কোভিড-১৯ মোকাবিলায় বিশ্বের উন্নত দেশগুলো শুরু থেকে ভ্যাকসিন আবিষ্কারের চেষ্টা করে আসছে। রাশিয়া গত বছরের ১১ আগস্ট সরকারিভাবে ‘স্পুটনিক-৫’ ভ্যাকসিনের অনুমোদন দেয়। গত ১১ ডিসেম্ব্বর যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন প্রথম ভ্যাকসিন হিসেবে ‘ফাইজার’ এবং ১৮ ডিসেম্ব্বর দ্বিতীয় ভ্যাকসিন ‘মডার্না’কে অনুমোদন দেয়। গত ২১ জানুয়ারি ভারতের পক্ষ থেকে ২০ লাখ ‘কোভিশিল্ড’ ভ্যাকসিনের একটি চালান উপহারস্বরূপ বাংলাদেশে এসে পৌঁছেছে। অতি সম্প্রতি আরো একটি চালান এসে পৌঁছেছে ক্রয়সূত্রে সিরাম ইনস্টিটিউট থেকে। এ ছাড়া বাংলাদেশ সরকার ভারতের সিরাম ইনস্টিটিউট থেকে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় এবং অ্যাস্ট্রাজেনেকার উদ্ভাবিত ৩ কোটি ভ্যাকসিন অগ্রিম ক্রয় করেছে। এ ব্যাপারে সরকারের আগে থেকেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে গত ৫ জানুয়ারি, ২০২১ একনেক সভায় টিকা প্রাপ্তির বাজেট ৬ হাজার ৭৮৬ কোটি ৫৯ লাখ টাকার অনুমোদন দিয়েছে যার মধ্যে বিশ্বব্যাংক দেবে ৫০ কোটি ডলার এবং এআইআইবি দেবে ১০ কোটি ডলার। দেশের বর্তমান জনসংখ্যা ১৭ কোটি ২০ লাখ ধরে টিকা বিতরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিগত ২৭ জানুয়ারি ঢাকার কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে করোনার টিকাদান কার্যক্রম উদ্বোধন করেন। ঐদিন ২৬ জনকে টিকা দেওয়া হয়। পরদিন কুর্মিটোলাসহ রাজধানীর আরো চারটি হাসপাতালে মোট ৫৪০ জনকে টিকা দেওয়া হয়। তাদের পর্যবেক্ষণ শেষে গণটিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়, যা ভারতে উত্পাদিত টিকা হলেও তা আবিষ্কৃত হয়েছে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিত্সাবিজ্ঞানীদের দ্বারা। এই টিকার চাহিদা এখন বিশ্বব্যাপী। ফাইজার এই টিকা তৈরি করে চাহিদা কুলিয়ে উঠতে পারছে না। ব্রিটেনে তাই ফাইজারের টিকার সঙ্গে অক্সফোর্ডের টিকাও দেওয়া হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে ৭ই ফেব্রুয়ারি থেকে ঢাকায় ৪৬টি এবং সারা দেশে ৯৫৫টি সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে টিকাদান কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে রাজধানীতে ২০৪টি টিম এবং জেলা ও উপজেলায় ৯৫৫টি হাসপাতালে ২ হাজার ১৯৬টি টিম টিকা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। প্রতিটি টিম দৈনিক ন্যূনতম ১৫০ জনকে টিকা দিতে পারে। এ হিসাবে চলমান প্রক্রিয়ায়ও প্রতিদিন ৩ লাখ ৩০ হাজার মানুষকে টিকা দেওয়া সম্ভব। এছাড়া ভ্যাকসিনবিষয়ক কার্যক্রমের জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে ৭ হাজার ৩৪৪টি টিম।
সরকারি তথ্যমতে গত ১৫ মার্চ পর্যন্ত সারা দেশে মোট টিকা নিয়েছেন ৪৫ লাখ ৫০ হাজার ৯৪০ জন যার মধ্যে পুরুষ বেশি এবং মহিলা তুলনামূলকভাবে কম। ভ্যাকসিন গ্রহণকারীদের মোট পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা গেছে ৪২৬ জনের। পরিকল্পনা অনুযায়ী সবাইকে টিকার প্রথম ডোজ দেওয়া সম্ভব হবে এবং এখন পর্যন্ত যেভাবে জনতার সাড়া মিলেছে, নিবন্ধন হচ্ছে, তাতে পরিকল্পনামাফিক ৫০ লাখ মানুষকে টিকা দেওয়া সম্ভব হবে। এই লক্ষ্য পূরণে টিকার নিবন্ধন প্রক্রিয়া আরেক ধাপ শিথিল করে ৩৫ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগের কাছে এই মুহূর্তে ৭০ লাখ ডোজ ‘অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকা’র করোনা ভ্যাকসিন (টিকা) রয়েছে।
সরকার দুই বছরে পাঁচ ধাপে দেশের ৮০ শতাংশ মানুষকে করোনার টিকাদানের পরিকল্পনা নিয়েছে। তিন পর্বে (ফেইজ) মোট পাঁচ ধাপে ১৩ কোটি ৮২ লাখ ৪৭ হাজার ৫০৮ জন টিকা পাবে। ৭০ লাখ মানুষকে টিকায় অগ্রাধিকারের তালিকায় রাখা হয়েছে, যারা করোনা প্রতিরোধে সামনের কাতারে ছিলেন। জাতীয়ভাবে কোভিড-১৯ টিকা বিতরণ ও প্রস্তুতি পরিকল্পনা নিয়ে তৈরি করা খসড়া অনুযায়ী, জনপ্রতি দুটি করে মোট ২৭ কোটি ৬৪ লাখ ৯৫ হাজার ১৬ ডোজ টিকা দেওয়া হচ্ছে। প্রথম পর্যায়ের প্রথম ধাপে ৫১ লাখ ৮৪ হাজার ২৮২ জন টিকা পাবে, যা মোট জনসংখ্যার ৩ শতাংশ। দ্বিতীয় ধাপে মোট জনসংখ্যার ৭ শতাংশ অর্থাত্ ১ কোটি ২০ লাখ ৯৬ হাজার ৬৫৭ জন টিকার আওতায় আসবে। শেষ ধাপে জনসংখ্যার ৪০ শতাংশ অর্থাত্ ৬ কোটি ৯১ লাখ ২৩ হাজার ৭৫৪ জনকে টিকার আওতায় আনার পরিকল্পনা করেছে স্বাস্থ্য বিভাগ।
নিরপেক্ষ বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিদায়ি বছরে করোনা ব্যবস্থাপনায় সরকার যত তত্পর ছিল, নতুন বছরে করোনার ভ্যাকসিন ব্যবস্থাপনায় সরকারের তত্পরতা তথা সাফল্য এরই মধ্যে প্রশংসা কুড়িয়েছে দেশে-বিদেশে যা গণমাধ্যমের বদৌলতে আমরা প্রতিনিয়ত দেখতে পাচ্ছি। ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী এখন পর্যন্ত মারাত্মক কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কে জানা যায়নি। তবে টিকা নেওয়ার পর যে কোনো সমস্যা হলে অবশ্যই দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে যেতে হবে এবং চিকিত্সকের পরামর্শ নিতে হবে। কোভিড-১৯ পরীক্ষার রিপোর্ট নেগেটিভ আসার ২৮ দিন পর টিকা দেওয়া যাবে। সরকারের হাতে এখনো ৭০ লাখ টিকা আছে এবং পরিকল্পনামতে, আগামী এপ্রিলের মধ্যে ৫০ লাখ মানুষের টিকা দেওয়া নিশ্চিত করতে চায় সরকার। এ পর্যায় করোনা ভ্যাকসিন বাস্তবায়নের কতিপয় দিক, যা এরই মধ্যে আলোচনায় এসেছে তা নিয়ে আলোচনা। প্রথমত, অনলাইন নিবন্ধনে ভোগান্তি বিশেষত নিম্নশ্রেণি যেমন—রিকশাচালক, কাজের লোক, দিনমজুর, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর লোকজনকে কীভাবে টিকা কর্মসূচির আওতাভুক্ত করা সম্ভব এবং এ ব্যাপারে অনেকে বলছেন ‘ভলান্টিয়ার সংগ্রহ করে তাদের সংক্ষিপ্ত প্রশিক্ষণ দিয়ে এলাকার লোকজনকে টিকার জন্য তালিকাভুক্ত করা, প্রয়োজনে এলাকাভিত্তিক ‘রেজিস্ট্রেশন বুথ’ বসিয়ে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর লোকজনকে নিবন্ধন করাতে হবে ভলান্টিয়ার দিয়ে, যারা হতে পারে ক্ষমতাসীন দলের স্বেচ্ছাসেবক, যারা গত বোরো ও আমন ধান কাটার মৌসুমে কৃষকের জমিতে ধান কেটে দিয়ে সহায়তা করেছিল, যা ছিল একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। দ্বিতীয়ত ভ্যাকসিন গ্রহণের ব্যাপারে অপপ্রচার বন্ধ করতে হবে জোরালো ভাবে। বিশেষত, টিকার প্রচারে ‘মাইকিং, লিফলেট বিতরণ’সহ অন্যান্য প্রচারমূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে। সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের এক জরিপে দেখা গেছে, দেশের ৮৪ শতাংশ মানুষ করোনা ভ্যাকসিন নিতে আগ্রহী হলেও নেতিবাচক প্রচারের কারণে কিছুটা ভয় সৃষ্টি হওয়ায় এখনই ভ্যাকসিন নিতে চাইছে না দেশের ৫২ শতাংশ মানুষ। তারা করোনা ভ্যাকসিনটির আসলেই ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়া আছে কি না, তা যাচাই করতে সময় নিতে চাইছেন। গত ৮ ডিসেম্ব্বর আন্তর্জাতিক জার্নাল লেনসেটে প্রকাশিত অক্সফোর্ড ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা ও সুরক্ষাবিষয়ক রিপোর্টে দেখা গেছে, ভ্যাকসিনটির ট্রায়ালের সময় যুক্তরাজ্য, ব্রাজিল ও দক্ষিণ আফ্রিকার সাদা, কালো ও এশিয়ানসহ মিশ্র গ্রুপের ১৮-৫৫, ৫৬-৫৯ ও ৭০ বছর থেকে তদূর্ধ্ব বয়সি তিনটি গ্রুপের মানুষ অন্তর্ভুক্ত ছিল। এ ছাড়া ডায়াবেটিস, হার্ট ও ফুসফুসসহ শ্বাসতন্ত্রের রোগীরা এসব ট্রায়ালের অন্তর্ভুক্ত ছিল এবং নিরাপদ বলে প্রমাণিত হওয়ায় তারাও অক্সফোর্ড ভ্যাকসিনটি নিতে পারেন। তৃতীয়ত, এদিক থেকে ভারতে উত্পাদিত অক্সফোর্ডে তৈরি টিকা যথাসময়ে সংগ্রহের ব্যবস্থা করে বর্তমান সরকার দূরদৃষ্টির প্রমাণ দিয়েছে। অন্য অনেক দুর্যোগের মতো করোনা দুর্যোগও সরকার কাটিয়ে উঠছে। বাংলাদেশ সরকার নিজেদের প্রচেষ্টায় এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠান দ্বারা দ্রুত ভারত থেকে এই টিকা আনার ব্যবস্থা করে ভালো কাজ করেছে যার বদৌলতে বিশ্বের প্রথম ছয়টি টিকা প্রাপ্তি/গ্রহণের দেশের তালিকায় বাংলাদেশ স্থান করে নিয়েছে। তবে কোনোভাবেই বেসরকারি হাসপাতাল/সংস্থাকে টিকা প্রদানের দায়িত্ব দেওয়া যাবে না। তাহলেই টিকা নিয়ে কালোবাজারি হবে, নকল টিকা বাজারে প্রবেশ করবে এবং সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন্ন হবে, যা গত বছরের তিক্ত উদাহরণ আমাদের সামনে রয়েছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও অক্সফাম এরই মধ্যে অভিযোগ তুলেছে, ধনী দেশগুলো তাদের প্রয়োজনের অতিরিক্ত ভ্যাকসিন কিনে নিয়ে মজুত করার ব্যবস্থা করেছে, যার উদ্দেশ্য নিজ দেশের বাড়তি প্রয়োজন মেটানো, বাজারে টিকার কৃত্রিম অভাব সৃষ্টি করা এবং উচ্চমূল্যে ভবিষ্যতে তা বিক্রি করে মুনাফা অর্জন। বাংলাদেশে তা হওয়ার কোনো প্রকার সম্ভাবনা নেই; চতুর্থত, ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা ঠিক রাখার জন্য সরবরাহ চেইনসহ সংরক্ষণাগারের সর্বত্রই নিম্ন তাপমাত্রা বজায় রাখার ব্যাপারটি সরকারি মনিটরিং ব্যবস্থার অধীন রাখতে হবে। সরকারিভাবে আমদানি করা ভ্যাকসিনটির সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে অক্সফোর্ড ভ্যাকসিনটির বেসরকারিভাবে আমদানি ও বিক্রি বন্ধ রাখলে নকল এবং ভেজাল হওয়ার বিষয়ে মানুষের মধ্যে সন্দেহের মাত্রা কিছুটা দূর হবে। অক্সফোর্ডের কোভিশিল্ড ভ্যাকসিনটির উত্পাদনকারী প্রতিষ্ঠান সিরাম ইনস্টিটিউট ভারতে অবস্থিত হলেও এটি আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন ভ্যাকসিন উত্পাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি প্রতিষ্ঠান এবং ভ্যাকসিনটি অক্সফোর্ডের ফর্মুলায় তৈরি হচ্ছে। সিরাম ইনস্টিটিউটের অক্সফোর্ড ভ্যাকসিনটির একটি পূর্ণ ডোজ হচ্ছে ০.৫ মিলি এবং এর প্রতি ডোজে প্রায় ৫ হাজার কোটি ভাইরাস কোষ রয়েছে। সর্বশেষে বলা যায়, সরকারের ভ্যাকসিন বিতরণ/ব্যবস্থাপনা সর্বজনীন যেখানে থাকবে না জাত পাতের কোনো ভেদাভেদ, নারী-পুরুষ,ধর্ম-অধর্ম,গরিব-ধনীর কোনো ভেদাভেদ, সরকারি স্বাস্থ্য সংস্থা ও জনপ্রশাসন, স্থানীয় সরকার, কমিউনিটির গণ্যমান্য ব্যক্তি এবং এনজিওর একসঙ্গে কাজ করতে হবে আর সরকার হবে তার প্রথম সারির কান্ডারি।
n লেখক :অধ্যাপক, গবেষক, ডিন ও সিন্ডিকেট
সদস্য, সিটি ইউনিভার্সিটি, ঢাকা
