একটি সুন্দর, বসবাসের উপযুক্ত এবং কল্যাণকর দেশ গঠনের লক্ষ্যে আমরা দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়াছি। এখন পা দিতেছি স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর আঙিনায়; কিন্তু এই একবিংশ শতাব্দীর একুশ সালে আসিয়াও আমাদের দেখিতে হইতেছে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বাড়িতে ঘৃণ্য হামলার দৃশ্য। আবার ইহাও দেখিতে হইতেছে যে, সুনামগঞ্জের শাল্লার নোয়াগাঁও গ্রামে সংখ্যালঘুদের বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় করা মামলায় শহীদুল নামের যেই ব্যক্তি গ্রেফতার হইয়াছেন তিনি যুবলীগের একজন কর্মী। এই হামলা মামলার প্রধান আসামি শহীদুলকে গতকাল শুক্রবার রাতে মৌলভীবাজারের কুলাউড়া শহর হইতে গ্রেফতার করিয়াছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। যদিও যুবলীগের সংগঠনটির পক্ষ হইতে দাবি করা হইয়াছে—শহীদুল তাহাদের সংগঠনের কেহ নহে। যুবলীগ একটি অঙ্গ সংগঠন। মূলদল নিয়ন্ত্রণে এসব অঙ্গ সংগঠনের কোন ভূমিকা থাকে না। প্রশ্ন হইল, শহীদুল কি এইবার রবীন্দ্রনাথের গানের মতো করিয়া বলিবে—তুমি মোর পাও নাই পাও নাই পরিচয়? আমাদের সমাজে এই শহীদুলরা তাহা হইলে কে? কাহার শক্তিতে তাহারা বলিয়ান?
বাংলায় প্রবাদ আছে—বাঁশের চাইতে কঞ্চি বড়। ইহার মূল অর্থ হইল, আসল লোকের চাইতে তাহার অনুচর অধিক দৃঢ়তা দেখাইয়া থাকে। এই কঞ্চিরাই সর্বনাশ করিয়া থাকে তাহার দলের। ইহাদের এক কথায় আগাছা হিসাবেও চিহ্নিত করা যায়। আগাছার ক্ষতিকর দিকটি একটু খেয়াল করিলে দেখা যাইবে, উহারা যাহার রস-পুষ্টির উপর ভাগ বসাইয়া ঝাড়েবংশে বাড়িয়া উঠে, শেষাবধি তাহারা সেই মূল গাছটিকেই চারিদিক দিয়া ঘিরিয়া ফেলে। নিঃশ্বাস রুদ্ধ করিয়া ফেলে। ডিম ফুটিয়া বাহির হওয়া মাকড়সার বাচ্চারা যেমন মা মাকড়সার শরীর হইতে পুষ্টি লইয়া তাহাকে নিংড়াইয়া নিঃশেষ ও হত্যা করিয়া ফেলে, এই সকল আগাছাও তদ্রূপ। স্পষ্টতই, এই আগাছাসমূহ নিজ বলে বলিয়ান নহে; কিন্তু যাহাদের বলে বলিয়ান, আগাছারা সেই মূল গাছটিকেই শুষিয়া লইতেছে, মূল গাছটির ক্ষতি করিতেছে। কথায় বলে, যেই ডালে বসিয়া আছ, সেই ডাল তুমি কাটিয়ো না। এই আগাছারাও এক অর্থে নিজেদের বসিয়া থাকা ডালটিকেই কর্তন করিতেছে; কিন্তু উহা যে চরম নির্বুদ্ধিতা, তাহা বুঝিবার মতো মগজটুকু উহাদের নাই। আগাছারা শুধু সমস্যা সৃষ্টিকারী অনিষ্টকারীই নহে, উহারা একই সঙ্গে অতিমাত্রায় জন্মায়। উদ্ভিদ জগতেও দেখা যায়, আগাছারা সাধারণত অদম্য এবং অধিক বংশবিস্তারে সক্ষম। সচেতন মানুষ মাত্রই বরাবরই খেয়াল করিয়াছেন যে, যখন যাহারা ক্ষমতায় আসিয়াছে, তাহারা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নিজেদের মতো করিয়াই সাজাইয়া থাকে। দুঃখজনক হইলেও সত্য যে, এই বিষয়গুলি সকল উন্নয়নশীল দেশেই দেখা যায়। মূল গাছকে শিখণ্ডি বানাইয়া আগাছা তথা কঞ্চিগুলি ক্ষমতার ষোলো আনা সুযোগ লইয়া থাকে। আমরা আরো অনুধাবন করিতে পারি যে, আগাছা ও কঞ্চিরা এমনই ভড়ং ও ভেক ধরে যে, ক্ষমতাসীনরা তাহাদের উপর নির্ভরশীল। কিন্তু প্রশাসন তাহাদের নিকট হইতে সরিয়া গেলে তাহারা গুরুত্বহীন হইয়া পড়ে। মনে রাখিতে হইবে, তাহারা কখনোই জনগণের আসল প্রতিনিধি নহে। এই কঞ্চির যন্ত্রণায় ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে কাহারো কোনো স্বস্তি নাই।
তবে তাত্পর্যপূর্ণ ব্যাপার হইল, আগাছাদের জীবনচক্র স্বল্পমেয়াদি হইয়া থাকে। স্বল্পমেয়াদি হইলেও অল্প সময়ের মধ্যে উহারা যাহা ক্ষতি করিবার করিয়া ফেলে। এই বিষয়টি মূল গাছটিকেই খেয়াল রাখিতে হইবে। আগাছাদের আশ্রয় দেওয়া যাইবে না। শুরুতেই উহাদের বিনষ্ট করা কর্তব্য। উদ্ভিদ-প্রাণিজগত্ ও ইতিহাস হইতে আমাদের শিক্ষা লওয়া একান্ত কর্তব্য।
