আনন্দ, বেদনা ও বিনম্র শ্রদ্ধায় মহান মুক্তিযুদ্ধের শহিদদের স্মরণ এবং সাম্প্রদায়িক অপশক্তিকে প্রতিহত করে জঙ্গিবাদমুক্ত অসাম্প্রদায়িক আধুনিক বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ের মধ্য দিয়ে বর্ণিল আয়োজনে বাঙালি জাতি পালন করল স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী। দীর্ঘ সংগ্রামের পথ বেয়ে অর্জিত স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তি উদ্যাপন উপলক্ষ্যে গতকাল শুক্রবার এক অন্যরকম স্বস্তি, আনন্দ ও শপথে জেগে উঠেছিল আত্মনির্ভরতার প্রেরণায় উজ্জীবিত বাঙালি। স্বাস্থ্যবিধি মেনে সারা দেশেই নতুন প্রজন্মের অভূতপূর্ব গণজাগরণ এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে এবারের মহান স্বাধীনতা দিবসে। দেশবিরোধী সব ষড়যন্ত্র রুখে দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সমুন্নত রেখে স্বনির্ভর সুখী-সমৃদ্ধ দেশ গড়তে নতুন প্রজন্মকে দীপ্ত শপথে বলিয়ান হতে দেখেছে দেশবাসী। রাস্তায় বের হওয়া মানুষের হাতে বা কপালে সব যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চাই লেখা সংবলিত কাপড় বাঁধা, শিশু-কিশোরদের হাতে, কারো গালে বা কপালে আঁকা ছিল রক্তস্নাত জাতীয় পতাকা, প্রিয় মাতৃভূমির মানচিত্র। তরুণ প্রজন্মের ছেলেদের গায়ে জাতীয় পতাকাসদৃশ শর্ট পাঞ্জাবি বা গেঞ্জি এবং মেয়েরা লাল-সবুজের মিশ্রণে জাতীয় পতাকার মতো শাড়ি পরে অংশ নিয়েছিল এবারের স্বাধীনতার আনন্দ-উত্সবে।
স্মৃতিসৌধে রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা
দিনের শুরুতে মিরপুর সেনানিবাসে ৫০ বার তোপধ্বনি দিয়ে শুরু হয় স্বাধীনতা দিবসের উদ্যাপন। ভোরে সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে বীর শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রথমে রাষ্ট্রপতি এবং পরে প্রধানমন্ত্রী শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। পুষ্পস্তবক অর্পণের পর রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী মহান মুক্তিযুদ্ধে শহিদদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন। এ সময় বাংলাদেশ সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর একটি চৌকস দল রাষ্ট্রীয় সালাম ও গার্ড অব অনার প্রদান করে। বিউগলে বেজে ওঠে করুণ সুর। পরে রাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রী সেখানে রক্ষিত পরিদর্শন বইতে স্বাক্ষর করেন। এ সময় জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী, প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, বঙ্গবন্ধুর কনিষ্ঠ কন্যা শেখ রেহানা, আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতৃবৃন্দ, পদস্থ বেসামরিক ও সামরিক কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
নরেন্দ্র মোদির শ্রদ্ধা
এদিকে সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে শহিদ বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। শুক্রবার বেলা ১১টা ৪৫ মিনিটে হেলিকপ্টারযোগে বীর শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে তিনি সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে এসে পৌঁছলে তাকে স্বাগত জানান মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী, গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী, নবম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি, জেলা পুলিশ সুপারসহ সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ। পরে তিনি জাতীয় স্মৃতিসৌধের মূল শহিদ বেদিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণের মাধ্যমে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন এবং নীরবতা পালন করেন। এ সময় তিন বাহিনীর একটি সুসজ্জিত চৌকস দল ‘গার্ড অব অনার’ প্রদান করে। বিউগলে বেজে উঠে করুণ সুর। পরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী স্মৃতিসৌধ প্রাঙ্গণে একটি অর্জুন গাছের চারা রোপণ করেন। নরেন্দ্র মোদি সেখানে রক্ষিত পরিদর্শন বইতে স্বাক্ষর করেন। পরিদর্শন বইতে তিনি লিখেছেন, ‘যাদের আত্মত্যাগে মহান জাতির জন্ম হয়েছে বাংলাদেশের সেই দেশপ্রেমিক বীর শহিদদের প্রতি আমি গভীর শ্রদ্ধা জানাচ্ছি’। দুপুর ১২টা ১০ মিনিটে তিনি ঢাকার উদ্দেশে স্মৃতিসৌধ এলাকা ত্যাগ করেন।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী এবং স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষ্যে আয়োজিত অনুষ্ঠানে যোগ দিতে ঢাকায় এসেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ‘মুজিব চিরন্তন’ প্রতিপাদ্যে ১০ দিনের এই কর্মসূচি শুরু হয় ১৭ মার্চ, বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে। গতকাল শুক্রবার স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তির দিনে তা শেষ হয়। জাতীয় প্যারেড স্কয়ারের থিম ছিল ‘স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর ও অগ্রগতির সুবর্ণরেখা’। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ছিলেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, বিশেষ অতিথি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
শুধু সাভারস্থ জাতীয় স্মৃতিসৌধই নয়, শ্রদ্ধাবনত জাতি ফুলে ফুলে ভরে দেয় ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি এবং টুঙ্গিপাড়ার বঙ্গবন্ধুর মাজারের বেদিমূল। সবার মধ্যে ছিল শহিদদের অকৃত্রিম শ্রদ্ধায় ভরিয়ে দেওয়ার অনুভূতি। রাজধানী থেকে শুরু করে শহর-বন্দর-গ্রামে ছিল স্বাধীনতা দিবসের প্রতিটি কর্মসূচিতে নতুন প্রজন্মের ঢল, তাদের চোখে-মুখে ছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধরে রাখার দীপ্ত শপথ আর স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তির বিরুদ্ধে তীব্র ঘৃণা-ধিক্কার।
বঙ্গবন্ধুর প্রতি প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সকালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধ থেকে ফিরে রাজধানীর ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরের সামনে জাতির পিতার প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে তার প্রতি শ্রদ্ধা জানান। পুষ্পস্তবক অর্পণের পর স্বাধীনতার স্থপতি এবং সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী এবং বিমান বাহিনীর একটি চৌকস দল এ সময় অভিবাদন জানায়। এ সময় বিউগলে করুণ সুর বাজানো হয়। পরে প্রধানমন্ত্রী তার ছোট বোন শেখ রেহানাকে নিয়ে বঙ্গবন্ধু জাদুঘরে প্রবেশ করেন এবং ১৫ আগস্টের কালোরাতে ঘাতকের গুলিতে নিহত মহান নেতা রক্তাক্ত অবস্থায় সিঁড়িতে যেখানে পড়ে ছিলেন সেখানে ফুলের তোড়া অর্পণ করেন।
স্বাধীনতা দিবসে স্মারক ডাকটিকিট ও উদ্বোধনী খাম অবমুক্ত করলেন প্রধানমন্ত্রী
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষ্যে একটি স্মারক ডাকটিকিট এবং উদ্বোধনী খাম অবমুক্ত করেছেন। গতকাল সকালে তিনি তার সরকারি বাসভবন গণভবনে ১০ টাকার স্মারক ডাকটিকিট এবং উদ্বোধনী খাম অবমুক্ত করেন। ডাক ও টেলিযোগাযোগ সচিব মো আফজাল হোসেন ও বাংলাদেশ ডাক অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. সিরাজ উদ্দীন এ সময় উপস্থিত ছিলেন। ডাকটিকিট ও উদ্বোধনী খাম আজ থেকে ঢাকা জিপিও ডাকটিকিট সংগ্রহশালা থেকে এবং পরে দেশের অন্যান্য জিপিওতে পাওয়া যাবে।
বীর মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য
প্রধানমন্ত্রীর ফল-মিষ্টি
স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা ও শহিদ বীর মুক্তিযোদ্ধাদের পরিবারের জন্য ফল এবং মিষ্টি পাঠিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে জানানো হয়েছে, শুক্রবার সকালে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের গজনবী রোডে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা পুনর্বাসন কেন্দ্রে (মুক্তিযোদ্ধা টাওয়ার-১) প্রধানমন্ত্রীর সহকারী একান্ত সচিব-২ গাজী হাফিজুর রহমান লিকু এবং সহকারী প্রেস সচিব এ বি এম সরওয়ার-ই-আলম সরকার প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে এসব উপহার তুলে দেন। এ সময় যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও শহিদ মুক্তিযোদ্ধাদের পরিবারের সদস্যরা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন ও ধন্যবাদ জানান।
