আনন্দ পট

সিল্ক রোড বিশ্বের প্রাচীনতম বাণিজ্যপথ

আপডেট : ১৭ মার্চ ২০২১, ২০:০৯

 

সিল্ক রোড পৃথিবীর দীর্ঘতম এবং ঐতিহাসিকভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্রাচীন বাণিজ্যপথের একটি নেটওয়ার্ক।  খ্রিস্টপূর্ব ১৩০ অব্দ থেকে ১৪৫৩ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বাণিজ্যিক পথ হিসেবে স্বীকৃত ছিল। এশিয়ার উপমহাদেশীয় অঞ্চলগুলোর মধ্য দিয়ে পূর্ব ও পশ্চিম এশিয়া, ইউরোপ ও ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলকে সংযুক্ত করে এই অঞ্চলগুলোর মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপনের পাশাপাশি অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক এবং ধর্মীয় যোগাযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয় সিল্ক রোড। প্রাচীনকালে এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বাণিজ্যিক পথ হয়ে উঠেছিল এটি। সিল্ক রোড একক কোনো রাস্তা নয়—এটি চীন, মধ্য এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকার কয়েকটি দেশ এবং ইউরোপকে সংযুক্ত করা বাণিজ্যপথের সমষ্টি। চীনের হান সাম্রাজ্যের সময়ে প্রতিষ্ঠিত এই বাণিজ্যপথটি শত শত বছর ধরে বাণিজ্য এবং সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সিল্ক রোডের নামকরণের পিছনে রয়েছে এশিয়ার লাভজনক সিল্ক ব্যবসা। ইউরোপীয় ও মধ্য এশিয়ান বণিকরা স্বর্ণ, আইভরি, পশম, কাচের জিনিসপত্র, ঘোড়া ইত্যাদির বিনিময়ে চীন থেকে বিলাসবহুল ও মূল্যবান সিল্ক কিনে নিয়ে যেত। এই সিল্ককে কেন্দ্র করে আন্তঃদেশীয় বাণিজ্য জমজমাট হয়ে ওঠে এবং এর ফলেই নিরবিচ্ছিন্ন যোগাযোগের প্রয়োজনেই আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু হয় সিল্ক রোডের।  সিল্ক বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে এই বাণিজ্যপথ নির্মাণ করা হয় বলে ১৮৮৭ সালে জার্মান ভূতত্ত্ববিদ ফার্ডিন্যান্ড ভন রিথোফেন এই নামকরণ করেন।

হান সম্রাজ্যেরও প্রায় ৩০০ বছর আগে তত্কালীন পারস্যে অর্থাত্ ইরানে দ্য রয়্যাল রোডের যাত্রা শুরু, যেটি ইরান থেকে তুরস্ক পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। মিশর থেকে উত্তর আফ্রিকা এবং ভারতীয় উপমহাদেশের বাণিজ্যপথ পরবর্তীকালে রয়্যাল রোডের অন্তর্ভুক্ত হয়। আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট পারস্য পর্যন্ত সাম্রাজ্য বিস্তার করার পর রয়্যাল রোডের বেশিরভাগ অংশ অন্তর্ভুক্ত হয় সিল্ক রোডে। প্রাথমিক পর্যায়ে এটি শুধু চীনের অভ্যন্তরে সিল্ক বাণিজ্যে ব্যবহূত হতো। কেন্দ্রস্থল থেকে পশ্চিম প্রান্তীয় অঞ্চলসমূহে পণ্য পরিবহনে বাণিজ্য কাফেলাগুলো মধ্য এশিয়ার ছোট ছোট আদিবাসী গোষ্ঠীর হামলার শিকার হতে থাকে। এই সমস্যা নিরসনে হান সম্রাট উডি তাঁর জেনারেল ঝাং কিয়ানকে এই অঞ্চলসমূহে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনে প্রেরণ করেন। জেনারেল ঝাং কিয়ান আদিবাসী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক স্থাপনের পাশাপাশি বাণিজ্যিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করতে সক্ষম হন। ফলে চীনা ব্যবসায়ীরা পশ্চিমা বিশ্বেও বাণিজ্য বাড়ায় এবং  নিরাপদে ভ্রমণ ও ব্যবসায়িক কাজকর্ম পরিচালনার ক্ষেত্রে সিল্ক রোড বিশ্ব বাণিজ্যে পরিচিত হয়ে ওঠে।

সিল্ক রোডে বাণিজ্য কেন্দ্র, পণ্য কেনাবেচা, বিতরণ, বাজার, গুদামজাতকরণ, ব্যবসায়ীদের জন্য পানি সরবরাহের ব্যবস্থা ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত ছিল। চীন, ইরান, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা এবং ইউরোপের বাণিজ্যিক প্রসার এবং সভ্যতার উন্নয়নে সিল্ক রোডের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। অর্থনৈতিক বাণিজ্যের পাশাপাশি শিল্প, সাহিত্য, ভাষা, ধর্ম, দর্শন ও স্থাপত্যকলাসহ সভ্যতার বিভিন্ন নিদর্শনের বিনিময় ঘটে সিল্ক রোডের কল্যাণে। সিল্ক রোড বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর ব্যবসায়ীরা বাণিজ্য পরিচালনার জন্য সমুদ্রপথ বেছে নেয় এবং সূচনা ঘটে আবিষ্কার-যুগের। সাম্প্রতিক সময়ে চীন সরকার ঐতিহাসিক এই বাণিজ্যপথটি পুনঃনির্মাণের ঘোষণা দিয়েছে।

ইউনেস্কো পৃথিবীর প্রাচীনতম এই বাণিজ্যপথটি ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের অন্তর্ভুক্ত করেছে।