দেশের উন্নয়ন বনাম পোস্টার

আপডেট : ১২ মার্চ ২০২১, ২১:১২

কবির উদ্দিন

ভাবতে ভালো লাগছে যে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর বছরে উন্নয়নশীল দেশগুলির তালিকায় বাংলাদেশের নাম উঠল। গুটিকয়েক নিন্দুক বলছেন—এটি একটি ছোট পরিসংখ্যান। হাঁ দেশের এমন পরিবর্তন একটি পরিসংখ্যান তো বটেই, যেমন একসময় দৈনিক শ্রমিকের মুজুরি ৬০ টাকা ছিল, এখন হয়তো ৬০০ টাকা। একসময় প্যাডেল মেরে ১২০ টাকা উপার্জন করা যাদের সম্ভব হতো না তারা এখন অটো প্যাডেলের মাধ্যমে বা প্যাডেল ছাড়া  দিনে ১২০০ টাকা উপার্জন করে। যা হোক আয়ের ব্যাপারটা একদম আপেক্ষিক ও ব্যক্তিগত। তবে যেসব উন্নয়ন কাজ হচ্ছে তাতে পরিষ্কার যে দেশ এগিয়ে চলেছে—৬ লেনের রাস্তা ও তার সঙ্গে উড়াল, নতুন রেলপথ, পদ্মা সেতু, গ্রামীণ পাকা রাস্তা ও বিদ্যুত্ উত্পাদন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ঢাকার কিছু উন্নয়নের চাক্ষুষ উদাহরণ হলো মেট্রো রেল, দ্রুত বাস ট্রানজিট, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণ ও বিমানবন্দর রোডের সৌন্দর্যবর্ধন।

কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, একটি করে দেয়াল ও পিলার বানানোর দিন থেকেই পোস্টার সাঁটানো হচ্ছে সেগুলোতে। যে যার মতো লাগাচ্ছে। ভুয়া কবিরাজের ওষুধ আর বিজ্ঞাপন থেকে শুরু করে বিসিএস চাকরির কোচিং বা বিভিন্ন দলের রাজনৈতিক নেতাদের কেউ পিছিয়ে নেই এই পোস্টার সাঁটানোর প্রতিযোগিতায়। শুধু নতুন নির্মাণ নয়, রাজধানীর পদচারী-সেতুগুলো, গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নির্মিত তোরণ, নতুন করে সজ্জিত বিমানবন্দর রাস্তা পোস্টারের কাছে হার মেনেছে। বিশেষভাবে বলতে হয়—মহাখালী, সাতরাস্তা, বনানী, কাকলি, মিরপুর, গুলশান, ধানমন্ডি, ফার্মগেট, উত্তরা এলাকায় দেয়াল, উত্তরা অ্যাপার্টমেন্টের দেয়াল, গাজীপুর থেকে বিমানবন্দর, রেপিড বাস ট্রানজিটের পিলার, বৈদ্যুতিক খুঁটি ও গাছে সাঁটানো পোস্টারের কথা। ব্যক্তি মালিকানাধীন ভবনের দেয়াল, দোকানের শাটার কোনো কিছুই বাদ যায়নি। বনানী, খিলখেত, কাওলা এলাকার পদচারী-সেতুগুলোতেও  চোখে পড়ে শুভেচ্ছা জানানোর  ব্যানার। এমনটিই দেখা যায়, ভাষাসৈনিক বিচারপতি আবদুর রহমান চৌধুরী সড়কের নামফলকটিতে। মূল রাস্তার ফুটপাতে প্রায় আড়াই ফুট চওড়া ও চার ফুট লম্বা এই নামফলকের ওপর খোদাই করে যে লেখা রয়েছে তা পড়ার কোনো উপায় নেই। সাঁটানো বিভিন্ন পোস্টারের কারণে সেই নামফলক ঢাকা পড়ে গেছে! এছাড়া মিরপুর শহিদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধের দেয়াল, রায়েরবাজার বধ্যভূমি, লালবাগ কেল্ল­া, শাহবাগ জাতীয় জাদুঘরসহ সড়কের মোড়ে মোড়ে সৌন্দর্য বর্ধনের জন্য যতগুলো স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে, তার সিংহভাগই এখন বিজ্ঞাপনের দখলে!

রাতের বেলা লাগিয়ে যাওয়া এক পোস্টারের ওপরে পরের রাতে সাঁটানো হয় আরেকটি পোস্টার। এমনকি ব্যক্তি মালিকানাধীন ভবনের দেয়ালও ঢাকা পড়ছে পোস্টারের পর পোস্টারে। নগরের সৌন্দর্য বর্ধনে কর্তৃপক্ষ বারংবার হুঁশিয়ারি দিয়েও কমাতে পারেননি যত্রতত্র পোস্টার সাঁটানোর প্রবণতা। ঢাকার বাস টার্মিনালগুলো বেশ সুন্দর করে নির্মাণ করা হলেও বিজ্ঞাপনের আধিক্য দেখা যায় সেসব জায়গাতেও সর্বোপরি রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন এলাকায় পোস্টার লাগেনি এমন দেয়াল খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। প্রায় সব দেয়ালে ‘এখানে পোস্টার লাগানো নিষেধ’ উল্লে­খও রয়েছে কোথাও কোথাও। তবে নিষেধ মানা হয়নি। নিষেধের লেখাটিও চাপা পড়েছে পোস্টারে।

এই পরিস্থিতিতে কর্তৃপক্ষের উচিত দেয়াল লিখন ও পোস্টার লাগানো (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১২-কে আরো সময়োচিত করা। পোস্টার লাগানোকে একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালার মধ্যে নিয়ে আসা। কোনো বিশেষ কারণে ব্যানার বা পোস্টার লাগানোর দরকার হলে অনুমোদন নেওয়ার ব্যবস্থা থাকতে হবে এবং তাতে থাকবে অবশ্যই অনুমোদনের সিল। নির্দিষ্ট স্থান ছাড়া তার বাইরে কোথাও লাগানো যাবে না। এ ব্যাপারে জনসচেতনতা বাড়ানো দরকার। পরিশেষে, আমাদের দেশ যে এগিয়েছে—পরিষ্কার-পরিচ্ছনতার মধ্যেও তার প্রমাণ রাখা জরুরি।

ঢাকা