সুবর্ণজয়ন্তীর শুভক্ষণে

আপডেট : ২৫ মার্চ ২০২১, ২২:০০

সুবর্ণজয়ন্তীর শুভক্ষণে আমাদের পেছনে যেমন তাকাতে হবে, সামনেও তেমনি দৃষ্টি মেলে রাখতে হবে। পেছনে তাকালে কয়েকটি বিষয় আমাদের অনুপ্রাণিত করে, সেগুলোর ভেতর আছে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযুদ্ধ থেকে আহরিত শক্তি ও সাহস। সেই শক্তি ও সাহস দিয়ে আমরা একটি-একটি করে প্রতিকূলতা জয় করেছি। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের পুনর্নির্মাণ একটি অসম্ভব বিষয় ছিল তখন— যখন এই দেশটির অর্থনীতি পিঠটান দিয়েছিল। কিন্তু ’৭১ যেরকম আমাদের নায়কদের তৈরি করেছিল, তখন শুধু সম্মুখযোদ্ধারাই নন, সাড়ে সাত কোটি মানুষ যারা স্বাধীনতার জন্য লড়েছেন; গ্রামের মায়েরা যারা সন্তানদের যুদ্ধে পাঠিয়েছেন, গ্রামের গৃহস্থ, যিনি তার দরজা খুলে দিয়েছিলেন শহর থেকে আসা মানুষদের জন্য, তারা প্রত্যেকেই নায়ক ছিলেন।

স্বাধীনতার পর আমাদের কৃষকরা হয়ে গেলেন আমাদের নায়ক; আমাদের শ্রমিকরা হয়ে গেলেন আমাদের নায়ক; সামান্য পুঁজি নিয়ে যারা উদ্যোক্তা হলেন ছোট ছোট শিল্পের, তারাও হয়ে গেলেন নায়ক। এদের সম্মিলিত পরিশ্রমে আমাদের অর্থনীতির ভিত্তি গড়ে উঠল। নায়ক ছিলেন আমাদের নারীরা, যারা হাজার বছরের প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে (যার নাম রক্ষণশীলতা) ঘরের বাইরে কাজের ক্ষেত্র খুঁজে নিলেন। তাদের উপার্জন সন্তানদের শিক্ষায় বিনিয়োগ করলেন। শিক্ষার বিস্তার ঘটল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমাদের ছয় দফা থেকে শুরু করে ’৭১ পর্যন্ত স্বাধীনতার পথটি তৈরি করে গেছেন। ১৯৭৫-এর আগস্টে নির্মমভাবে তাকে হত্যা করা হলো। তারপর মুক্তিযুদ্ধের মতো বঙ্গবন্ধুকেও নির্বাসনে পাঠিয়ে দেওয়া হলো। কিন্তু বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, তার অহংকার এবং তার শক্তিকে নির্বাসনে পাঠিয়ে দেওয়া সম্ভব হলো না।

কিন্তু আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, আমাদের প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে জয়ী হওয়ার শক্তি এবং জাতি হিসেবে আমাদের সাহসকে নির্বাসনে পাঠানো কারো পক্ষে সম্ভব হলো না। এই সাহস ও শক্তি দিয়ে আমরা ক্রমান্বয়ে প্রতিকূলতাগুলো মোকাবিলা করতে করতে বাংলাদেশেকে এই পর্যায়ে নিয়ে এসেছি। এটিও আমাদের ইতিহাস শিক্ষা দিচ্ছে। দ্বিতীয় একটি বিষয় হচ্ছে, আমাদের জনগোষ্ঠীগুলোকে শিক্ষার পক্ষে একটি সমর্থন সব সময় ছিল। সেই সমর্থনটি না থাকলে আমাদের শিক্ষার বিস্তার ঘটত না। আর শিক্ষা হচ্ছে একটি শক্তি, যা মানুষকে আত্মনির্ভরশীল হতে শেখায়, যা আত্মবিকাশের সহায়তা করে। এই শিক্ষা যখন বিস্তৃত হলো, আমরা আত্মবিকাশমুখী একটি জাতি উপহার পেলাম। আমরা জানি, শিক্ষার মানের ঘরে কমতি আছে, কিন্তু শিক্ষার যে প্রসার হয়েছে তাতে আমাদের দেশটা এত দূর আসতে পেরেছে। তারপর আমরা বিভিন্নভাবে স্বৈরশাসন, ছদ্মবেশী স্বৈরশাসন, পাকিস্তানের পক্ষের শক্তিগুলোর পুনরুত্থান, রাজনীতিতে তাদের পুনর্বাসন—সেসবের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করলাম। এখন আমাদের আরো অনেক সংগ্রাম করার বাকি। কারণ আমাদের রাজনীতি থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় অসামাজিক প্রতিষ্ঠানেগুলোর পরিশুদ্ধতার প্রয়োজন আছে। ৫০ বছরের ইতিহাস আমাদের আরো একটি বিষয় শিক্ষা দেয়। সেটি হচ্ছে সবাই যদি পাশাপাশি দাঁড়াই, তাহলে সমাধানটা দ্রুত হয়। আর যদি বিচ্ছিন্নতা থাকে শ্রেনিতে শ্রেণিতে, মানুষে মানুষে, তাহলে আমরা ক্রমাগত দুর্বল হয়ে যাই। এটি আমরা ৫০ বছরের ইতিহাস থেকে নিতে পারি। এই বিষয়টি আমাদের মাথায় রাখতে হবে, যখন আমরা ভবিষ্যতের দিকে তাকাব। কারণ আমি আগেই বলেছি এই সুবর্ণজয়ন্তীতে আমরা পেছনের দিকে যেরকম তাকাব, ৫০ বছরের ইতিহাসে দ্বিতীয়ত হচ্ছে সামনের দিকেও তাকাব। এর পরের প্রসঙ্গটি আরো গুরুত্বপূর্ণ; সেটি হচ্ছে ৫০ বছরের ইতিহাস—আমাদের উপনিবেশমুক্তির পরবর্তী অধ্যায়। আমরা দুই ধরনের উপনিবেশের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছি। উপমহাদেশের বাকি সবগুলো রাষ্ট্র শুধু একটি উপনিবেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে জয়ী হয়েছে। এটি ছিল ব্রিটিশ উপনিবেশ। আমরা ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে মুক্তি পেয়ে পাকিস্তান উপনিবেশে পড়লাম। ২৪টি বছর এই উপনিবেশের বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালিয়ে গেলাম। সেই যুদ্ধেও আমরা জয়ী হলাম। আমাদের পঞ্চাশ বছরের ইতিহাসে আমরা কি উপনিবেশবিরোধী সংগ্রামের পাঠগুলো প্রয়োগ করেছি—এ প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ।

উপনিবেশ শুধু শাসন ও অধিকারহীনতাকেই পাকাপোক্ত করে না, ব্যক্তি ও সমষ্টিকে তা দুর্বল করে ফেলে। একটা চাপিয়ে দেওয়া কাঠামো স্থানীয় কাঠামোকে বিপর্যস্ত করে বিনষ্ট করে তোলে এবং একধরনের বিভাজন তৈরি হয়, যাতে কেন্দ্র ও প্রান্তের ভেতরে ক্রমাগত একটা বিরোধ থেকেই যায়। প্রান্ত হচ্ছে ঔপনিবেশিক শাসনের কেন্দ্র এবং সেখানে শক্তিমত্তাবলি ও ক্ষমতাবলি এই সবকিছুর সমাবেশ। আর প্রান্ত হচ্ছে বিচ্ছিন্ন জনপদ, যেখানে স্থানীয় মানুষের ঘুরে দাঁড়াবার সংগ্রাম একটা চিরস্থায়ী বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। এবং প্রান্ত অবহেলিত বিপর্যস্ত। আমরা কি স্বাধীনতার পর এই কেন্দ্র এবং প্রান্তের বিভাজনটাকে টিকিয়ে রেখেছি? আমরা কি প্রত্যেক জনগোষ্ঠীর অধিকার নিশ্চিত করতে পেরেছি? মোটা দাগে বলতে হবে, আমরা পারিনি। আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলোকে কি ঔপনিবেশিক ক্ষমতা থেকে বের করে আনতে পেরেছি? উত্তর হচ্ছে না। আমাদের প্রশাসন ব্রিটিশ ও পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক মডেলে চলছে। আমাদের আদালতের কাঠামোটিও ঔপনিবেশিক। আমাদের পুলিশ বাহিনী চলছে ১৮৬১ সালের ঔপনিবেশিক আইনের অধীনে। আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর কাঠামোও অপরিবর্তিত রয়ে গেছে। যার জন্য শিক্ষক ঔপনিবেশিক কাঠামোতে যেরকম ক্ষমতা ছিল প্রধান, নিয়ন্ত্রণ ছিল প্রধান, আমাদের কাঠামোতে নিয়ন্ত্রণও প্রধান রয়ে গেছে। এখনো আমাদের রাজনীতি-ক্ষমতায় যাওয়া এবং টিকে থাকার সংগ্রাম। মানুষের কল্যাণের কাজ করার জন্য এই রাজনীতি পরিচালিত হয় না। এটি আমাদের একটা করুণ সত্য, এটা মেনে নিতে হবে আমাদের। সবশেষে কথাটি আমি যে বলছি, সেটি হয়তো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, তা হচ্ছে মনের উপনিবেশমুক্তি। বঙ্গবন্ধু এই মনের উপনিবেশমুক্তির জন্য সমস্ত জীবন সংগ্রাম করেছেন। তার লেখাগুলোতে যে কয়েকটি বই আমরা এখন পড়তে পারি কিংবা তার বক্তৃতার যে বিবরণ পাকিস্তান গোয়েন্দা সংস্থার নথিতে লিপিবদ্ধ আছে সেগুলো আমরা এখন পড়তে পারি, সেখানে আমরা দেখতে পারছি, ঔপনিবেশিক মুক্তির সংগ্রামটা তিনি কীভাবে করেছিলেন। মনের উপনিবেশ শক্তির প্রকাশ—একটি হচ্ছে উপনিবেশ-মনের মুক্তি হতে পারে যদি আমরা সংস্কৃতির শক্তি আহরণ করি। এবং সাংস্কৃতির প্রধান উপাদান হচ্ছে ভাষা। পাকিস্তানিরা আমাদের ভাষাকে নিষ্ক্রিয় করতে চেয়েছিল। তাহলে আমাদের সংস্কৃতিও নিষ্ক্রিয় হয়ে যেত। তাহলে আমাদের মনের উপনিবেশে তাদের আস্তানা গড়তে সহজ হয়। তারা সফল হয়নি।

যেদিন বঙ্গবন্ধু ৬ দফা দিলেন, সেখানে অর্থনৈতিক স্বাবলম্ব থেকে শুরু করে প্রশাসনিক এবং অন্যান্য অধিকার আমাদের হস্তগত করার একটা সূচনা করে গেলেন। তার অবধারিত পরিনাম ছিল ১৯৭১ এবং আমাদের মনের উপনিবেশ-মুক্তির জন্য তিনি ৭ই মার্চ স্বাধীনতার এবং মুক্তিকে একই সঙ্গে রেখেছিলেন। বলেছিলেন, এই দুটোর জন্য আমাদের সংগ্রাম করতে হবে। এই মানের উপনিবেশমুক্তির মানে অর্থনেতিক মুক্তি, এটা মনেরও মুক্তি। কিন্তু গত পঞ্চাশ বছরে আমরা দেখাতে পেরেছি কি আমাদের মনটা উপনিবেশ থেকে মুক্তি পেয়েছে? পরিবারগুলো কি সন্তানদের সমানভাবে জায়গা দিচ্ছে? মেয়েরা কি আমাদের দেশে উপেক্ষিত? আমাদের সংখ্যালঘুরা কি নিরাপদ? আমাদের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী কি সেই জায়গাটা পাচ্ছে, যা আমাদের মূলধারার জনগোষ্ঠী পাচ্ছে? আমাদের ক্ষুদ্র জাতিসত্তাগুলো কি সম্মানিত, তাদের জায়গাটা কি সুরক্ষিত? প্রশ্নগুলো অবধারিতভাবে আমাদের করতে হবে, কারণ যদি উত্তর আসে ‘না’—তাহলে বুঝতে হবে আমাদের মনের উপনিবেশ-মুক্তি হয়নি। তাহলে আর কোনো সংগ্রামই আমাদের ঔপনিবেশিক কাঠামো থেকে বেরোতে পারবে না?

তাহলে আমাদের আগামী রাজনীতি পরিচালিত হবে ঔপনিবেশিক কাঠামোটাকে কার অনুকূলে নিয়ে যাওয়া যায় সেই দিকেই? এখন একটি দল আরেকটি দলের জায়গা নিলে আমাদের গুণগত কোনো পরিবর্তন রাজনীতিতে হবে না। শুধু রাজনীতির নিয়ন্ত্রক যারা তারা পরিবর্তিত হবে। তাদের নতুন নতুন চিন্তাভাবনা আসবে কিন্তু সবই ঔপনিবেশিক ধারায় পরিচালিত হবে। ফলে বৈষম্য থেকেই যাবে—গ্রাম শহরের বৈষম্য ধনী-গরিবের বৈষ্যম্য, শ্রেণিগত বৈষম্য—সবই পুরাতন প্রথায় চলতে থাকবে। আর যদি মনের উপনিবেশমুক্তি ঘটাতে পারি,তাহলে যে কোনো কাঠামো স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিবর্তিত হবে। তখন ক্ষমতা আর বিশেষ সুবিধার জন্য মানুষ রাজনীতি করবে না। রাজনীতি হবে জনকল্যাণমুখী। তখন ব্যবসায়ীরা রাজনীতিতে উত্সাহিত হবেন না। কারণ ব্যবসা আর রাজনীতি একসঙ্গে যায় না। ব্যাবসায়ের উদ্দেশ্য হচ্ছে মুনাফা আর রাজনীতির উদ্দেশ্য কখনো মুনাফা নয়। তখন তৃণমূলের রাজনীতিকরা আসবেন এবং তারাই রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করবেন। যার ভবিষ্যতে আমরা অনেক পাথেয় সংগ্রহ করতে পারব। মনের উপনিবেশমুক্তির জন্য সংস্কৃতির প্রয়োজন। সংস্কৃতিকে শক্তিশালী করতে হবে। শিক্ষাটাকে যোগোপযুগী করতে হবে, মানসম্পন্ন করতে হবে। শিক্ষা মনটাকে জাগাবে। শিক্ষা শুধু চাকরি জোটানোর একটা অস্ত্র হবে না। শিক্ষা আলোকিত মানুষ গড়ে তোলার একটা উপায় হয়ে দাঁড়াবে। তাহলে মনের উপনিবেশমুক্তিও সম্ভব। মনের উপনিবেশমুক্তি হবে কুসংস্কার থেকে মুক্তি, বিজ্ঞানকে গ্রহণ করা, চিন্তাচেতনায় সামাজিক সম্পর্কের মধ্যে বৈষম্য বিলোপ করা। যার মনের উপনিবেশমুক্তি ঘটেছে সে এই সম্পর্কে কোনো কাজ করবে না। যদি আমরা সব নাগরিকের মনের উপনিবেশমুক্তি ঘটাতে পারি পর্যায়ক্রমে তাহলে বৈষম্যটা অবধারিতভাবে নিজে নিজে কমে যাবে। কারণ প্রত্যেকের দায়িত্ব নেবে প্রত্যেকে। মনের উপনিবেশমুক্তি এক ধরনের অন্তরমুক্তিমূলক সমাজ তৈরি করে। যে সমাজে সবার অধিকার স্বীকৃত এবং মানুষে মানুষে জাতিগত, বর্ণগত, আচরণগত নানা পার্থক্য থাকে, সেই পার্থক্যগুলোকে বিচার করার প্রয়োজন হতো না, এটির জন্য আমাদের এখন কাজ করতে হবে। যদি আমরা সামনের দিকে তাকাই, তাহলে সামনে তিনটি পথ খুলে যাবে। প্রথমত হচ্ছে আমাদের যে অর্জনগুলো এখনো দৃশ্যমান, যেমন—শিক্ষার বিস্তার ঘটেছে, আমাদের মানুষের ভেতরে চেতনা আসছে অনেক, যেমন এখন আমাদের জনসংখ্যার হারের বৃদ্ধি অনেক দেশ থেকে কম, আমাদের মেয়েরা কর্মক্ষেত্রে অনেক বেশি, আমাদের শিশুদের জন্য আমরা অনেক বেশি সচেতন—এই বিষয়গুলো আমাদের যতখানি অর্জন সেগুলো আমরা আরো বিস্তৃতভাবে বড় পেক্ষাপটে স্থাপন করতে পারব।

দ্বিতীয় হচ্ছে যে ব্যর্থতাগুলো আমাদের চোখে পড়ছে সে ব্যর্থতাগুলোকে নতুন আলোকে সাজানো এবং এগুলো সুরাহা করতে হবে। যেমন, এই যে কাঠামোগত সংস্কার বললাম সেটি শুধু কাঠামোগত হলে চলবে না, যাকে আমরা স্পিরিট বলছি সেটা চেতনাগতভাবে হতে হবে। ক্রমাগতভাবে হতে হবে। সেটি আমরা চেষ্টা করতে পারি, সে বৈষম্য আমরা সৃষ্টি করেছি সেখান থেকে মুক্তি দিতেই হবে, তা না হলে ভবিষ্যত্ আমাদের অতীতেরই পুনরাবৃত্তি হবে। আমরা যে  মতপ্রকাশের স্বাধীনতার

কথা বলি, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা যে কোনো একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজের জন্য যে কোনো ভবিষ্যত্মূল্য সমাজের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজন, তিনি যদি সত্যি সত্যি সেই লক্ষ্যে কাজ করেন; তখন আমরা দয়িত্বশীল আচরণটাও শিখব, আইন কেন হয়? কারণ অপরাধ হয় বলে। আমরা যদি একটা সমাজ তৈরি করতে পারি, যেখানে অপরাধের সংখ্যা কমে যাবে, সেখানে তো এত বেশি আইনের প্রয়োজনীয়তা নেই, আমরা ডিজিটাল আইনের বিরুদ্ধে লড়াই করছি, এটি অবশ্যই একটি নিপীড়নমূলক আইন, কারণ তার অপব্যবহার হচ্ছে। কিন্তু সেই ডিজিটাল আইন প্রয়োগের জন্য আমরাও  কি দায়ী ছিলাম না? আমরা কি সামাজিক যোগাযোগ বা মাধ্যমে রাজনৈতিক সংহতি নষ্ট করি না, আমরা কি জাতিগত সংহতি নষ্ট করার জন্য উসকানি দিই না? আমরা কি অন্য ধর্মমতাবলম্বীকে আঘাত করি না, আমরা কি ভ্রান্ত মত প্রচার করি না? আমরা কি একজনের বিরুদ্ধে আর একজন কুিসত আচরণ করি না? এগুলো যতদিন চলতে থাকবে ততদিন এই আইনটির কার্যকারিতা থেকে যাবে।

ফলে এই আইন বদলানোর আগে আমাদের নিজেদের প্রশ্ন করতে হবে যে আমরা কি সে অবস্থার জন্য তৈরি, যেখানে আমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল? এই দায়িত্বশীলতা শেখাবে কারা? কীভাবে শিখবে? মনের উপনিবেশমুক্তি থেকে। শিক্ষার আধুনিকীকরণের মধ্য থেকে। আমি যদি একটি সন্তানকে অল্প বয়স থেকে দায়িত্বশীল আচরণ শেখাই সংস্কৃতির বাঁকগুলো তাকে দিই, তাকে উদারতা শেখাই, সহনশীলতা শেখাই—তাহলে তার আচরণ ভবিষ্যতে অত্যন্ত সহায়ক হবে ঐ সমাজ পরিবর্তনের জন্য। সেজন্য আমাদের মনের উপনিবেশমুক্তির কথাটা তৃতীয় যে কথাটা ভবিষ্যতের জন্য বলছি সে কথাটা আমাদের লক্ষ্য রেখে এগোতে হবে, আমাদের প্রত্যেক কাঠামোকে বিন্যস্ত করব নতুন সম্ভাবনার আলোকে, একই সঙ্গে রাষ্ট্রকে ক্ষমতায়ন করব। নিজেদের যদি ক্ষমতায়ন করি তাহলে রাষ্ট্রর ক্ষমতায়ন হবে। শিক্ষার মাধ্যমে, সংস্কৃতির শুদ্ধতার মাধ্যমে যদি নিজেদের পরিবর্তন করি, তাহলে সরকারের দিকে আমাদের তাকিয়ে থাকতে হবে না।

আমরা যদি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ার জন্য সংগ্রাম করি, তাহলে সরকারের জন্য আমাদের বসে থাকতে হবে না। সবচেয়ে বড় মুক্তি হবে যখন সরকারকে অপ্রয়োজনায় করে রাখব। সরকার না থাকা সত্ত্বেও সরকার না থাকলেও আমরা যদি উন্নয়ন করতে পারি, তাহলে সরকার শুধু সহায়ক ভূমিকার থাকবে। সেই সরকার কখনো নিয়ন্ত্রণমূলক হতেই পারবে না। আমাদের লক্ষ্য হবে সেই দিক অগ্রসর হওয়া। সেজন্য আমাদের নতুন শিক্ষার চিন্তার প্রয়োজন। নতুন সমাজচিন্তার প্রয়োজন এবং তারুণ্যর শক্তিকে একত্র করে আমাদের সকলকে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় নেওয়া প্রয়োজন। সবকিছু যদি আমরা নিজেরা করতে পারি, তাহলে আমি মনে করি একটা ভারসাম্য তৈরি হবে, যেখানে রাষ্ট্র শুধু পথপ্রদর্শকের ভূমিকায় থাকবে, নিয়ন্ত্রকের ভূমিকার থাকবে না। কারণ তখন ক্ষমতা থাকবে ব্যক্তির হাতে, আর প্রত্যেক ব্যক্তি যখন সক্ষম হবে, তখন প্রত্যকে প্রত্যেকের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে থাকবে, তখন দেখা যাবে কেউ কাউকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য ইচ্ছা প্রকাশ করছে না।

তখন নারীরা স্বাধীন হবেন, তখন শিশুরা সুস্থ থাকবে এবং দরিদ্র বলতে যারা থাকবে তাদের সহায়তা দেওয়ার জন্য প্রত্যেকে তৈরি থাকবে ফলে দারিদ্র্য নিরসন হবে। প্রকট হয়ে দাঁড়াবে না। অত্যন্ত সহনশীল মাত্রায় চলে যাবে। এমন একটা রাষ্ট্র আমরা চাই ভবিষ্যতে এই সুবর্ণজয়ন্তীর পথ ধরে এগিয়ে আগামী ৩০-৪০ বছরে—রাষ্ট্রটা অত্যন্ত মানবিক হবে, যেখানে মনের উপনিবেশবাদী শক্তি সম্পূর্ণভাবে ঘটবে, যেখানে প্রত্যেক নাগরিক তার অধিকার ভোগ করবেন, আর সরকার শুধু প্রত্যেকের সম্পতি নিয়ে এ সরকার আমাদের কিছু পথপ্রদর্শন করতে তৈরি থাকবে এবং কাজগুলো আমাদের পক্ষে অব্যাহত রাখবে। এরকম একটা সমাজে সবাই সচেতন থাকবে, দুর্নীতিও হবে না এবং কেউ বিনা চিকিত্সায় মারা যাবে না। আমি এই ধরনের একটি সমাজ কল্পনা করি এবং আমি বিশ্বাস করি একজন শিক্ষক হিসেবে নিজেদের মধ্য থেকে শুরু করে এক প্রজন্মের মধ্যে করা সম্ভব। কারণ তরুণরা প্রস্তুত তাদেরকে পথ দেখাবার জন্য। সামনে কিছু নেতৃত্ব প্রয়োজন। এই নেতৃত্ব হবে, সমাজ থেকে উঠে আসবে প্রধানত শিক্ষকরা পরিবারের ভিতরে যারা বয়স্ক আছেন তারা। তারপর সবার সম্মতিক্রমে রাজনৈতিক নেতারা, যারা নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য তৈরি হবেন আর যদি নেতৃত্ব সমাজ থেকে তৈরি হয় তাহলে নেতৃত্ব জনগণ থেকে কখনো আলাদা আসনে বসার চিন্তা করবে না। জনগণের সঙ্গেই তাদের আসন গ্রহণ করতে হবে।

লেখক :কথাসাহিত্যিক