অর্থনীতিতে নারীর অবদান বাড়ছে

আপডেট : ১২ মার্চ ২০২১, ২০:১৮

n এম এ মাসুম

 

একটি দেশের নারী ও পুরুষের সমান অংশগ্রহণ থাকলেই অর্থনীতির পূর্ণ বিকাশ হতে পারে। অনেক দেশের সরকারও সেই গুরুত্ব বুঝতে পারছে। কিন্তু অনেক দেশেই এখনো নারীদের অর্থনৈতিক কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে আইনি বাধা আছে। বাংলাদেশেও আছে। অর্থনীতিতে নারীর অংশগ্রহণের সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান এখনো নিচের দিকে।

বাংলাদেশে নারী-পুরুষের সমতাভিত্তিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে যেমন বৈষম্যমূলক আইন দূরীকরণে চেষ্টা করা হচ্ছে, তেমনি নারী-পুরুষবৈষম্য নিরসনে বিনিয়োগ, অর্থায়নের সমসুযোগ সৃষ্টি ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা দূরীকরণে ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট ডেভিড ম্যালপাস উল্লেখ করেছেন, উন্নয়নের ভালো সুফল পেতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নারীর পূর্ণাঙ্গ অন্তর্ভুক্তি প্রয়োজন। একটি পরিবারের অর্থনীতিতে নারী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। পরিবার হলো সমাজ ও রাষ্ট্রের একক। সেই পরিবারের প্রজনন, রক্ষণাবেক্ষণ, পরিচর্যাসহ সংসার ও আবাসকে গতিশীল রাখার মূল কাজটি করেন নারী, যিনি কন্যা, জায়া অথবা জননী। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)র গবেষণার বাস্তবতার বিষয়টি স্পষ্টভাবে বুঝা যায়। সিপিডির প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, নারীর এই নীরব অবদানের অর্থমূল্য ১০ লাখ ৩৭ হাজার ৫০৬ কোটি টাকা; যা গত বছরের মোট জিডিপির ৭৮ দশমিক ৮ শতাংশ। দেশের মোট দেশজ জাতীয় উত্পাদনের কাছাকাছি নারীর অবদান! ঘরে ১০ লাখ ৩৭ হাজার কোটি টাকার কাজ করেন নারী। গবেষণায় আরো দেখানো হয়েছে যে প্রতিদিন একজন নারী গড়ে একজন পুরুষের তুলনায় প্রায় তিন গুণ সময় এমন কাজ করেন, যা জাতীয় আয়ের হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয় না।

জিডিপিতে নারী-পুরুষের অবদান আলাদাভাবে দেখানো হয় না সরকারি কোনো তথ্যে। তবে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘদিন ধরে নারী-পুরুষের অবদান পৃথকভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে। বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনীতিতে গ্রামীণ অর্থনীতির ভূমিকা অনস্বীকার্য। গ্রামীণ অর্থনীতির ওপর ভিত্তি করেই দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশের অর্থনীতি। আর এ কৃষি খাতকে যারা সচল রেখেছে, তাদের মধ্যে ৫৩ শতাংশই নারী। গ্রামীণ অর্থনীতিতে পুরুষের চেয়ে নারীর অবদান বেশি। এতে ৫৩ শতাংশ নারীর অবদান থাকলেও পুরুষের অবদান ৪৭ শতাংশ। গত এক দশকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণের লক্ষ্যে প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ বাড়তি শ্রমশক্তি যুক্ত হয়েছে। যার প্রায় ৫০ লাখই নারী শ্রমিক। ২০০৫-০৬-এর শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, দেশের ১ কোটি ২০ লাখ নারী শ্রমিকের প্রায় ৭৭ শতাংশই গ্রামীণ নারী, যারা মূলত কৃষিকাজ, পশুপালন, হাঁস-মুরগি পালন, মাছ চাষ ইত্যাদি কৃষিসংক্রান্ত কাজে নিয়োজিত।

নারীরা কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত ২১টি ধাপের মধ্যে মোট ১৭টি ধাপেই কাজ করে থাকেন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের এক প্রতিবেদন মতে, ফসলের প্রাক-বপন প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে ফসল উত্তোলন, বীজ সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াকরণ, বিপণনের সঙ্গে ৬৮ শতাংশ নারী কাজ করেন। কর্মক্ষম নারীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি নারী কৃষিকাজে নিয়োজিত রয়েছেন। ঘরোয়া ও গ্রামীণ পরিবেশের হওয়ায় তারা সহজেই এ পেশার সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করতে পারেন। তাছাড়া বর্তমানে গ্রামাঞ্চলের পুরুষরা অধিক উপার্জনের আশায় শহরকেন্দ্রিক বিভিন্ন পেশায় যুক্ত হওয়ার কারণে তাদের পারিবারিক কার্যাবলী নির্বাহ করার পাশাপাশি খাদ্য ও সামগ্রিক চাহিদা পূরণের জন্য নারীদের বিভিন্ন ধরনের কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত হতে হচ্ছে। পশুপালন, মত্স্য চাষ, খামার প্রতিষ্ঠাসহ বিভিন্ন অর্থনৈতিক কাজে নারীরা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অবদান রাখছে।

এসব কাজে যুক্ত হওয়ার ফলে নারীরা যে আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছে তা লক্ষণীয়। দেশে গত এক দশকে অর্থনৈতিক কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ বাড়তি শ্রমশক্তির মধ্যে ৫০ লাখই নারী শ্রমিক। যদিও এসব নারী শ্রমিকের সিংহভাগই অবৈতনিক পারিবারিক নারী শ্রমিক। যেসব নারীরা স্বাবলম্বী তারা শিক্ষা দিয়ে সন্তানের ভবিষ্যত্ গড়ছে এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করতে পারছে, সব মিলিয়ে জাতীয় অর্থনীতিতে নারীরা একটা বিশাল অবদান রাখছে।

দেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ক্রমেই দৃঢ় হচ্ছে নারীর অবস্থান। সব সীমাবদ্ধতা পেছনে ফেলে আর্থিক খাতেও বাড়ছে তাদের সরব উপস্থিতি। শুধু তাই নয়, এখন নারীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন এই খাতের নীতিনির্ধারণীর মতো সর্বোচ্চ পর্যায়ে। দেশের আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নারী ও পুরুষ কর্মকর্তাদের পরিসংখ্যান নারীদের উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণ এখন দৃশ্যমান।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গত ৫ বছরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই পাঁচ বছরে নারী কর্মকর্তা ১২৬ জন থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৫৫ জনে। অন্যদিকে পুরুষ কর্মকর্তার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৩৮ জন থেকে ৩ হাজার ৩২২ জনে। পুরুষের তুলনায় নারীর সংখ্যা কম হলেও, এই সময়ে প্রতি বছরে বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী পরিচালক থেকে নির্বাহী পরিচালক পর্যন্ত ছয়টি ধাপে নারী কর্মকর্তার অংশগ্রহণ বেড়েছে ১ শতাংশের কিছু বেশি।

পেশা হিসেবে সনদপ্রাপ্ত হিসাববিদদের (সিএ) মর্যাদা রয়েছে বিশ্ব জুড়েই। এ পেশায় দেশের নারীরাও জায়গা করে নিচ্ছেন। দেশে বর্তমানে ২ হাজার ১০০ জন সিএ রয়েছেন, তার মধ্যে নারী সিএ ১৩৭ জন। ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউনট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএবি) সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। অনেক নারী নিজের একাগ্রতার কারণে ব্যবসা ক্ষেত্রে সফল হলেও বেশির ভাগ ঝরে পড়ছে বাজার ব্যবস্থাপনা, অর্থের অভাব ও প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মেলাতে না পেরে। তাই নারীদের জন্য প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। বিশেষত বর্তমানে পোশাক শিল্পে প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পারলে নারীর অনেক বড় একটি অংশ ছিটকে পড়বে।