১৯৭১ সালে দৈনিক ইত্তেফাক (২৪ মার্চ)

আপডেট : ২৪ মার্চ ২০২১, ১৩:৩৮

সাহসী সাংবাদিকতার পথিকৃৎ তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার সম্পাদনায় ১৯৫৩ সালের ২৪ ডিসেম্বর দৈনিক হিসেবে যাত্রা শুরুর পর থেকে ইত্তেফাক হয়ে ওঠে গণমানুষের মুখপত্র।  বাংলাদেশের স্বাধিকার আন্দোলনে অসামান্য ভূমিকা রেখেছিল পত্রিকাটি। সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার থেকে আপসহীনভাবে সত্য প্রকাশ করে গেছে ইত্তেফাক। পত্রিকাটির এই ভূমিকা উপমহাদেশের সংবাদপত্রের ইতিহাসের একটি উজ্জ্বল অধ্যায়।

স্বাধীনতার মাস অগ্নিঝরা মার্চে দৈনিক ইত্তেফাক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চ প্রকাশিত দৈনিক ইত্তেফাকের প্রথম পাতায় প্রধান খবরের শিরোনাম হিসেবে বেছে নেওয়া হয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতার লাইন, ‘আমরা শুনেছি ঐ, মাভৈ: মাভৈ: মাভৈ’। শিরোনামের পাশে বক্স করে লেখা ছিল, ’৭১-এর তেইশে মার্চের সুর।

মূল প্রতিবেদনটি ছিল এমন, বিক্ষুব্ধ বাংলার বুকে অহিংস-অসহযোগ আন্দোলনের উত্তাল তরঙ্গের আঘাতে আঘাতে ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাব গ্রহণের স্মারক দিবস (২৩ মার্চ) চিরাচরিত আনুষ্ঠানিকতায় পালিত হয়নি। বাংলার মুক্তি ও স্বাধিকার আন্দোলনের রক্তঝরা পটভূমিকায় স্বাধীন বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ এবং স্বাধীন বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় শ্রমিক সংগ্রাম পরিষদের ডাকে দিনটি বাংলাদেশব্যাপী ‘প্রতিরোধ দিবস’ হিসেবে পালিত হয়েছে। 

বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় সরকারি-বেসরকারি ভবনগুলোতে, বাড়িঘরে, যানবাহনে কালো পতাকার পাশাপাশি ২৩ মার্চ সংগ্রাম পরিষদ পরিকল্পিত স্বাধীন বাংলার পতাকা উড্ডীন করা হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য- বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাসভবন, সুপ্রিম কোর্ট, হাইকোর্ট, সেক্রেটারিয়েট, ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেল, ঢাকা বেতার কেন্দ্র, টেলিভিশন কেন্দ্র প্রভৃতি।

প্রতিরোধ দিবস পালন উপলক্ষে রাজধানী ঢাকার গণ-জীবনে গণ-আন্দোলনের সাগরে ভরাকাটালের জোয়ার দেখা দেয়। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ব্যবস্থাপনায় আউটার স্টেডিয়ামে স্বাধীনতা আন্দোলনের অগ্রসৈনিক ছাত্রছাত্রীদের বীরোচিত কুচকাওয়াজ পরিবেশনা উপভোগ করেন স্বাধিকার-পিপাসু হাজার হাজার নরনারী। বাংলার তরুণদের এই কুচকাওয়াজের মধ্য দিয়ে বাংলার আকাশে-বাতাসে বাঙালিরা মানুষের মতো মরার ও বাঁচার আত্মপ্রত্যয়ের যে অনির্বাণ স্বাক্ষর রচনা করেছে তা অতুলনীয়, অদৃশ্যপূর্ব ও অশ্রুতপূর্ব। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ঢাকার রাস্তায় বীর বাঙালির অগণিত মিছিল শুধু কামনা-বাসনা ও আকাঙ্ক্ষার ধ্বনিকে প্রতিধ্বনিত করে গেছে অবিশ্রান্ত জলধারার মতো। মিছিলে মিছিলে সভা-সমিতিতে জনতার কণ্ঠ যেন কেবল বলতে চেয়েছে- ‘শুকনো গাঙ্গে আসুক/জীবনের বন্যা উদ্দাম কৌতুক/ভাঙনের জয়গান গাও/জীর্ণ পুরাতন যাক ভেসে যাক/আমরা শুনেছি ঐ/মাভৈ: মাভৈ: মাভৈ:’। 

প্রধান প্রতিবেদনের সঙ্গে ছিল তিনটি স্থিরচিত্র। এতে দেখা যায়, প্রতিরোধ দিবসে জয় বাংলা বাহিনীর অভিবাদন গ্রহণ করছেন বঙ্গবন্ধু ও স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতারা। 

১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ ইত্তেফাকের প্রথম পাতায় বঙ্গবন্ধুর বক্তব্য নিয়ে একটি খবরের শিরোনাম ছিল, ‘কর্মপন্থা নির্ধারণের ভার আমার উপর ছাড়িয়া দিন’। এতে জানানো হয়, বিক্ষুব্ধ বাংলার দশদিগন্তে সর্বাত্মক মুক্তি আন্দোলনের পটভূমিতে নতুন-আঙ্গিকে আবির্ভূত ২৩ মার্চের অবিস্মরণীয় দিনে বন্যার স্রোতের মতো জনতার সমাগম হয় ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে শেখ মুজিবের বাসভবনে। তাদের উদ্দেশে ভাষণদানকালে স্বাধিকার আন্দোলনের সর্বাধিনায়ক বঙ্গবন্ধু আবারও বলেন, ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম। যতদিন সাড়ে সাত কোটি সার্বিক মুক্তি অর্জিত না হবে, যতদিন একজন বাঙালি বেঁচে থাকবে, এই সংগ্রাম আমাদের চলবেই চলবে। মনে রাখবেন, সর্বাপেক্ষা কম রক্তপাতের মাধ্যমে যিনি চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জন করতে পারেন তিনিই সেরা সিপাহশালার। তাই বাংলার জনগণের প্রতি আমার নির্দেশ- সংগ্রাম চালিয়ে যান, শৃঙ্খরা বজায় রাখুন, সংগ্রামের কর্মপন্থা নির্ধারণের ভার আমার ওপরেই ছেড়ে দিন।’ 

শেখ মুজিবের ভাষ্য ছিল, ‘বাংলার দাবির প্রশ্নে কোনো আপস নাই। বহু রক্ত দিয়েছি, প্রয়োজনবোধে আরও রক্ত দেবো, কিন্তু মুক্তির লক্ষ্যে আমরা পৌঁছাবোই। বাংলার মানুষকে আর পরাধীন করে রাখা যাবে না। আমরা সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধান চাই। কিন্তু যদি তা সম্ভব না হয়, সাড়ে সাত কোটি বাঙালির স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক হিসেবে বেঁচে থাকার লক্ষ্য অর্জনের সংগ্রাম আমাদের চলতেই থাকবে। এই সংগ্রামের পন্থা কী হবে তা আমিই ঠিক করে দেবো, সেই ভার আমার ওপরই ছেড়ে দিন। শোষক-কায়েমী স্বার্থবাদীদের কীভাবে পর্যুদস্ত করতে হয় আমি জানি।’

ইত্তেফাক/জেএইচ