তরুণদের ভাবনায় যুক্ত হোক মুক্তিযুদ্ধ ও দেশপ্রেমের আদর্শ

আপডেট : ১৬ মার্চ ২০২১, ২২:২২

 

৩০ লাখ শহিদের রক্ত এবং লাখ লাখ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি ১৯৭১ সালের প্রিয় স্বদেশকে স্বাধীন ভূখণ্ড হিসাবে, অনেক ত্যাগ ও সংগ্রামের বিনিময়ে। স্বাধীনতার প্রায় অর্ধশতক পেরিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রসঙ্গে অর্জন, সংকট ও সম্ভাবনা আমরা খুঁজে দেখতে চেয়েছি; আর চেয়েছি এ অনুসন্ধান হোক তারুণ্যের চোখে। সেই তারুণ্য, যাদের প্রত্যেকের জন্ম স্বাধীন বাংলাদেশে, জন্মেই যারা পেয়েছে স্বাধীনতার আস্বাদ, পরাধীনতার শৃঙ্খল বিষয়ে যারা অনভিজ্ঞ এবং যারা দেখেনি ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ, পাকিস্তানি শোষণ সম্পর্কে যাদের প্রত্যক্ষ কোনো ধারণা নেই। প্রিয় বাংলাদেশ, যার সমৃদ্ধি আমাদের গৌরবান্বিত করে, যার ব্যর্থতা আমাদের বিদীর্ণ করে, সেই বাংলাদেশকে আরো বর্ণিল, প্রগতিশীল ও সমৃদ্ধ করতে আজকের তারুণ্যের অপার সম্ভাবনাই যে সবচেয়ে বড় শক্তি, তা আমরা বিশ্বাস করি। পূর্ব প্রজন্মের গৌরব ও কীর্তি পরবর্তী প্রজন্মের স্পর্ধিত হাতে এগিয়ে যায় সামনে, এটিই সমাজ প্রগতির শিক্ষা। তরুণদের ভাবনাগুলো হবে বাংলাদেশের ভাবনা, বাংলাদেশকে নিয়ে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করার ভাবনা। তাদের অস্তিত্বে থাকবে বাংলাদেশ। তরুণদের কাজগুলো হবে বাংলাদেশের কাজ। তাদের সব স্বপ্ন হবে বাংলাদেশকে নিয়ে। তরুণদের এই ভাবনায় যুক্ত করতে হবে গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুর সুমহান আদর্শ।

জানতে হবে, বঙ্গবন্ধুর মতো পুরো জীবন মানুষের জন্য উত্সর্গ করার এমন দৃষ্টান্ত পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। ব্যক্তিচিন্তা, স্বার্থপরতা কিংবা আত্মকেন্দ্রিকতা নয় বরং তার চিন্তা ছিল সামগ্রিক। তিনি আমাদের যে বাংলাদেশ দিয়ে গেছেন তা আমাদেরই রক্ষা করতে হবে। বর্তমান ও ভবিষ্যত্ প্রজন্ম যদি এসব না ভেবে গড্ডলিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে দেয় তাহলে তা হবে অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক।

সেজন্য অসমাপ্ত আত্মজীবনী, কারাগারের রোজনামচা আর বঙ্গবন্ধুর ভাষণগুলো বর্তমান প্রজন্মের তরুণদের পড়াতে/অধ্যয়ন করতে হবে। টুঙ্গিপাড়ার শেখ মুজিবুর রহমান কীভাবে জাতির পিতা হয়ে উঠেছিলেন তা এখানে রয়েছে। ভবিষ্যত্ প্রজন্মের কথা ভেবে তিনি এসব লিখেও রেখে গেছেন। আমাদের অভিভাবকদের উচিত বঙ্গবন্ধুর চারিত্রিক দৃঢ়তা ও জ্ঞানের প্রতি উত্সাহ সৃষ্টি, মানুষের প্রতি আস্থা রাখা, স্বদেশের প্রতি নিজেকে নিয়োজিত করার যে দৃষ্টান্ত—তা শিক্ষা দেওয়া।

আজকের তরুণদের ভেতর রাজনীতিবিমুখতা প্রত্যক্ষ করে কখনো কখনো হতাশ হতে হয়। অপরাজনীতি এবং সত্যিকারের জনকল্যাণমূলক রাজনীতি দুটি সম্পূর্ণ বিপরীত বিষয়। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পর অপরাজনীতির উল্লম্ফন ও বিচিত্র বিকাশ দেখে তরুণদের মনে রাজনীতি সম্পর্কেই অনীহা তৈরি হতে পারে। রাজনৈতিক দলের সদস্য হিসেবে কাজ করতেই হবে—এমন নয়, রাজনীতি সচেতনতাই জরুরি। সেক্ষেত্রে আমাদের স্বাধীন দেশের স্থপতির আদর্শচর্চা একান্ত জরুরি। বঙ্গবন্ধুর দেশাত্মবোধের মানসচিত্তে নতুন প্রজন্ম গড়ে উঠলে দেশ সোনার মানুষে ভরে উঠবে এবং সত্যিকার অর্থেই বাংলাদেশ সোনার বাংলা হয়ে উঠবে। বঙ্গবন্ধুর ত্যাগের মানসিকতা এবং জনগণের প্রতি তার দৃঢ় প্রত্যয় যুগযুগান্তরের দর্শন হিসেবে আমাদের সামনে কাজ করবে। তার দর্শনের পথই আমাদের সোনার বাংলা বিনির্মাণের পথে এগিয়ে নিয়ে যাবে।

আর এই বোধ নিজের মধ্যে জাগ্রত করার জন্য দরকার প্রকৃত ইতিহাস পাঠ। সঙ্গে সঙ্গে মুক্তবুদ্ধির চর্চা, সমাজ-সজ্ঞানতা এবং দেশের মানুষের প্রতি মমত্ববোধ—এসব শিরোধার্য করলেই আজকের তরুণদের মধ্যে স্বদেশপ্রেম এবং জাতির পিতার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জাগরূক রাখবে। বঙ্গবন্ধু আমাদেরকে যে জীবনদর্শন দিয়ে গেছেন, আদর্শ রেখেছেন—তা অমলিন, অমর হবে তরুণ ও ভবিষ্যত্ প্রজন্মের উত্কর্ষতায়।

স্বাধীনতার ৫০ বছরে এই মার্চ মাসে তরুণদের মুক্তিযুদ্ধ আর দেশপ্রেমের আদর্শ লালন ও চর্চাই হোক আমাদের শপথ।

লেখক :কথাসাহিত্যিক, গবেষক।

উপাচার্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।