রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) ভিসি অধ্যাপক ড. নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহর ১১১টি অনিয়ম ও দুর্নীতির শ্বেতপত্র প্রকাশ করা হয়েছে। গতকাল শনিবার সকাল সাড়ে ১১টায় বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাফেটেরিয়ায় অধিকার সুরক্ষা পরিষদ আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ শ্বেতপত্র প্রকাশ করা হয়। পরিষদের আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মো. মতিউর রহমান সংবাদ সম্মেলনে শ্বেতপত্রটি উপস্থাপন করেন। এ সময় তিনি বলেন, ভিসি নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ অসংখ্য দুর্নীতি করেছেন। আমরাও তার অনেক দুর্নীতি সম্পর্কে জানি। যেসব দুর্নীতির ডকুমেন্ট আমাদের কাছে আছে, শুধু সেগুলো প্রকাশ করা হলো। এ সময় উপস্থিত ছিলেন অধিকার সুরক্ষা পরিষদের সদস্য সচিব খাইরুল কবীর সুমন, সদস্য ড. মো. গাজী মাজহারুল, ড. তুহিন ওয়াদুদ, খন্দকার জাহাঙ্গীর আলম, আসাদুজ্জামান মন্ডল প্রমুখ।
ড. মো. মতিউর রহমান বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে আমরা লজ্জিত এজন্য যে আপনাদের সামনে গবেষণাপত্র বা গবেষণার ফল প্রকাশ না করে আমরা উপাচার্য প্রফেসর ড. নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহর অনিয়ম-দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার শ্বেতপত্র (প্রথম খণ্ড) প্রকাশ করছি। আমি আপনাদের সামনে শ্বেতপত্রে উল্লেখিত ১১১টি অভিযোগের বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো তুলে ধরছি। অভিযোগের দালিলিক প্রমাণসহ সবকিছু শ্বেতপত্রে রয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, উপাচার্য প্রফেসর ড. নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ ২০১৭ সালের ১৪ জুন বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করার পর ক্যাম্পাসে ধারাবাহিক অনুপস্থিত থেকে ঢাকার লিয়াজোঁ অফিসে বসে ব্যাপকভাবে একাডেমিক, প্রশাসনিক ও আর্থিক অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, জালিয়াতি, ভর্তি বাণিজ্য, হয়রানি, নির্যাতন, নিপীড়ন আর স্বেচ্ছাচারিতা চালিয়ে যাচ্ছেন। উপাচার্য এসব দুর্নীতি করেন সংঘবদ্ধভাবে। তবে তিনি এসবের মূল নায়ক। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েক জন শিক্ষক ও কর্মকর্তা এবং অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েক জন শিক্ষককে নিয়ে এ সংঘবদ্ধ দুর্নীতির চক্র তৈরি করেছেন তিনি। এসব শিক্ষক ও কর্মকর্তা বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার সব কমিটি, তদন্ত কমিটি, সিন্ডিকেটসহ কেনাকাটা সবকিছু করে থাকেন। উপাচার্য তার দুর্নীতির সহযোগীদের বিভিন্নভাবে পদোন্নতি-পদ দিয়ে পুরস্কৃত করে আসছেন। সম্প্রতি ১৮ জন ডেপুটি রেজিস্ট্রারকে রেখে সময় হওয়ার আগেই তড়িঘড়ি করে দুর্নীতির অন্যতম সহযোগী ও জাতীয় পতাকার অবমাননার এজাহারভুক্ত আসামি আমিনুর রহমানকে অতিরিক্ত রেজিস্ট্রার হিসেবে পদোন্নতি দিয়েছেন। কারণ তিনি উপাচার্যের একান্ত সচিব।
নিয়োগ দুর্নীতি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগে উপাচার্যের ব্যক্তিগত সংস্থা জানিপপ এবং কিছু কিছু অঞ্চলের প্রার্থীরা প্রাধান্য পেয়ে থাকেন। এছাড়া নিয়োগ বাণিজ্যেরও অভিযোগ আছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগ এবং উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগে শিক্ষক নিয়োগ বোর্ডে উপাচার্য ড. নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ এবং তার মা দুই জন মিলেই শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছেন। সমাজবিজ্ঞান বিভাগের বিভাগীয় প্রধান উপাচার্য নিজেই, ঐ অনুষদের ডিন পদেও রয়েছেন উপাচার্য। উপাচার্য হিসেবে তিনি নিয়োগ বোর্ডের সভাপতি, অনুষদের ডিন হিসেবেও তিনি নিয়োগ বোর্ডের সদস্য আর বিভাগীয় প্রধান হিসেবে তিনিই সদস্য। অপরদিকে তার মা ‘বিষয় বিশেষজ্ঞ’ সদস্য। প্রফেসর ড. আবুল কাশেম মজুমদারকে (বিইউপি-এর বর্তমান উপ-উপাচার্য) অন্তত ১০টি নিয়োগ বোর্ডের সদস্য করা হয়েছে। এক্ষেত্রে বিষয় সংশ্লিষ্টতা দেখা হয়নি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের প্রফেসর ড. শুচিতা শারমিনকে করা হয়েছে চারটি বিভাগের নিয়োগ বোর্ডের সদস্য।
উপাচার্যের একান্ত সচিব (পিএস) আমিনুর রহমানের ভায়রা-ভাই এ কে এম মাহমুদুল হককে ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেক্ট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। নিয়োগের এক বছর পার হতে না হতেই তাকে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে পুনঃনিয়োগ দিয়েছেন। উপাচার্য তার ব্যক্তিগত সহকারীর চার আত্মীয়কে অবৈধভাবে নিয়োগ দিয়েছেন। আইন লঙ্ঘন করে পরিচালক (অর্থ ও হিসাব) পদে নিয়োগ দিয়েছেন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের একজন অধ্যাপককে।
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে অধিকাংশ ক্রয় ক্ষেত্রেই সরকারি ক্রয়নীতি অনুসরণ না করে অনিয়ম ও দুর্নীতি করা হয়েছে। উপাচার্যের দুর্নীতির সহযোগী শিক্ষক, কর্মকর্তারা গত সাড়ে তিন বছরে কয়েক লাখ টাকা আত্মসাত্ করেছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বিশেষ উন্নয়ন প্রকল্পে উপাচার্যের ব্যাপক দুর্নীতি প্রমাণিত হয়েছে। ২০১৮ সালে যেই প্রকল্প শেষ হওয়ার কথা তা এখনো ৩৫ শতাংশ কাজের মধ্যেই রয়ে গেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে টেন্ডার বাণিজ্য এখন ওপেন-সিক্রেট। ই-টেন্ডারের নামে নিজেদের পছন্দের লোককে কাজ পাইয়ে দিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐ চক্র। উপাচার্যের পিএস আমিনুর রহমান টেকনিক্যাল লোক না হয়েও আইন লঙ্ঘন করে ই-টেন্ডারের এডমিন হয়েছেন। তিনি একাই প্রাই দুই শতাধিক কেনাকাটার কমিটিতে রয়েছেন। উপাচার্য ক্যাম্পাসে না থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয়ে আপ্যায়ন ব্যয় দেখানো হয়েছে অন্তত ২১ লাখ টাকা। প্রশিক্ষণ পরিচালনায় বিশ্ববিদ্যালয় হতে বিপুল পরিমাণ অর্থ তছরূপ করা হচ্ছে। ড. নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ উপাচার্য হিসেবে যোগদানের পর থেকে প্রায় তিন বছর পর্যন্ত বিভিন্ন অনুষদের ডিন, বিভাগীয় প্রধান ও পরিচালকসহ একাই ১৬টি প্রশাসনিক পদে থেকে নানা ধরনের দুর্নীতি ও অনিয়ম করেছেন। সমাজবিজ্ঞান বিভাগে বিভাগীয় প্রধান পদ দখল করে অন্তত ১০ লাখ টাকার কোনো হিসাব দিচ্ছেন না।
এছাড়া ড. নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ ‘সুপার সুপারভাইজার’। ড. ওয়াজেদ রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং ইনস্টিটিউট এর অধীনে এমফিল এবং পিএইচডি কোর্সের অর্ধশতাধিক গবেষকের সুপারভাইজার তিনি নিজেই। তিনি একাই একই সঙ্গে বিভিন্ন বিভাগের ২৬টি কোর্স পাঠদানেরও দায়িত্বও নিয়েছিলেন। তিনি এসব কোর্স নেওয়ার নামে নিয়ম বহির্ভূতভাবে অর্থ উপার্জন করেছেন। খাতা মূল্যায়ন করেন তার পিএ আবুল কালাম আজাদকে (কর্মচারী) দিয়ে। উপাচার্য আইন লঙ্ঘন করে এ পর্যন্ত ১৪ জন কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে সাময়িক বরখাস্ত করে রেখেছেন।
ড. কলিমউল্লাহর উপস্থিতি-অনুপস্থিতির হিসাব করে অধিকার সুরক্ষা পরিষদ দেখেছে যে ১৪ জুন ২০১৭ এ উপাচার্য হিসাবে যোগদানের পর থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২১ পর্যন্ত মোট ১ হাজার ৩৫২ দিনের মধ্যে ১ হাজার ১১৫ দিনই তিনি ক্যাম্পাসে অনুপস্থিত থেকেছেন। অর্থাত্ উপস্থিত ছিলেন মাত্র ২৩৭ দিন। কখনোই তিনি পূর্ণদিবস উপস্থিত থাকেননি, কখনো ক্যাম্পাসে থাকেন এক থেকে দুই ঘণ্টা।
সংবাদ সম্মেলনে দাবি জানানো হয়, ড. নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহকে দ্রুত অপসারণ করে তাকে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তি প্রদান করতে হবে, যাতে অন্য কোনো উপাচার্য এমন অপকর্ম করতে না পারেন। এছাড়া এই উপাচার্যের আমলের সব নিয়োগ, আর্থিক অনিয়ম-দুর্নীতির ঘটনা উচ্চ পর্যায়ে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
