বইমেলা নিয়ে যা লিখতে চেয়েছিলাম, তা না লিখে উলটোটা লিখতে হচ্ছে। মেলার দ্বিতীয় দিন প্রথম মেলায় ঢুকেই দেখি কোনো আলাপ-আলোচনা ছাড়াই লিটল ম্যগাজিন চত্বর আগের জায়গা থেকে সরিয়ে কালীমন্দিরের পেছনে, লেখক মঞ্চের পেছনে অন্ধকার মোহনায় ছোট ছোট ঘিঞ্জি স্টল দিয়ে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এবং মেলার সদর দিকে পেছন দিয়ে তাঁবু টাঙিয়ে তাকে আড়াল করার অপচেষ্টা করা হয়েছে। সেই পেছনেই সাইনবোর্ড লাগানো হয়েছে ভুল বানানে। যেন ভেতরে কী হচ্ছে তা দেখা না যায়। হয়তো অচ্ছুত্ কিছু ঘটছে ভেতরে। আর আগের নির্ধারিত স্থানে খাবারের স্টল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, বোঝা যাচ্ছে এখানে বাণিজ্যিক ব্যাপারটা প্রাধান্য পেয়েছে। যে কারণে দেড়-দুই শ লিটল ম্যাগাজিন স্টল মুহূর্তে সরিয়ে নিতে দ্বিধা করেনি কর্তৃপক্ষ। যেটা বাংলা একাডেমির সম্মানিত কবি মহাপরিচালকের কাছে আমাদের প্রত্যাশা নয়। প্রত্যাশা নয় সংশ্লিষ্ট অন্যদের কাছেও। বরাবরই বাংলা একাডেমি বাঁকবদলের সাহিত্যের বাতিঘর লিটল ম্যাগাজিনকে বঞ্চিত করে আসছে। তা নিয়ে প্রতি বছরই আমাদের মিটিং করে দাবি আদায় করতে হয়। এ বছরও তা-ই চলছে। আমরা লিটল ম্যাগাজিন চত্বর গত বছরের জায়গায় পুনঃস্থাপনের দাবি জানিয়েছি। গতকাল তারা সম্মত হয়েও কথা রাখেনি। লিটল ম্যাগাজিন লেখক-সম্পাদক-কর্মীদের আন্দোলন চলবে। চলছে।
সোমবার জানিয়েছে যে আমাদের দাবি মেনে আগের জায়গায় লিটল ম্যাগাজিন চত্বর স্থাপনের কাজ শুরু হয়েছে; কিন্তু আমরা ভরসা পাচ্ছি না কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত। এটা আন্দোলন প্রতিহত করার একটি কৌশল হতে পারে। যেটা গত রবিবার করা হয়েছিল। আমরা এভাবে আর প্রতি বছর আমাদের দাবি নিয়ে আন্দোলন করতে চাই না। লিটল ম্যাগাজিনকে কেন একাডেমি প্রতিপক্ষ মনে করে, স্পষ্ট নয়। যেখান থেকে সাহসী ও স্পষ্টভাষী লেখক জন্ম হয়, প্রকৃত লেখকের আশ্রয়ঘর যে লিটল ম্যাগজিন তাকে সব সময় পরিত্যক্ত স্থানে স্থান দেওয়া হয়, যা কর্তৃপক্ষের নির্বুদ্ধিতারই পরিচায়ক। লিটল ম্যাগাজিন সংশ্লিষ্টদের সম্মান না দেখালে কোনোদিন একটি সুন্দর মেলা হতে পারে না। কখনো হবে না। লিটল ম্যাগাজিন চত্বর মেলার মধ্যমাঠে দিলে সেই দিন প্রকৃত সার্থক একটি মেলা হবে। সব লেখক সেখানে আড্ডা মারতে আসবে। অতীতে যেমন বহেড়াতলায় আসত। প্রচলিত ধারার বিরুদ্ধে নতুন সাহিত্যের চর্চা বৃদ্ধি পাবে।
করোনা পরিস্থিতিতে উদ্যান জুড়ে মেলার স্টল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। লিটল ম্যাগাজিনের চত্বরে জায়গা কমানো হয়েছে, মাছবাজারের মতো বা কবরস্থানের মতো গায়ে গা লাগিয়ে স্টল বিন্যাস করা হয়েছে। আগে লিটল ম্যাগাজিন চত্বরে বসার ফাঁকা জায়গা ছিল, কিন্তু এ বছর নেই। যেন গভীর প্রেমে করোনাকে আহ্বান করা হয়েছে এ জায়গাটিতে। কাদের ডিজাইনে কারা এ পরিকল্পনা করে বোধগম্য নয়। এ বছরের বইমেলার যা কিছু সুন্দর তার সবকিছু যেন ম্লান হয়ে গেছে লিটল ম্যাগাজিনের প্রতি এই বৈষম্যের কাছে। অগণিত অগ্রজ-তরুণ বাঁক বদলের কবি-লেখককে অসম্মান করে কখনো বইমেলায় ভালো কিছু আশা করা যায় না।
ইত্তেফাক/টিআর
