনা আদায় করতেন। ১৯৭২ সালে এক গেজেটে ওই জমি সাধারণের হাট হিসেবে উল্লেখ করা হয়।