অধ্যাপক ডা. মোহিত কামাল
কথাসাহিত্যিক ও মনোশিক্ষাবিদ।
কথাসাহিত্যে বাংলা একাডেমি পুরস্কার ২০১৮ ও শিশুসাহিত্যে শিশু একাডেমি পুরস্কার ২০১২ (১৪১৮ বঙ্গাব্দ) লরিয়েট। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সাবেক এ পরিচালক বর্তমানে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জাতীয় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ উপদেষ্টা কমিটির একজন হিসেবে কাজ করছেন। একই সঙ্গে তিনি জাতীয় টেকনিকেল অ্যাডভাইজরি কমিটি কোভিড-১৯ এর একজন উপদেষ্টা সদস্য।
আমার প্রথম বিদ্যাপীঠ খুলনার খালিশপুরের ক্রিসেন্ট জুট মিলস উচ্চ বিদ্যালয়। এই স্কুলের প্রাথমিক শাখায় প্রথম থেকে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছি। এছাড়াও আমি যেসব স্কুলে পড়েছি তার মধ্যে আগ্রাবাদ সরকারি কলোনি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চতুর্থ-পঞ্চম শ্রেণি। আগ্রাবাদ সরকারি কলোনি উচ্চ বিদ্যালয়ে সপ্তম শ্রেণি। চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলে অষ্টম থেকে দশম শ্রেণি, এ স্কুল থেকেই আমি ১৯৭৬ সালে এসএসসি পাস করি।
আমার প্রথম স্কুল: খুলনা খালিশপুর হাউসিং সোসাইটিতে ছিল আমাদের বাসা। বাবা ছিলেন কাস্টমস অফিসার, সরকারি চাকুরে। খুলনার জীবনে হাউজিং সোসাইটিতে আমরা ভাড়া বাসায় থাকতাম প্রথমে। বাবার তখন পোস্টিং ছিল খালিশপুর ক্রিসেন্ট জুট মিলে। সেটা পূর্ব পাকিস্তান আমলের কথা। খালিশপুর থেকে ক্রিসেন্ট জুট মিল স্কুল পর্যন্ত ছোট্ট আমি রোজ পায়ে হেঁটে যেতাম। প্রথম দিনের স্মৃতি খুব বেশি মনে নেই। তবে মনে পড়ে স্কুলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রাথমিক শাখার একজন শিক্ষক-আপা আমাকে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরে আদর দিয়েছিলেন। গালে টোনা দিয়ে বলেছিলেন, ‘লক্ষ্মী ছেলে’।
বাবাকে বলেছিলেন, ‘ওকে নিয়ে আর আপনাদের চিন্তা করতে হবে না। ওর চিন্তা আমরা করব।’ বেশ মনে পড়ে তাঁর কথা- নাম, সম্ভবত রোকেয়া অথবা রাবেয়া আপা। পড়াশুনার প্রতি ছিল আমার দুরন্ত টান। ক্লাস ওয়ানে ভর্তি হওয়ার আগেই নিজে নিজে পড়ে ফেলেছিলাম পুরো বই। আনন্দ নিয়েই স্কুলে গিয়েছি। আনন্দময় পরিবেশের সঙ্গে একাকার হয়ে গিয়েছি। তাই আমার স্কুলের শুরুটা ছিল মধুময়। আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবতাম আমি আকাশের মতো বড় হব। ক্লাসের বেঞ্চিতে জানালার পাশে বসেও আকাশের দিকে তাকাতাম । নীল আকাশের পানে তাকিয়ে ভাবতাম ওখানে আমি উড়ে উড়ে যাব। পড়াশুনাও খুব ভালো ছিলাম। বরাবরই ফার্স্ট হয়েছি। আপার আদর , শিক্ষকদের আদর-মমতা নিয়ে পার করেছি আমার প্রাথমিক স্কুল জীবনের ওই সময়কাল। খুলনা জীবনের পরবর্তী সমযে স্কুলের পাশে ভৈরব নদীর পাড়ে কাস্টমস বাংলায় কেটেছিল আমার জীবনের এক স্বর্ণালি অধ্যায়। উনসত্তরের গণআন্দোলনের সময় বাবা কাস্টমস অফিস, চট্টগ্রাম সিজিএস বিল্ডিংয়ে পোস্টিং নিয়ে চলে আসেন। এর আগ পর্যন্ত ছিলাম খালিশপুরের কাস্টমস বাংলোয়।
প্রিয়স্কুল ‘সবচেয়ে’ শব্দটা আমার পক্ষে ঠিক করা কঠিন।
উল্লেখিত প্রত্যেকটি বিদ্যালয় ছিল আমার প্রিয়, প্রাণের প্রতিষ্ঠান ; আনন্দের জায়গা । প্রত্যেকটি স্কুলে আমি ছিলাম সেরাদের সেরা পড়াশোনা, খেলাধুলা সবকিছুতে অলরাউন্ডার হিসেবে সবার প্রিয়। আমার সব স্কুলই আমার প্রাণের স্কুল। তবে চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল আমাকে দিয়েছে অনেক কিছু । চট্টগ্রামের সেরা স্কুলে পড়ার সুবাদে এখন অনুভব করি, বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে যাই না কেন, বন্ধু পেয়ে যাই। এটি এক বিশাল অর্জন । ভালো স্কুলে পড়লে, ভালো ছাত্রদের মধ্যে থাকলে ভালো বন্ধু পাওয়া যায় বিশ্বজুড়ে । এটি আমাকে বেশি প্রণোদিত করে এই সময়ে এসে, এই বয়সে।
স্কুলের বর্ণনা দিতে গেলে প্রথমেই বলতে হবে খালিশপুর ক্রিসেন্ট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাথমিক শাখার কথা।
স্কুলের উত্তর পাশে রয়েছে বিশাল খেলার মাঠ ।
পূর্বে ২০০ গজের মধ্যে ছিল কাস্টমস বাংলোটি। ভৈরব নদী বিধৌত আমাদের বাংলো থেকে আমি শুয়ে শুয়ে দেখতাম আমার স্কুলের ছাদ। বড় বড় আম গাছে ঘেরা ছিল বাড়িটা। একাত্তর সালে রাজাকার এবং পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী
বাঙালিদের ধরে-বেঁধে নিয়ে এসে এখানে জবাই করত। বাড়িটি বধ্যভূমিতে পরিণত হয়েছিল। আমরা তখন চট্টগ্রাম। চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলের ব্রিটিশ আমলের লাল ইটের বিল্ডিংটি ছিল অসাধারণ। দক্ষিণ পাশে নান্দনিক ফুলের বাগান, তারপরেই রয়েছে বিশাল মাঠ। মাঠে খেলাধুলা করতাম টিফিন পিরিয়ডে কিংবা ছুটির পরে। স্কুল টিমে ফুটবল খেলেছি। মাঠের সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রাণের আরেক শেকড়।
