চট্টগ্রামের পারকি সমুদ্র সৈকতে আটকে পড়া সমুদ্রগামী জাহাজ এমভি ক্রিস্টাল গোল্ডকে সরাতে আবারো সৃষ্টি হয়েছে চরম অনিশ্চয়তার। নানামুখী আইনি জটিলতার মুখে জাহাজটি কেটে নিতে সমস্যায় পড়েছে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান। দীর্ঘদিন ধরে ধার-দেনার দায়ে গ্রেফতার হওয়া জাহাজটি অবশেষে ঢাকা এডমিরালটি কোর্ট থেকে ১১ কোটি টাকার নিলামে কিনেছিল ফোর স্টার শিপ ব্রেকিং নামের একটি শিপ ব্রেকিং ও রিসাইক্লিং প্রতিষ্ঠান।
২০১৭ সালের ৩০ মে ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা’র আঘাতে জাহাজটি নোঙর ছিঁড়ে চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার উপকূল সংলগ্ন পারকি সমুদ্র সৈকতে উঠে পড়েছিল। জাহাজটি সৈকতের মাটি ও বালিতে দেবে যাওয়ায় গত বছর মাটি কেটে ট্রেঞ্চ বানিয়ে ড্রেগিং করে টেনে নামানোর চেষ্টা করেছিল সংশ্লিষ্টরা। ঐ সময় সৈকত বিনষ্ট করাসহ ড্রেগিং করে সমুদ্রে নামানোর প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে ব্যাপক আপত্তি উঠেছিল স্থানীয় বিভিন্ন মহলের পক্ষ থেকে।
একদিকে পারকি সৈকত সরকারের গেজেটভুক্ত পর্যটন স্পট, অন্যদিকে এই সৈকতে জাহাজ কাটার বিষয়ে রয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তরের আইনি বিধিনিষেধ, সেই সঙ্গে জাহাজটিকে ড্রেগিং করে সমুদ্রে নামিয়ে শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে নেয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতায় জাহাজটির ভবিষ্যত্ কি হবে এনিয়ে প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। ঘূর্ণিঝড় মোরা’র আঘাতে পারকি সৈকতে উঠার আগে জাহাজটি দায়দেনার মামলায় গ্রেফতার হয়ে বহির্নোঙরে নোঙর করা ছিল।
ফোর স্টার শিপ ব্রেকিংয়ের স্বত্বাধিকারী আবুল কালাম আজাদ ইত্তেফাকের কাছে জাহাজটি কাটার ক্ষেত্রে উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে গভীর হতাশা ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেন, জাহাজটি যাতে কেটে সৈকত থেকে সরিয়ে নেয়া যায় সেজন্য তিনি উচ্চতর আদালতের অনুমতির জন্য আবেদন করবেন। এ মুহূর্তে কারো কিছু করার নেই বলেও তিনি জানান।
বিস্ফোরক অধিদপ্তর চট্টগ্রামের পরিচালক তফাজ্জল হোসেন ইত্তেফাককে বলেন, উচ্চতর আদালতে নিলাম হওয়ার পর আদালতের কোর্ট মার্শাল চট্টগ্রামে এসে জাহাজটি ক্রেতাদেরকে বুঝিয়ে দিয়ে গেছে। তারা জাহাজটি সৈকতে কাটার ব্যাপারে আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী সহায়তা পেতে চট্টগ্রাম বিস্ফোরক অধিদপ্তরে আবেদনও করে। বিষয়টি জানানো হয় অধিদপ্তরের মহাপরিচালককেও। কিন্তু সমস্যা দাঁড়ায় স্থানটি গেজেটভুক্ত পর্যটন এলাকা হওয়ায়। তার ওপর অনুমোদিত শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড নয়। সেই সঙ্গে জাহাজটি সেখানে কাটলে সৈকত ও সমুদ্রের পানি দূষিত হওয়ার প্রশ্নও আছে। কাজেই তাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তাত্ক্ষণিক উত্তর দেয়াও কঠিন হয়ে পড়ে। জাহাজটি সৈকত থেকে সমুদ্রে নামানো কঠিন। কী অবস্থায় সেটি সেখান থেকে সরানো হবে তা পর্যবেক্ষণ করা ছাড়া এখন করার কিছুই নেই।
এদিকে গত ৪ জানুয়ারি পরিবেশ অধিদপ্তরের একটি দল পারকি সৈকতে জাহাজটি পরিদর্শন করে জাহাজ ক্রেতা প্রতিষ্ঠানকে নোটিস প্রদান করে। গত রবিবার ঐ প্রতিষ্ঠানকে ডেকে এনে শুনানি করে প্রায় ২ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ করে অধিদপ্তর। অধিদপ্তরের মতে কোনো ধরনের অনুমোদন ছাড়া ঘের দিয়ে জাহাজটির ভেতরে কাটা শুরু হয়েছিল। পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রামের সহকারী পরিচালক (টেকনিক্যাল) বদরুল হুদা ইত্তেফাককে বলেন, জাহাজটি ক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান পরিবেশ আইন অমান্য করে জাহাজটির ভেতরেই কাটার কাজ শুরু করেছিল। ফলে শুক্রবার স্পটে গিয়ে অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা নোটিস দিয়ে গত রবিবার শুনানি করে ২ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণের নির্দেশ দেয়। এটা দেয়া হয়েছে ১৯৯৫ সালের পরিবেশ আইনের ৭ ধারা অনুসারে। তার মতে জাহাজটি কোর্ট থেকে কেনা হলেও তা কাটার ক্ষেত্রে বিধিবদ্ধ আইন রয়েছে। জাহাজটি কোনো শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে নয়, রয়েছে গেজেটভুক্ত পর্যটন এলাকায়।
সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, পারকি সৈকত থেকে এমভি ক্রিস্টাল গোল্ডকে যেকোনো উপায়েই হোক সরাতে হবে। উচ্চতর প্রযুক্তি প্রয়োগ করতে গেলে ক্রেতা প্রতিষ্ঠানকে খরচ করতে হবে বিপুল অংকের টাকা। এছাড়া এটিকে সমুদ্রে নামাতে হলে উচ্চতর প্রযুক্তির পাশাপাশি নিযুক্ত করতে হবে দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদেরও। কিন্তু সম্প্রতি জাহাজটি কাটার ক্ষেত্রে আইনগত বিষয় উঠে আসায় এটি গলার কাঁটার মতোই রয়ে গেলো। এ বিষয়ে আদালত, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানসমূহ এবং ক্রেতাপক্ষ মিলে যৌথ পরামর্শে একটি উপায় বেরিয়ে আসতে পারে বলেও সূত্রটির অভিমত। কারণ জাহাজটি পর্যটন এলাকা পারকিতে পর্যটনের সৌন্দর্যহানি ঘটাচ্ছে।
