যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্ক আরো খারাপ হবে!

আপডেট : ২১ মার্চ ২০২১, ২১:০৪

 

সাবেক ট্রাম্প প্রশাসনের সময়ে যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্ক তলানিতে ঠেকে। নতুন বাইডেন প্রশাসনের সময়ে এই দুই দেশের সম্পর্ক কেমন হয়—সেদিকেই নজর বিশ্বের। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের মতো চীনের ব্যাপারে শুরুতেই অনমনীয় মনোভাব দেখিয়েছে বাইডেন সরকার। গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের আলাস্কায় উচ্চ পর্যায়ের এক বৈঠকে মার্কিন ও চীনা কর্মকর্তারা বাগ্যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন।

আলাস্কার বৃহত্তম শহর অ্যাংকরেজে উত্তেজনাপূর্ণ বৈঠকে অংশ নেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিনকেন ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জ্যাক সুলিভান। অন্যদিকে চীনের পক্ষে শীর্ষ পররাষ্ট্রনীতি বিশেষজ্ঞ ইয়াং জিয়েচি ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই অংশ নেন। উদ্বোধনী বক্তব্যে ব্লিংকেন বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বৈঠকে শিনজিয়াং, হংকং ও তাইওয়ানের ঘটনা, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চালানো সাইবার হামলা এবং মিত্রদের ওপর অর্থনৈতিক জবরদস্তিসহ চীনের বিভিন্ন উদ্বেগজনক কর্মকাণ্ড নিয়ে আলোচনা করতে আগ্রহী। তাদের এসব কর্মকাণ্ড বিশ্বকে স্থিতিশীল রাখার বিদ্যমান শৃঙ্খলার জন্য হুমকিস্বরূপ। জবাবে ইয়াং জিয়েচি অভিযোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্র অন্যায়ভাবে সামরিক শক্তি ও আর্থিক আধিপত্যকে কাজে লাগিয়ে অন্যান্য দেশ দমন করছে। তারা চীনের ওপর হামলার জন্য উসকানি দিচ্ছে। তার দাবি, যুক্তরাষ্ট্রে মানবাধিকার পরিস্থিতি খুবই খারাপ এবং সেখানে কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকানদের নির্মমভাবে হত্যা করা হচ্ছে।

যদিও মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা সুলিভান বলেন, ওয়াশিংটন চীনের সঙ্গে বিরোধে যেতে চায় না। কিন্তু আমরা সব সময় মার্কিনি ও মিত্রদের স্বার্থ রক্ষায় লড়তে থাকব। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সামনে অনুষ্ঠিত এই আলোচনাটি এক ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলে। মার্কিন কর্মকর্তারা জানান, চীনের এই আলোচনায় আসার একমাত্র উদ্দেশ্য হলো— অতিরঞ্জিত কথাবার্তা বলে নিজের সুবিধা হাসিল করা।

যদিও নিজ দেশের গণমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যে চীনের কর্মকর্তারা দাবি করেন, চীন নয়, যুক্তরাষ্ট্রই উদ্বোধনী বক্তব্যের প্রটোকল ভঙ্গ করেছে। চীনের স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্রনীতির ওপর ভিত্তিহীন আক্রমণ চালিয়েছে। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই বলেন, ‘গঠনমূলক আলোচনা’ ফের শুরু করতে বেইজিং প্রস্তুত। শেষ পর্যন্ত শুক্রবার দ্বিতীয় ও শেষ দিনের আলোচনা খোলামেলা পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে দুই পক্ষ জানিয়েছে।

চীন বর্তমানে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার পাশাপাশি বৈশ্বিক অঙ্গনেও প্রভাব বাড়ছে দেশটির। চীনকেই যুক্তরাষ্ট্র এখন সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী বলে মনে করে। এ অবস্থায় নতুন মার্কিন প্রশাসন কীভাবে চীনকে সামলাবে সেটাই দেখার অপেক্ষায় ছিল বিশ্ব। সম্পর্ক কোন দিকে গড়াবে দুই দেশের শীর্ষ কূটনীতিকদের প্রথম আলোচনায় তার স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

বিবিসির এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, গত কয়েক বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের সম্পর্ক ভালো যাচ্ছে না। এখন মনে হচ্ছে—এই সম্পর্ক আরো খারাপের দিকে মোড় নিতে যাচ্ছে। মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জ্যাক সুলিভান তার বর্তমান দায়িত্ব পাওয়ার আগে ফরেন এফেয়ার্স ম্যাগাজিনে কুর্ট ক্যাম্পবেলের সঙ্গে মিলে একটি নিবন্ধ লিখেছিলেন। ক্যাম্পবেল এখন জো বাইডেনের এশিয়াবিষয়ক শীর্ষ উপদেষ্টা। ঐ নিবন্ধে তারা লিখেছিলেন, চীনের সঙ্গে মিলেমিশে কাজ করার যে নীতি যুক্তরাষ্ট্র এত দিন অনুসরণ করেছে, তার অনানুষ্ঠানিক পরিসমাপ্তি ঘনিয়ে এসেছে।

চীন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ককে এখন এক নতুন শীতল যুদ্ধ বলে বর্ণনা করা হচ্ছে প্রায়ই। বিবিসির কূটনৈতিক বিশ্লেষক জনাথান মার্কাস বলছেন, শীতল যুদ্ধের মানে যদি হয় এমন এক আসুরিক লড়াই—যেখানে দুটি বৈরী রাজনৈতিক ব্যবস্থা পরস্পরের বিরুদ্ধে পুরো জাতীয় শক্তি দিয়ে লড়ছে, তাহলে বলতে হয় চীন-যুক্তরাষ্ট্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে মার্কিন-সোভিয়েত সংঘাতের প্রতিধ্বনি আছে। নতুন বাইডেন প্রশাসনের মন্ত্র হচ্ছে—যেখানেই প্রয়োজন সেখানেই চীনের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়া হবে আর যেখানে সম্ভব সেখানে সহযোগিতা করা হবে।

অন্যদিকে চীনও যেন একই ধরনের অবস্থান নিয়েছে। তারা এক দিকে গঠনমূলক সম্পর্কের কথা বলছে। অন্যদিকে তাদের নিজেদের স্বার্থের বেলায় আরো শক্ত ব্যবস্থা নিচ্ছে। মার্কিন ব্যবস্থার ত্রুটি তুলে ধরতে কোনো সুযোগই বেইজিং হাতছাড়া করে না। মার্কাসের মতে, তাই শীতল যুদ্ধের তকমা এক্ষেত্রে যথার্থ মনে হতে পারে। যদিও সোভিয়েত-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যে শীতল যুদ্ধ ছিল তার পরিপ্রেক্ষিত, প্রভাব ও অবস্থা আরো আলোচনার দাবি রাখে।

সিএনএনের এক নিবন্ধে বলা হয়েছে, বাইডেন প্রশাসনের যাত্রার শুরুতেই দুই দেশের পররাষ্ট্র কর্মকর্তাদের তুমুল বাগ্যুদ্ধ বলে দিচ্ছে যে—সামনে কঠিন সময় আসছে। দুই দেশের সম্পর্ক দ্রুত ও সহজেই স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা নেই। বরং আরো নেতিবাচক হতে পারে। তবে ইরান, উত্তর কোরিয়া, আফগানিস্তান এবং জলবায়ু ইস্যুতে দুই দেশের কাজ করার সুযোগ রয়েছে। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে দুই দেশের সম্পর্কে কতটা স্থিতিশীলতা ফিরে আসে সেটাই দেখার বিষয়।