ব্যাংকিং খাতে অনিয়ম দূর করতে হবে

আপডেট : ১৯ মার্চ ২০২১, ২১:১৮

রেজাউল করিম খোকন

 

বর্তমান সময়ে ব্যাংকিং একটি তুমুল প্রতিযোগিতামূলক ব্যাবসায়িক কর্মকাণ্ড হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। প্রতিযোগিতামূলক ব্যাংকিং ব্যবসায় সাফল্য পেতে গ্রাহকদের মেজাজ মর্জির প্রতি খেয়াল রেখে উন্নত সেবা প্রদান করা ব্যাংকারদের নৈতিক দায়িত্ব হয়ে উঠেছে। গ্রাহকদের প্রতি ব্যাংকারের যেমন দায়িত্ব ও কর্তব্য রয়েছে তেমনিভাবে ব্যাংকের প্রতিও গ্রাহকের অনেক দায়িত্ব ও কর্তব্য রয়েছে। ব্যাংকিং কার্যক্রম স্রেফ এক পক্ষ দ্বারা সম্ভব নয় কিছুতেই। গ্রাহকের গচ্ছিত আমানত ঋণগ্রহীতা অন্য গ্রাহকদের মধ্যে বিনিয়োগ করেই ব্যাংক ব্যাবসায়িক মুনাফা অর্জন করে। অতএব, গ্রাহকের সহযোগিতা, সততা, আন্তরিকতা, দায়িত্ববোধ, ব্যাংকিং জ্ঞান, সচেতনতা ইত্যাদি একান্ত প্রয়োজন। ব্যাংকের প্রতি গ্রাহকেরও কিছু করণীয় আছে। যেমন, জামানতি সম্পত্তির ব্যাংকের অধিকারের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন, সার্ভিস রেটের দরকষাকষি না করা, পূর্ব নির্ধারিত চুক্তি অনুযায়ী মুনাফা গ্রহণের ক্ষেত্রে দ্বিধা না করা, বিনিয়োগ চুক্তি অনুযায়ী সময়মতো কিস্তি পরিশোধ, চেক লেখায় কোনোরকম গাফিলতি না করে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন, অনাকাঙ্ক্ষিত চেক প্রদান থেকে দূরে থাকা, ব্যাংকের কাছে বিশ্বস্ত এবং সততার প্রতীক হিসেবে নিজেকে পরিচিত করে তোলাসহ সব ধরনের জালিয়াতি, অন্যায়, অসততা ও প্রতারণা থেকে মুক্ত থেকে এসব বিচ্যুত, নীতিহীন কাজ প্রতিরোধ করে ব্যাংককে প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহ করে সহায়তা প্রদান করা উচিত গ্রাহকদের।

যতই অনাকাঙ্ক্ষিত হোক না কেন দেশে ব্যাংকিং খাতে বাড়ছে অনিয়ম। ভুয়া বন্ধকির মাধ্যমে অস্তিত্বহীন ও ঋণ পরিশোধে অযোগ্য, অক্ষম প্রতিষ্ঠানকে ভুয়া জমি, সরকারি খাসজমি মর্টগেজ রেখে ঋণ দেওয়া, পর্যাপ্ত জামানত ছাড়া ঋণ বিতরণ, শ্রেণিকৃত দায় থাকার পরও ত্রুটিপূর্ণ সহায়ক জামানতের বিপরীতে এবং গ্রাহকের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও ঋণ দেওয়ার ঘটনা হরদম ঘটছে। কিন্তু এসব অনিয়ম এবং হয়রানি বন্ধে নেওয়া হচ্ছে না তেমন কার্যকর কোনো পদক্ষেপ। এভাবেই দিনদিন ব্যাংকিং খাতে অনিয়মের পাল্লা ক্রমেই ভারী হচ্ছে। বাংলাদেশ কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেলের (সিএজি) সর্বশেষ প্রকাশিত অডিট রিপোর্টে ব্যাংকিং খাতে গত ৯ বছরে আর্থিক অনিয়মের পরিমাণ প্রায় ১৭ শতাংশ বেড়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২১ সালে ব্যাংকিং খাতে প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকার অনিয়ম চিহ্নিত হয়েছে। ২০১৩ সালে যা ছিল ৬৫২ কোটি টাকা অর্থাত্ গত ৯ বছরে ব্যাংক খাতে আর্থিক অনিয়মের পরিমাণ বেড়েছে ১৬ দশমিক ৮৬ শতাংশ। সিএমজির গত চার বছরের (২০১৮-২০২১) অডিট রিপোর্টে মোট ৫৯ হাজার ৪৬৬ কোটি টাকার অনিয়ম চিহ্নিত করা হয়েছে, যার মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত ব্যাংকে ৩১ হাজার কোটি টাকার অনিয়ম হয়েছে। এছাড়া সরকারি অর্থের অনিয়মের ৫২ দশমিক ১৮ শতাংশই ব্যাংকিং খাতেই সংঘটিত হচ্ছে বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা ব্যাংকিং খাতের অনিয়ম বন্ধে নিয়ন্ত্রক সংস্থা তথা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সক্ষমতার অভাব, রাজনৈতিক প্রভাব, অযাচিত হস্তক্ষেপ এবং ব্যাংকগুলোর নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার দুর্বলতার পাশাপাশি স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও সুশাসনের অভাবকে বিশেষভাবে দায়ী করেছেন। সাধারণত ব্যাংকে তখনই অনিয়ম বেশি হয়, যখন ব্যাংক কর্মকর্তারা দুর্নীতি করতে উত্সাহ পান। কিংবা অনিয়ম, দুর্নীতি করলে তেমন কোনো শাস্তি হয় না। তবে অনেক সময় প্রভাবশালী মহলের চাপে পড়ে অনিয়মে জড়িয়ে পড়েন অথবা একান্ত অনিচ্ছায়ও বাধ্য হন ব্যাংক কর্মকর্তারা। প্রভাবশালীদের যতই চাপ কিংবা হুমকি থাকুক না কেন নীতিতে অটল থেকে ব্যাংক বিধি ও নিয়মকানুনের বাইরে গিয়ে ঋণ গ্রহীতাকে বিশেষ অন্যায়মূলক সুযোগ-সুবিধা দেওয়া উচিত নয় কোনোভাবেই। ২০২১ সালের সিএজির রিপোর্টের তথ্য অনুযায়ী ব্যাংকিং খাতে অনিয়মের পরিমাণ ১০ হাজার ৯৯৫ কোটি টাকা। ২০১৯ সালের রিপোর্টে চিহ্নিত করা হয়েছিল ৫ হাজার ৫৩৯ কোটি টাকা। ২০১৯ সালে অনিয়ম চিহ্নিত করা হয়েছিল ৮ হাজার ৮৮৫ কোটি টাকা। অস্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় ঝুঁকিপূর্ণ খাতে ঋণ ইস্যু ও নিয়ন্ত্রণহীন এলাকার বাইরে তড়িঘড়ি করে ঋণমঞ্জুর, শাখার আপত্তি উপেক্ষা ও বন্ধকী সম্পত্তির যথাযথ মূল্যায়ন ছাড়া ঋণ প্রদানের মাধ্যমে বিভিন্ন অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে বলে সিএজির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সাধারণভাবে বলা যায়, অধিকাংশ অনিয়মের ক্ষেত্রে ব্যাংকের প্রচলিত ঋণ বিতরণ নীতিমালা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রজ্ঞাপন, আর্থিক বিধিবিধান এবং সরকার কর্তৃক জারিকৃত বিভিন্ন সময়ের আদেশও অমান্য করা হয়েছে। অনিয়মের সঙ্গে দায়ীদের বিচারের আওতায় না আনার সংস্কৃতি আর্থিক খাতে অনিয়ম বাড়াতে সহায়তা করছে। ব্যাংকগুলোতে অনিয়ম বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হলো, আগের অনিয়ম ও দুর্নীতির ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ না করা। ব্যাংক খাতে দুর্নীতি ও অনিয়ম বেড়ে যাওয়ার আরেকটি প্রধান কারণ হলো, মুনাফা ও ব্যবসা বৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অসুস্থ প্রতিযোগিতা। বিভিন্ন ব্যাংক কর্তৃপক্ষ শাখা ব্যবস্থাপকদের অতিমাত্রায় ঋণ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দেয় , যা আগ্রাসী ও বিবেক বর্জিত ব্যাংকিংয়ের পর্যায়ে চলে যায়। আসলে ব্যাংক খাতে কোনো নীতিমালা প্রণয়নের আগে এর প্রভাব সম্পর্কে গবেষণা ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে খুঁজে বের করা দরকার। যাতে বারবার নীতিমালা পরিবর্তন করতে না হয়, সে ব্যাপারে আগেভাগেই সচেতনতা অবলম্বন করতে হবে। ব্যাংকভিত্তিক ঋণ পুনঃ তপশিলীকরণের অবস্থা জানতে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিস্তারিত ঋণ পুনঃ তপশিলীকরণ রিপোর্টিং সিস্টেম চালু থাকা উচিত। বাংলাদেশের ব্যাংক ব্যবস্থা স্বাধীনতার অর্জনের পর গত ৫০ বছরে নানা সূচকে অনেকটা এগিয়েছে। ব্যাংকগুলো দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে গেছে ব্যাংকিং সেবা। কেউ আজকাল ব্যাংকবিহীন আর্থিক কর্মকাণ্ডের কথা ভাবতে পারছে না। কিন্তু এত অগ্রগতি, সমৃদ্ধি সত্ত্বেও ব্যাংকিং খাতে অনিয়ম, দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনার ত্রুটিবিচ্যুতির পাল্লা ভারী হচ্ছে দিনে দিনে।

ব্যাংকিং খাতের ব্যর্থতা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। কারণ, এখাতের ব্যর্থতা প্রকারান্তরে গোটা অর্থনীতির জন্য মারাত্মক হুমকি ডেকে আনতে পারে। ব্যাংক ব্যবস্থায় সরকারের অযাচিত হস্তক্ষেপ, ব্যাংকগুলোর দুর্বল অদক্ষ ব্যবস্থাপনা, অবিবেচক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, ব্যাংকগুলোর সক্ষমতার বাইরে গিয়ে অতিরিক্ত ঝুঁকি গ্রহণ, স্বাধীনতায় ঘাটতি, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও দুর্বৃত্তায়ণ, আইনগত বাধা ও জটিলতা, সঠিক তথ্যের ঘাটতির কারণের নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা কর্তৃক দায়ী ব্যাংকগুলোকে অব্যাহতি, অনিয়ন্ত্রিত বাজার শৃঙ্খলা, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহে প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে, অভ্যন্তরীণ বা বৈদেশিক বাণিজ্য কার্যক্রমে সমভাবে প্রবিধান মেনে কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে কি না, ইত্যাদি বিষয়গুলো সার্বিকভাবে নজরদারি এবং তদারকি না করায় অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে।

ব্যাংকখাত হলো দেশের অর্থনীতির লাইফ লাইন। এখাতে বিপর্যয় নেমে এলে গোটা অর্থনীতিই অনিশ্চয়তা ও ধ্বংসের মুখোমুখি হবে এটা নিশ্চিত করে বলা যায়। অতএব, আমাদের উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা সমুন্নত রেখে ভবিষ্যত্ সমৃদ্ধ অবস্থানের দিকে এগিয়ে যেতে হলে সামগ্রিক অর্থনীতির শক্ত অবস্থান সৃষ্টি একান্ত জরুরি। আর এজন্য ব্যাংক খাতে অনিয়ম, দুর্নীতি অসদাচরণের মাত্রা দ্রুত সহনশীল পর্যায়ে নামিয়ে আনা প্রয়োজন।