অব্যবস্থাপনা ও নৈরাজ্য আর কাহাকে বলে! ঘরে ঘরে এখন পলিথিনের গ্যাস বেলুন তৈরি করা হইতেছে। ইহা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ তাহার সম্পর্কে গ্রামগঞ্জের অনেক মানুষেরই কোনো ধারণা ও সচেতনতা নাই। প্রশ্ন হইল, ইহা যাহাদের নিয়ন্ত্রণ করিবার কথা তাহারা আসলে কী করিতেছেন? সাংবাদিকরা এই ব্যাপারে প্রশ্ন করিলে তাহারা যেন আকাশ হইতে পড়িতেছেন। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে ঘরে ঘরে পলিথিনের বেলুন ছড়াইয়া পড়িতেছে আর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কুম্ভকর্ণের মতো ঘুমাইতেছেন। ইত্তেফাকের এক খবরের মূল ভাষ্য হইল, নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার কায়েতপাড়া ইউনিয়নের প্রায় ১০টি গ্রামে এই ধরনের ভয়ংকর বেলুনের গ্যাস দিয়া চলিতেছে প্রাত্যহিক রান্নাবান্নার কাজ। ইহাতে যে কোনো সময় লিকেজ হইয়া বা পলিথিন গলিয়া গিয়া ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটিয়া যাইতে পারে। ভস্মীভূত হইয়া যাইতে পারে গ্রামের পর গ্রাম।
এই সকল পলিথিনের গ্যাস বেলুনের কোনোটির রং লাল, আবার কোনোটির রং হলুদ ও নীল। এই সকল নানা রঙের বেলুন কেহ ঘরে রাখিতেছেন, কেহ-বা আবার রাখিতেছেন ঘরের খাটের নিচে কিংবা ঘরের মাচার উপর বা গোয়ালঘরে। ফলে এই সকল গ্রাম যেন এখন পরিণত হইয়াছে বেলুনের গ্রামে। আসলে পরিণত হইয়াছে বেলুন বোমার গ্রামে। ২০১৫ সালের শুরুতে এই সকল গ্রামে অবৈধ গ্যাস সঞ্চালন লাইন টানা হয়। এই লাইন হইতে গ্যাসের সংযোগ নেওয়া হইয়াছে বাড়িতে বাড়িতে। এইভাবে জাতীয় সম্পদ ব্যবহার করা হইলেও কোনো প্রকার বিল পরিশোধ করা হইতেছে না। গ্যাসের চাপ কম থাকিলে অবৈধ সংযোগ বিধায় কোনো প্রকার অভিযোগ দায়ের করা যায় না। এমতাবস্থায় যখন গ্যাসের চাপ বেশি থাকে বিশেষত রাত্রি বেলায়, তখন বাড়িতে পলিথিনে গ্যাস সংরক্ষণ করিয়া তাহা দিনের বেলায় রান্নার কাজে ব্যবহার করা হয়। এমনকি বাড়ির টয়লেটের উপরে পলিথিনের বেলুন রাখিয়া তাহাতে তিতাস গ্যাসের পাইপলাইন হইতে আরেকটি পাইপের মাধ্যমে গ্যাস উঠানো হইতেছে। পলিথিন হইতে আরেকটি পাইপ দেওয়া হইতেছে চুলায়। যাহারা এইভাবে গ্যাসের সংযোগ নিতেছে তাহাদের বিরুদ্ধে তিতাস কর্তৃপক্ষ কেন নিশ্চুপ ও নিষ্ক্রিয়, তাহা বোধগম্য নহে। সকলের নাকের ডগায় কীভাবে দিনের পর দিন এমন অবৈধ কর্মকাণ্ড চলিতে পারে?
শুধু এই ধরনের গ্যাস বেলুনই নহে, এমনকি গ্যাসের তৈরি খেলনা বেলুনের ঝুঁকি লইয়াও আমাদের গভীরভাবে ভাবিতে হইবে। গ্যাস বেলুন শিশুরা পছন্দ করে; কিন্তু ইহাও যে কোনো সময় বিস্ফোরিত হইয়া মানুষের হতাহতের কারণ হইতে পারে। বিশেষত রাসায়নিক গ্যাস দিয়া বেলুন ফুলাইয়া বিক্রি করিবার পেশাটি প্রাণঘাতী ও ধ্বংসাত্মক। ২০১৯ সালের নভেম্বরে রাজধানীর মিরপুর এলাকার রূপনগরে এমন এক বেলুন বিক্রেতার গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে সাত শিশু নিহত হয়। আহত হয় ২০ জন। তাহারা যেই সকল সিলিন্ডার ব্যবহার করেন তাহা মেয়াদোত্তীর্ণ, ব্যবহারের অনুপযোগী; এমনকি অধিকাংশই যানবাহনে ব্যবহূত ও পরিত্যক্ত সিএনজি সিলিন্ডার। এই সকল বেলুনওয়ালারাও প্রকৃতপক্ষে বোমা বহন করিয়া চলেন। তাহারা নিজেরাই অ্যাসিড, সিসা, দস্তা, অ্যালুমিনিয়াম ইত্যাদি ধাতু ব্যবহার করিয়া হাইড্রোজেন গ্যাস তৈরি করেন। বাণিজ্যিকভাবে হাইড্রোজেন গ্যাস তৈরির ক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য অবশ্যপালনীয় কিছু নিয়ম ও প্রক্রিয়া আছে; কিন্তু এই সকল খেলনা বেলুন ও পলিথিনের বেলুন তৈরিতে নিরাপত্তাগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হইতেছে না। অতএব, দুর্ঘটনার পথ বন্ধ করিতে তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি বিস্ফোরক অধিদপ্তরকেও এই সকল নিষিদ্ধ কর্মকাণ্ড বন্ধ করিতে জরুরি ব্যবস্থা নিতে হইবে।
