গোটা জীবন একা হেঁটেছেন রমা চৌধুরী। ১৯৪১ সালের ১৪ অক্টোবর চট্টগ্রামের বোয়ালখালী থানার পোপাদিয়া গ্রামে জন্ম। তিনি দক্ষিণ চট্টগ্রামের প্রথম নারী, যিনি ষাটের দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে এমএ ডিগ্রি লাভ করেন। তারপর ১৯৬২ সালে কক্সবাজার বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় অন্ধকার নেমে আসে তিন সন্তানের জননী রমা চৌধুরীর জীবনে। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী তাঁর সন্তান ও মায়ের সামনে তাঁকে চরমভাবে লাঞ্ছিত করে। শুধু নির্যাতন করেই ক্ষান্ত হয়নি, তাঁর বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিয়েছিল। পাকিস্তানি দোসরদের হাত থেকে পালিয়ে পুকুরে নেমে আত্মরক্ষা করেন। এর পরের ইতিহাস আরো কষ্টের, আরো বেদনার। স্বামী তাঁকে ছেড়ে ভারতে চলে গেলেন। নিজের সম্ভ্রম হারানোর ভয়ংকর ঘটনাকে আড়াল করে তিনি তিন শিশুসন্তান ও মাকে নিয়ে পথে পথে ঘুরেছেন। সে সময় তিনি পাননি কোনো আশ্রয় ও সহযোগিতা। এই সমাজ তাঁকে সহজভাবে গ্রহণ করেনি।
তাঁর বড় ছেলে সাগর সাড়ে পাঁচ বছর বয়সে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ১৯৭১ সালের ২০ ডিসেম্বর মারা যায়। সাগরের মৃত্যুর ১ মাস ২৮ দিনের মাথায় মারা যায় তিন বছরের টগরও। দুই সন্তানের দেহ মাটিতে আছে বলে রমা চৌধুরী জুতা পরা বন্ধ করে দেন। দ্বিতীয়বার সংসার বাঁধতে গিয়ে প্রতারণার শিকার হন। তৃতীয় ছেলে টুনু ১৯৯৮ সালের ১৬ ডিসেম্বর বোয়ালখালীর কানুনগোপাড়ায় সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায়। সাগর, টগর, টুনু—তিন সন্তানকে হারিয়ে তিনি পাথর হয়ে যান। ৩০ বছর তিনি খালি পায়ে হেঁটেছেন। তিনি বলতেন, ‘যে মাটিতে আমার বাচ্চারা ঘুমিয়ে আছে, সে মাটির উপর দিয়ে আমি জুতো পায়ে হাঁটি কেমন করে?’
যুদ্ধপরবর্তী সময়ে তিনি লেখালিখিকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। জীবিকার প্রয়োজনে নিজের লেখা বই ফেরি করে বেড়িয়েছেন হেঁটে হেঁটে। সে সময় রমা চৌধুরীর পাশে এসে দাঁড়ালেন আলাউদ্দিন খোকন। ১৯৯৫ সালের মার্চ মাসে মস্তিষ্কের রক্তক্ষরণজনিত রোগে রমা চৌধুরী আক্রান্ত হন। চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে দেড় মাস আলাউদ্দিন তাঁর সেবাশুশ্রূষা করেছেন। তাঁর সমস্ত বইয়ের প্রকাশক আলাউদ্দিন ছায়াসঙ্গী হিসেবে সবসময়ই তাঁর পাশে থেকেছেন। প্রবন্ধ, উপন্যাস ও কবিতা মিলিয়ে তাঁর বই সংখ্যা ১৮। লেখালেখির পাশাপাশি তিনি একইসঙ্গে পরিচালনা করেছেন ‘দীপংকর স্মৃতি অনাথালয়’ নামে অনাথ আশ্রম। ২০১৮ সালে বেগম রোকেয়া পদক (মরণোত্তর) লাভ করেন।
রমা চৌধুরী ২০১৩ সালে দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়, বঙ্গবন্ধুর কন্যা হিসেবে শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করেছিলেন। প্রধানমন্ত্রী আর্থিক সহযোগিতা করতে চাইলে রমা চৌধুরী বিনয়ের সঙ্গে তা ফিরিয়ে দেন। প্রধানমন্ত্রীকে নিজের লেখা ‘একাত্তরের জননী’ গ্রন্থটি উপহার দিয়ে আসেন।
২০১৮ সালের ৩ সেপ্টেম্বর ৭৬ বছর বয়সে পৃথিবীর মায়া ছেড়ে যাওয়া একাত্তরের এই মা জননীকে আমি আমার অন্তরের অন্তস্তল থেকে জানাই গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।
শ্রীধর দত্ত
