বাস্তববাদী হইতে হইবে

আপডেট : ২১ মার্চ ২০২১, ২১:০৯

আমরা কেমন আছি? একটুখানি নীলাকাশ দেখা গিয়াছিল বটে, কিন্তু পরিস্থিতি পুনরায় গুমোট হইতেছে। আকাশে আবার সিঁদুরে মেঘ দেখা যাইতেছে বলিয়া মনে হইতেছে। গত এক বত্সর ধরিয়া যেই ভয়াবহ অবস্থার ভিতর দিয়া এই বিশ্ব সময় পার করিল, তাহা বিশ্ব অর্থনীতির রেখাচিত্রটিকে নিচের দিকে নামাইয়া দিয়াছে। উন্নত বিশ্বগুলি কোভিডের কারণে কী ভয়াবহ অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়িয়াছে, সেই সংবাদ বিবিসি, সিএনএন জাতীয় আন্তর্জাতিক নিউজ চ্যানেল খুলিলেই ক্ষণে ক্ষণে দেখা যায়। ইহার বিপরীতে, আমাদের দেশের অনেকের মুখেই শুনা যায় যে, কোভিডের থাবায় আমাদের অর্থনীতিতে খুব অধিক ক্ষত তৈরি হয় নাই। যেইখানে যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, ভারত, জাপানের মতো দেশের জিডিপি মাইনাসে চলিয়া গিয়াছে, জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থার (আঙ্কটাড) এক প্রতিবেদন অনুযায়ী করোনা মহামারির কারণে গত বত্সর বিশ্ব অর্থনীতির ৩.৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হ্রাস পাইয়াছে, সেইখানে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাময়িক হিসাবে বলা হইতেছে, ২০১৯-২০ অর্থবত্সরে আমাদের প্রবৃদ্ধি অর্জিত হইয়াছে ৫.২৪ শতাংশ! চলতি অর্থবত্সরেও প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হইয়াছে ৮.২ শতাংশ, তবে প্রায় সকল দাতা সংস্থাই বলিতেছে, এত প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব নহে।

প্রশ্ন হইল, আমরা বাস্তবতাকে স্বীকার করিতে কতখানি প্রস্তুত? কোভিডের প্রকোপ হইতে অর্থনীতিকে রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের ১.৯ ট্রিলিয়ন ডলারের কোভিড-১৯ বিল পাশ করিতে পারিয়াছে। দেশটির অবস্থা ভয়াবহ। সমস্যাকে স্বীকার করিতে উন্নত দেশগুলি উটপাখির মতো বালুর দিকে মুখ লুকাইয়া রাখে না। কারণ, সমস্যাকে স্বীকার না করিলে উহার সমাধানের পথ বাহির করা সম্ভব নহে। সুতরাং ‘আমাদের সকল কিছু ঠিকঠাক রহিয়াছে’—অনেকের মতে, ইহাই সবচাইতে বেঠিক কথা। এই ক্ষেত্রে আমাদের বাস্তববাদী হইতে হইবে। বাংলাদেশের নাগরিকেরা কতটা ভালো আছেন, তাহা দেখা যাউক। এডিবি বলিতেছে, ভালো থাকিবার জরিপে বাংলাদেশ ১০০ নম্বরের মধ্যে মাত্র ৪৩ পয়েন্ট পাইয়াছে। ইহার অর্থ—ভালো থাকিবার তুলাদণ্ডে বাংলাদেশ মাঝামাঝি অবস্থানেও নাই। স্মর্তব্য যে, করোনাকালে বাংলাদেশে গরিব লোকের সংখ্যা দ্বিগুণ হইয়াছে। ইতিপূর্বেই সাড়ে তিন কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করিত, তাহার সহিত কমবেশি ১ কোটি ৬৪ লক্ষ মানুষ নূতন করিয়া গরিব হইয়াছে। চাকুরি হারাইয়াছেন কোটির কাছাকাছি মানুষ। অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদনে স্বীকার করা হইয়াছে যে, ২০১৯-২০ অর্থবত্সরে দেশের অর্থনীতির প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার ক্ষতি হইয়াছে, টাকার হিসাবে যাহার পরিমাণ প্রায় ৮৫ হাজার কোটি টাকা।

পরিস্থিতি এখন এমন যে, অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মজীবীদের আয় কমিয়া যাইবার কারণে সার্বিকভাবে ব্যয় বা ভোগ করিবার প্রবণতাও কমিয়া গিয়াছে। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষণায় দেখা গিয়াছে, ২০১৯ সালের তুলনায় ২০২০-এ এসএমই খাতে সামগ্রিকভাবে আয় কমিয়াছে প্রায় ৬৬ শতাংশ এবং প্রায় ৭৬ শতাংশ উত্পাদিত পণ্যই অবিক্রীত থাকিয়াছে। ইহার সহিত রপ্তানি ও প্রবাসী আয়ও হ্রাস পাইয়াছে। অন্যদিকে বেসরকারি বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা তো রহিয়াছেই। নূতন করিয়া এখন কেহ বিনিয়োগের চিন্তা মাথাতেই আনিবেন না। বত্সরের শুরুতে যখন কোভিডের প্রকোপ আস্তে আস্তে কমিয়া আসিতেছিল, তখন সকলের মনে একটু একটু করিয়া স্বস্তিও ফিরিতেছিল। মনে করা হইতেছিল, ঝড় ক্রমশ সম্পূর্ণভাবেই থামিয়া যাইবে। করোনার পূর্বের ধাক্কাতেই প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ব্যবসায়ী মনে করিয়াছেন যে, তাহারা তাহাদের ব্যাবসায়িক অবস্থা পুনরুদ্ধারের পথে নাই। এখন যদি নূতন ঢেউ আসিয়া আরো বড় ঝাপটা তোলে, তাহা হইলে কী উপায়? অনেকেই মনে করেন, প্রণোদনা ও সঠিক পরিকল্পনা ব্যতীত অর্থনীতি সচল রাখা সহজ হইবে না। সঠিক ব্যবস্থাপনা এবং দূরদৃষ্টির অভাব থাকিলে গত বত্সরের ক্ষতির ৮৫ হাজার কোটি টাকার অঙ্ক আরো বৃদ্ধি পাইবে। ইহার পাশাপাশি বৃদ্ধি পাইবে গভীর অনিশ্চয়তাও। সুতরা এখনই ভবিষ্যতের দিকে তাকাইতে হইবে।