ফুলেল শুভেচ্ছায় সিক্ত রাবেয়া-রোকাইয়া

আপডেট : ১৬ মার্চ ২০২১, ১৮:২৯

বিকেল সাড়ে চারটা নাগাদ হায়েচ গাড়িটি বাড়ির উঠোনে গিয়ে থামে। রাবেয়াকে কোলে নিয়ে বাবা রফিকুল ইসলাম এবং রোকাইয়াকে কোলে নিয়ে মা তাসলিমা খাতুন যখন গাড়ি থেকে নামলেন, তখন সবার চোখে মুখে আনন্দের ঝিলিক। এলাকাবাসী আর স্বজনদের ফুলেল শুভেচ্ছায় সিক্ত হলেন তারা।

সোমবার (১৫ মার্চ) পাবনার চাটমোহর উপজেলার মুলগ্রাম ইউনিয়নের আটলংকা গ্রামের বাড়িতে পৌঁছার পর তাদের ফুলেল শুভেচ্ছায় বরণ করে নেয় স্বজন-প্রতিবেশীরা। রাবেয়া-রোকাইয়াকে ফিরে পেয়ে আনন্দে উদ্বেলিত গোটা গ্রাম। তাদের একনজর দেখতে ভিড় জমায় আশপাশের মানুষ। শুভেচ্ছা জানায় উপজেলা প্রশাসন। 

সিএমএইচ-এ দীর্ঘদিনের চিকিৎসা শেষে জোড়া মাথা আলাদা হয়ে সাড়ে তিন বছর পর নিজেদের বাড়িতে ফিরলো বহুল আলোচিত রাবেয়া-রোকাইয়া।

দুই বোনের মধ্যে রোকাইয়া শারীরিকভাবে নিষ্প্রভ থাকলেও, রাবেয়ার মুখে হাসি যেন লেগেই ছিল। তার মুখের হাসিতেই যেন আনন্দ ছড়িয়েছে সবার প্রাণে। বাবা-মায়ের সঙ্গে হেঁটেই নিজের ঘরে যায় সে। আর দীর্ঘদিন পর স্বজনদের কাছে পেয়ে আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়েন রাবেয়া-রোকাইয়ার মা তাসলিমা খাতুন।

স্থানীয়রা জানায়, তারা কখনো ভাবতেও পারেননি জোড়া মাথার রাবেয়া-রোকাইয়াকে আলাদা করা সম্ভব। এই অসম্ভব কাজ সম্ভব হওয়ায় খুশি তারা। হতাশা কাটিয়ে নিজের সন্তানদের আলাদাভাবে ফিরে পাওয়ায় উচ্ছ্বসিত রাবেয়া-রোকাইয়ার বাবা-মা।
 
বাবা রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘জোড়া মাথার জমজ শিশু জন্মের পর আমাদের মাঝে হতাশা নেমে আসে। অনেকে অনেক রকম কথা বলেছে। কটু কথাও শুনতে হয়েছে। কিন্তু এখন সেই শিশুদের জন্য আজ সারাবিশ্বে আমি পরিচিত। রাবেয়া-রোকাইয়ার বাবা হিসেবে আমি গর্বিত।’ 

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, চিকিৎসকসহ গণমাধ্যমকর্মীদের সহযোগিতা কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করে তাদের ধন্যবাদ জানান রফিকুল ইসলাম।

মা তাসলিমা খাতুন বলেন, ‘এরপরেও যদি দেশে কারও জোড়া মাথার জমজ সন্তান জন্ম হয় তাদের বলবো, আপনাদের ভয় নেই। আমাদের সঙ্গে সরকার আছে, হাঙ্গেরির বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক টিম আছে। জোড়া মাথা আলাদা করা আর কঠিন কিছু নয়। আমাদের সঙ্গে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আছেন। যিনি মায়ের মতো বাংলাদেশের জনগণের সব দুঃখ-কষ্ট মুছিয়ে দিতে অক্লান্তভাবে কাজ করে চলেছেন। আমাদের অশেষ কৃতজ্ঞতা প্রধানমন্ত্রীসহ চিকিৎসকদের।’


নিজেদের বাড়িতে ফুলেল শুভেচ্ছায় সিক্ত রাবেয়া-রোকাইয়া। ছবি: ইত্তেফাক

রাবেয়া-রোকাইয়ার আসার খবর পেয়ে তাদের বাড়িতে ছুটে যান চাটমোহর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সৈকত ইসলাম। তিনি গণমাধ্যমকর্মীদের জানান, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে কৃতজ্ঞতা যে, চাটমোহরের মতো প্রত্যন্ত অঞ্চলের একটি পরিবারের দুর্দশার কথা জানতে পেরে তিনি দায়িত্ব নিয়েছিলেন। এটি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বড় উদারতা ও মানবিকতার পরিচয়। 

রাবেয়া-রোকেয়া ২০১৬ সালের ১৬ জুলাই পাবনার চাটমোহর উপজেলার রফিকুল ইসলাম ও তাসলিমা দম্পতির ঘরে মাথা জোড়া লাগা অবস্থায় জন্মগ্রহণ করে। গুরুতর এই ত্রুটি নিয়ে ছোট্ট শিশু দুটি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৮ সালের ২৪ অক্টোবর ‘শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইন্সটিটিউট’ উদ্বোধনকালে তাদের চিকিৎসার দায়িত্ব নেন। গঠন করা হয় মেডিকেল বোর্ড। চিকিৎসার জন্য তাদের হাঙ্গেরির বুদাপেস্টের একটি হাসপাতালে ৭ মাস রাখা হয়। বেশ কয়েক দফা অপারেশনও হয়েছিল শিশু দুটির।

সর্বশেষ, ২০১৯ সালের ২ আগস্ট ঢাকার সিএমএইচ হাসপাতালে ঘটে এক যুগান্তকারী ঘটনা। দেশের বিশেষজ্ঞ ডাক্তার ছাড়াও হাঙ্গেরির ৩৫ জন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার টানা ৩৩ ঘণ্টা অপারেশন চালিয়ে দুই বোনের জোড়া লাগা মাথা আলাদা করেন। সেই সার্জারির পর সিএমএইচ হাসপাতালে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাবেয়া-রোকেয়াকে দেখে আসেন।

এদিকে মুজিব জন্মশতবর্ষের এই সময়ে রাবেয়া-রোকেয়ার গৃহ প্রত্যাবর্তন বড় পাওয়া বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গত রবিবার (১৪ মার্চ) ‘মুজিব জন্মশতবর্ষে রাবেয়া-রোকেয়ার শুভ গৃহ প্রত্যাবর্তন’ অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।

ইত্তেফাক/এসজেড