যদি প্রশ্ন করা হয়, ভারতে প্রথমবার একটি রাজ্যের বিধায়ক হয়েই কে মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন কিংবা প্রথমবার লোকসভার সদস্য হয়েই কে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন অথবা স্বাধীন ভারতে জন্ম নেওয়া প্রথম ও একমাত্র ব্যক্তি কে, যিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন? এই সবগুলো প্রশ্নের উত্তর হলো নরেন্দ্র মোদি।
ভারতে ‘মোদি ম্যাজিক’ বলে একটি কথা প্রচলিত আছে। নরেন্দ্র মোদির জীবন আলেখ্যের দিকে চোখ বোলালে যে কেউ বিস্মিত হবেন। তৃতীয় বিশ্বের দেশ হিসেবে ভারতের বেশির ভাগ মানুষই গরিব। নরেন্দ্র মোদির জন্ম তেমনি একটি দরিদ্র পরিবারে। বাবা ছিলেন সামান্য চা-বিক্রেতা। চার সন্তানের মধ্যে মোদি ছিলেন তৃতীয়। শৈশবে বাবাকে সাহায্য করতে মোদিও বেদনগর রেলস্টেশনে হেঁটে হেঁটে যাত্রীদের কাছে চা বিক্রি করতেন। তাদের বাড়িটিতেও দারিদ্র্যের ছাপ ছিল স্পষ্ট। আলো-বাতাসের অবাধ চলাচল ছিল না সেই বাড়িতে। সেখানে জ্বলতে থাকা একমাত্র বাতিটি নিরন্তর জোগান দিত ধোঁয়া আর কালি। মোদি সেই ধোঁয়া-কালি পাশ কাটিয়ে ক্ষীণ আলোতেই নিজের ভেতরের প্রদীপ জ্বালাতেন। আর দশটা সাধারণ ছাত্রের মতোই মোদির পড়ালেখা চলতে থাকে। পড়ালেখায় যে বিশেষ মেধার পরিচয় দিয়েছেন, তা নয়। এখানেও তিনি সাধারণ। কেবল বিতর্কে পাওয়া যেত তার প্রত্যুত্পন্নমতিত্ব। কথিত আছে, নরেন্দ্র মোদির যখন ১২ বছর বয়স, তখন তার মা মোদির জন্মকুণ্ডলি এক জ্যোতিষকে দেখিয়েছিলেন। মোদির কুণ্ডলি দেখে সাধু মহারাজ বলেছিলেন যে, হয় আপনার ছেলে রাজা হবে, না হয় নতুন শঙ্করাচার্যের মতো বড় সন্তু হবে। এ কথা জেনে মা শ্রীমতি হীরাবেন কম বয়সে মোদির বিয়ে দেন, যাতে মোদি সাধু হয়ে যেতে না পারেন। ‘বিরাজ বৌ’ উপন্যাসে শরত্চন্দ্র যেমন বলেছেন, ‘ভাগ্যকে আমরা বলি অদৃষ্ট, অর্থাত্ যা দেখা যায় না। বিধাতা মানুষের ভাগ্যকে গোপন করে রাখেন যবনিকার আড়ালে।’ মোদির ক্ষেত্রেও ব্যাপারটি তেমনি ঘটে। মা হীরাবেন যেই ভয়ে মোদিকে আগে আগে বিয়ে দিলেন, বিয়ের পর সেই ভয়টিই যেন আরো গতি পেল। মোদি সংসারজীবন ত্যাগ করে বাড়ি ছেড়ে চলে যান হিমালয়ে। হিমালয়ে গিয়ে তিনি সাধুবত্ দুটি বছর পার করলেন। কথিত আছে, সে সময় মোদিকে এক সাধু জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে, উনি এখানে কেন এসেছেন। এর উত্তরে মোদি বলেছিলেন, তিনি ঈশ্বরের সন্ধানে হিমালয়ে এসেছেন। সাধু তখন বলেছিলেন, তোমার বয়স কম, তুমি সমাজের ও দেশের সেবা করে ঈশ্বরপ্রাপ্তি করতে পারো।
লোকসমাজে একটি কথা প্রচলিত আছে যে, দুধ ও জল যদি আপনি মিশিয়ে দেন তো অদ্ভুত দক্ষতায় হাঁস চকচক করে দুধটুকু খেয়ে নিয়ে জলটুকু ফেলে রাখে। এ ধরনের হাঁসকে বলা হয় পরমহংস। ভারতের প্রখ্যাত ধর্মগুরু রামকৃষ্ণকে এ কারণে বলা হয় পরমহংস। রামকৃষ্ণের শিষ্য ছিলেন স্বামী বিবেকানন্দ। একটি পর্যায়ে এসে স্বামী বিবেকানন্দের নীতি-আদর্শের ছায়ায় নিজেকে বিলীন করেন মোদি। ১৯৬৭ সালে চূড়ান্তভাবে পরিবারের সঙ্গ ত্যাগ করেন মোদি। এরপর তিনি রাষ্ট্রীয় সেবক সংঘে (আরএসএস) আনুষ্ঠানিকভাবে যোগদান করেন ১৯৭১ সালে। সে সময় তিনি ভোর চারটায় ঘুম থেকে উঠে আরএসএসে আসা বিভিন্ন চিঠির উত্তর দিতেন। একই সঙ্গে চা তৈরি করা, বাসন-কোসন মাজা, ঝাড়ু দেওয়া ছাড়াও সমগ্র ভবন পরিষ্কার করতেন তিনি। এর পাশাপাশি নিজের পোশাক-আশাক নিজেই ধুতেন। এভাবেই জীবনের প্রারম্ভিক বাধাবিপত্তিগুলো তাকে কেবল কঠোর পরিশ্রমের মূল্যবোধই শেখায়নি, সেই সঙ্গে সাধারণ মানুষের অসহনীয় সংগ্রামগুলোর প্রতিও তাকে সংবেদনশীল করে তুলেছিল। কঠিন পরিশ্রমের মূল্যবোধ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি নিজেকে ভিন্ন মানুষ হিসেবে গড়ে তোলেন। তার হূদয়ে বৃহদারণ্যক উপনিষদের একটি বাণী অনুরণিত হতো গভীর ভাবে—‘অসতো মা সদ্গময় / তমসো মা জ্যোতির্গময় / মৃত্যোর্মামৃতং গময়। / আবিরাবীর্ম এধি।’ বাংলায় তর্জমা করলে এর অর্থ দাঁড়ায়—(হে ঈশ্বর) ‘অসত্য থেকে আমাকে সত্যের পথে নিয়ে যাও, অন্ধকার থেকে আমাকে আলোর পথে নিয়ে যাও, মৃত্যু থেকে আমাকে অমৃতের পথে নিয়ে যাও।’ মানুষের জন্য কাজ করার মানসে মোদি রাজনীতিতে নাম লেখান। তিনি ভারতীয় জনতা পার্টিতে (বিজেপি) যোগদান করেন ১৯৮৭ সালে। নরেন্দ্র মোদির বিস্ময়কর উত্থান প্রমাণ করে, ভারতের মতো দেশে মানুষের জন্য কাজ করতে চাইলে শেকড় থেকেই শীর্ষে পৌঁছানো যায়। এটা কেবল মোদির একক ক্যারিশমা নয়, ভারতের রাজনৈতিক সংস্কৃতিও এই পথ তৈরি করতে পেরেছে। এভাবেই মোদি অতি সাধারণ থেকে ক্রমশ অতি অসাধারণের নন্দনলোকে প্রবেশ করেন। ২০০১ সালে তিনি যখন গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী হন, তখন উন্নয়ন ও সুপ্রশাসনের উজ্জ্বল উদাহরণ হিসেবে ‘জাগ্রত গুজরাট’ সৃষ্টি করতে মোদির চলার পথটি মোটেই সহজ ছিল না। তারপর মাত্র ১২ বছরের মাথায় তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী পদে প্রার্থী হন। তার ক্যারিশম্যাটিক শরীরি ভাষায় একটি শব্দযুগল জনপ্রিয়তা পায়, সেটি হলো ‘মোদি ম্যাজিক’। ২০১৯ সালে তিনি যখন দ্বিতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী পদে জয়ী হন, সেই নির্বাচনের আগে বলা হয়েছিল, মোদি ম্যাজিক আর আগের মতো নেই। কিন্তু বিশ্ব দেখেছে, ম্যাজিক তখনো অনেক বাকি। নরেন্দ্র মোদি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি—মানুষের জন্য যে কোনো সরকারের দুটি প্রধান স্তম্ভ। তিনি নিজেকে প্রধানমন্ত্রীর পরিবর্তে ‘চৌকিদার’ বলতেই বেশি পছন্দ করেন। তিনি মনে করেন, প্রতিটি ভারতীয় যারা ভারতের অগ্রগতির জন্য দুর্নীতি, ময়লা, সামাজিক কুফল ইত্যাদির বিরুদ্ধে লড়াই করে যাচ্ছে, তারাও ‘চৌকিদার’।
নরেন্দ্র মোদি বাংলার অগ্রদূত স্বামী বিবেকানন্দের ভাবশিষ্য। স্বামী বিবেকানন্দের একটি বিখ্যাত উক্তি আছে—‘জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর।’ মানুষ তো অনেক বড় ব্যাপার, প্রতিটি জীবের প্রতি ভালোবাসা দেখানোর মধ্যেই রয়েছে ঈশ্বরের প্রতি প্রকৃত নৈবেদ্য। সুতরাং দল-মত-ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে মোদির অন্তরে মানবপ্রেম অনির্বাণ শিখার মতো অনিঃশেষ জ্বলতে থাকে। এজন্যই অনেকেই মনে করেন, মোদি ম্যাজিক এখনো অনেক বাকি।
Å তাপস কুমার দত্ত
