মানুষের শরীর তো অজ পশুর মতো নহে যে, যাহা খুশি তাহা খাইয়া হজম করিতে পারিবে। প্রকৃত অর্থে, খাবার হইল শরীরের জ্বালানি। সেই জ্বালানিতে যদি সমস্যা থাকে, তাহা হইলে মানুষের শরীর নামক ইঞ্জিনে সমস্যা দেখা দিবেই। ইত্তেফাকে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন হইতে জানা যায় যে, খাদ্যে ট্রান্সফ্যাটজনিত হূদেরাগে মৃত্যুর পরিসংখ্যান অনুযায়ী সর্বাধিক ঝুঁকিপূর্ণ ১৫টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলিতে প্রতি বত্সর এই সংক্রান্ত রোগে মারা যায় ৫ লক্ষাধিক মানুষ। ইহার মধ্যে বাংলাদেশে মারা যায় ৫ হাজার ৭৭৬ জন। এই তথ্য পাওয়া গিয়াছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক-২০২০ সালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে।
ট্রান্সফ্যাট কী—তাহার সারাংশ বুঝিয়া দেখা যাউক। খাবারের ট্রান্সফ্যাট হইল এক কথায় ক্ষতিকর চর্বিজাতীয় খাবার। ইহা রক্তের ‘ভালো’ কোলেস্টেরলের মাত্রা কমাইয়া দেয় এবং ‘খারাপ’ কোলেস্টেরেলের মাত্রা বাড়াইয়া দেয়। রক্তে যখন অতিরিক্ত মাত্রার খারাপ কোলেস্টেরল বাড়িয়া যায় তখন উহা মানুষের হূদেরাগের ঝুঁকি বাড়াইয়া দেয়। সুতরাং কোনো ব্যক্তি যত অধিক ট্রান্সফ্যাট জাতীয় খাবার গ্রহণ করিবে, ঐ ব্যক্তির হূিপণ্ড ও রক্তনালি রোগের ঝুঁকি ততই বৃদ্ধি পাইবে। মনে রাখিতে হইবে, রক্তে যেই সকল কোলেস্টেরল থাকে, সেইগুলির মধ্যে দুই ধরনের কোলেস্টেরল খুব গুরুত্বপূর্ণ। কম ঘনত্বের কোলেস্টেরলের বা এলডিএল, যাহা ‘খারাপ’ কোলেস্টেরল হিসেবে গণ্য। এই ধরনের কোলেস্টেরল হূিপণ্ডের রক্তনালির দেওয়ালে চর্বি জমাট বাঁধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এবং রক্তনালিগুলি সরু হইয়া রক্ত চলাচলে বাধাগ্রস্ত করে। ইহাতে হূদেরাগের ঝুঁকি বাড়িয়া যায়। অন্যদিকে, উচ্চ ঘনত্বের কোলেস্টেরলের বা এইচডিএল, যাহা ‘ভালো’ কোলেস্টেরল হিসাবে বিবেচিত, ইহা রক্তের ‘খারাপ’ কোলেস্টেরলকে রক্ত হইতে যকৃতে লইয়া যায় এবং রক্তনালির দেওয়ালে চর্বি জমিতে দেয় না।
এই ভালো-খারাপ উভয় কোলেস্টেরলের ক্ষেত্রে ‘ট্রান্সফ্যাট’ পক্ষাবলম্বন করে খারাপ কোলেস্টেরলের। ‘ট্রান্সফ্যাট’ মানুষের রক্তে ‘খারাপ’ কোলেস্টেরল বাড়াইয়া দেয় এবং ‘ভালো’ কোলেস্টেরল কমাইয়া দেয়। এইভাবে ট্রান্সফ্যাট রক্তের স্বাভাবিক কোলেস্টেরলের মাত্রায় অস্বাস্থ্যকর প্রভাব ফেলে এবং ট্রান্সফ্যাটসমৃদ্ধ খাবার হার্ট অ্যাটাক, মস্তিষ্কের স্ট্রোক, রক্তনালির অসুখ ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়াইয়া দেয়।
মনে রাখিতে হইবে, ইতিমধ্যে ছয়টি দেশ খাদ্যে ট্রান্সফ্যাট নিষিদ্ধ করিয়াছে এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ আরো ২৫টি দেশ একই সিদ্ধান্ত লইয়াছে। মুশকিল হইল, বাংলাদেশের মানুষ গড়ে কী পরিমাণ ট্রান্সফ্যাট গ্রহণ করিতেছে, এই ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নাই। সাধারণত বেকারি পণ্য, প্রক্রিয়াজাতকৃত ও ভাজা-পোড়া স্ন্যাক্স এবং হোটেল-রেস্তোরাঁ ও সড়কসংলগ্ন দোকানে তৈরি খাবারে ট্রান্সফ্যাট অনেক বেশি থাকে। কারণ এই খাবারগুলি হাইড্রোজেনেটেড তেল অর্থাত্ পাম অয়েল কিংবা সয়াবিন তেল দিয়া কড়া করিয়া ভাজা হয়। রান্নার কাজে তাহারা একই তেল বারংবার ব্যবহার করিয়া থাকে। ফলে আরো অধিক মাত্রায় ট্রান্সফ্যাট উত্পাদিত হয় এবং হূদেরাগের ঝুঁকি কয়েক গুণ বাড়াইয়া দেয়। এই ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করিতেছেন, ট্রান্সফ্যাটের ঝুঁকি মোকাবিলার একটি পদক্ষেপ হইতে পারে প্রক্রিয়াজাত ও শিল্প খাতে উত্পাদিত খাবারে ট্রান্সফ্যাটের মাত্রা নির্দিষ্ট করিয়া দেওয়া। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের ফুড সেফটি অ্যান্ড স্ট্যান্ডার্ড অথরিটি অব ইন্ডিয়া আরো ১২ বত্সর পূর্বেই আংশিকভাবে হাইড্রোজেনেটেড তেলে ট্রান্সফ্যাটের সর্বোচ্চ সীমা ১০ শতাংশ নির্ধারণ করিয়া দিয়াছিল। পরবর্তী সময়ে ছয় বত্সর পূর্বে ইহা কমাইয়া ৫ শতাংশে লইয়া আসা হয়। অন্যদিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এই মাত্রা নির্ধারণ করিয়া দিয়াছে ২ শতাংশে। ইতিমধ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০২৩ সালের মধ্যে খাদ্যে ট্রান্সফ্যাট নিয়ন্ত্রণ করিবার জন্য সকল সদস্য রাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানাইয়াছে। আমরা আশা করিব, এই বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়া নিরাপদ খাদ্যে বাংলাদেশ আরো এক ধাপ অগ্রসর হইবে। বাংলাদেশে ‘নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ’ রহিয়াছে। ট্রান্সফ্যাটজনিত সমস্যা রোধে তাহাদেরই দায়িত্ব লইতে হইবে।
