থানায় হামলা, রেল স্টেশনে আগুন, সংঘর্ষে নিহত ৫

আপডেট : ২৬ মার্চ ২০২১, ২৩:০১

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঢাকায় আগমনের প্রতিবাদে হেফাজতে ইসলামের সমর্থক মাদ্রাসা ছাত্ররা গতকাল শুক্রবার রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংস বিক্ষোভ করেছে। এ সময় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে কমপক্ষে পাঁচ জন নিহত ও ৭০ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। রাজধানীর বায়তুল মোকাররম এলাকায় জুমার নামাজের পর পুলিশ-বিক্ষোভকারী সংঘর্ষে সাংবাদিকসহ ৪০ জন আহত হয়েছে। চট্টগ্রামে মাদ্রাসা ছাত্রদের মিছিল থেকে হাটহাজারী থানায় হামলা চালানো হয়। একই সঙ্গে স্থানীয় ভূমি অফিস ও ডাকবাংলোয় ব্যাপক ভাঙচুর চালায় বিক্ষোভকারীরা। পুলিশ বাধা দিলে সংঘর্ষে চার জন গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। এ ঘটনায় পুলিশসহ অন্তত ১০ জন আহত হয়েছে। এছাড়া ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলস্টেশনে হামলা ও অগ্নিসংযোগ করে বিক্ষোভকারীরা। এতে সিলেট ও চট্টগ্রামের সঙ্গে সকল প্রকার ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। বিক্ষুব্ধ ছাত্ররা পুলিশ সুপার কার্যালয়ের গ্যারেজে থাকা একটি গাড়িতেও অগ্নিসংযোগ করে। এ সময় সংঘর্ষে পুলিশসহ ২০ জন আহত হয়। আহত এক তরুণ জেলা সদর হাসপাতালে চিকিত্সাধীন অবস্থায় মারা যান। এদিকে পটিয়ায় কওমি মাদ্রাসার মিছিল থেকে থানায় হামলার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

একাধিক প্রত্যক্ষদর্শীর বরাত দিয়ে চট্টগ্রাম অফিস ও হাটহাজারী সংবাদদাতা জানান, জুমার নামাজের পর দুপুর সোয়া ২টার দিকে হাটহাজারী দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম মাদ্রাসার ছাত্ররা চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি মহাসড়কে মিছিল বের করে। এক পর্যায়ে মিছিল থেকে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করা হলে হাটহাজারী থানার দরজা ও জানালার কাচ ভেঙে যায়। থানার আসবাবপত্রও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ সময় হেফাজত কর্মীদের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া শুরু হলে পুলিশ কয়েক রাউন্ড গুলি করে তাদেরকে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এ সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে চার জন মারা যান। নিহতরা হলেন, রবিউল ইসলাম, মেহরাজ, জামিল ও আবদুল্লাহ। চমেক হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক জহির চার জন নিহত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। নিহতদের মধ্যে রবিউল, মেহরাজ ও জামিল হাটহাজারী দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম মাদ্রাসার ছাত্র এবং আবদুল্লাহ এলাকায় দর্জির কাজ করেন। নিহত রবিউলের বাড়ি কুমিল্লার মনোহরগঞ্জে, মেহরাজের বাড়ি মাদারীপুর। জামিল ও আবদুল্লাহ হাটহাজারীর স্থানীয় বাসিন্দা বলে জানা গেছে। চার জনের মৃত্যুর খবরে বিক্ষুব্ধ স্বজনরা চট্টগ্রাম মেডিক্যালের জরুরি বিভাগে ভাঙচুর চালান। এতে এক জন আহত হন। ঘটনার পর মাদ্রাসার বিক্ষুব্ধ ছাত্ররা সড়কে অবস্থান নেওয়ায় চট্টগ্রাম-রাঙামাটি-খাগড়াছড়ি আঞ্চলিক মহাসড়কে যানবাহন চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। রাতে এই রিপোর্ট লেখার সময় পর্যন্ত সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়নি। নিহত চার জনকে নিজেদের কর্মী দাবি করে ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী।

হাটহাজারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রুহুল আমিন ইত্তেফাককে জানান, জুমার নামাজের পর মিছিল নিয়ে থানা, ভূমি অফিস ও ডাকবাংলোয় হামলা করে হেফাজতের নেতাকর্মীরা। তারা ভূমি অফিসে ব্যাপক ভাঙচুর চালিয়েছে। অফিসের গুরুত্বপূর্ণ ফাইল ও আসবাবপত্রে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। একটি গাড়িতে আগুন দেয়।

এদিকে চট্টগ্রাম নগরীর চান্দগাঁওয়ের একটি পরিত্যক্ত ভবনে পাওয়া বিস্ফোরকভর্তি ব্যাগ গতকাল ধ্বংস করেছে সিএমপির বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট। এতে কমপক্ষে আটটি দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি ককটেল ছিল বলে ধারণা করছে পুলিশ। মশাল তৈরি ও বিস্ফোরক মজুতের ঘটনায় দুটি মামলা হচ্ছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি জানান, দুপুর আড়াইটার দিকে শহরের প্রধান সড়ক টিএ রোডে মাদ্রাসার ছাত্ররা ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু করে। এ সময় তারা প্রধান সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেয়। শহরের সমস্ত দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়। পরে বিক্ষুব্ধরা বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে রেল স্টেশনে গিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। রেল স্টেশনের সিগন্যাল, মাস্টার রুম, কন্ট্রোল রুমসহ অন্যান্য কর্মকর্তাদের কক্ষে ব্যাপক ভাঙচুর করে। সমস্ত মালামাল একত্রিত করে আগুন ধরিয়ে দেয়। রেললাইনের স্লিপার তুলে ফেলে বিক্ষুব্ধরা। সিগন্যাল বক্স ভেঙে আগুন ধরিয়ে দেয়। এর ফলে ঢাকার সঙ্গে সিলেট ও চট্টগ্রামের সঙ্গে সকল প্রকার ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে পড়ে। ঢাকাগামী কর্ণফুলী এক্সপ্রেস ট্রেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেল স্টেশনে প্রবেশ করার সময় বিক্ষুব্ধরা পাথর নিক্ষেপ করলে ট্রেনটি ফিরে যায়।

পরে বিকাল সোয়া ৫টার দিকে জেলা পরিষদ কার্যালয়ে ব্যাপক হামলা চালানো হয়। সড়কে আগুন ধরিয়ে রাস্তায় অবরোধ করা হয়। এ ঘটনায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সঙ্গে দেশের বিভিন্ন স্থানে দূরপাল্লার সব যানবাহন বন্ধ হয়ে যায়। শহরের বিভিন্ন স্থানে বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল, সিসিটিভি ক্যামেরা ভেঙে ফেলা হয়। এক সময় বিক্ষুব্ধরা জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, জেলা জজের বাসভবনের মূলফটকে হামলা চালায়। বিক্ষুব্ধরা জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয়ে হামলা চালিয়ে গ্যারেজে থাকা গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। বিকালের দিকে শহরের কাউতলী এলাকার দাতিয়ারা গ্রামের সাগর মিয়ার ছেলে আশিক (২৫) গুরুতর আহত হয়ে জেলা সদর হাসপাতালে নিয়ে আসলে চিকিত্সারত অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। পরে বিক্ষুব্ধরা লাশ নিয়ে শহরে বিক্ষোভ করে।

পটিয়া (চট্টগ্রাম) সংবাদদাতা জানান, চট্টগ্রামের পটিয়ায় আল জামেয়া আল ইসলামিয়া জমিরিয়া মাদ্রাসার ছাত্ররা বিক্ষোভ মিছিল থেকে পটিয়া থানায় হামলা ও ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। এ সময় পুলিশ থানার মূল ফটক বন্ধ করে দেয়। তবে কোনো ধরনের আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেনি। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (পটিয়া সার্কেল) তারিক রহমান বলেন, ‘হঠাত্ থানায় হামলা হয়েছে। থানার লাইট ভাঙচুর করেছে।’

বায়তুল মোকাররম এলাকা রণক্ষেত্র

ইত্তেফাকের বিশেষ প্রতিনিধি জানান, জুমার নামাজের পর বিক্ষোভকারীরা বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ গেট থেকে মিছিল শুরু করে। পরে পুলিশ তাদের ওপর রাবার বুলেট ও কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে এবং লাঠিচার্জ করে, এছাড়াও ব্যবহার করে জল কামান। মুসল্লিদের দমাতে পুলিশের সঙ্গে যোগ দেন আওয়ামী লীগের কর্মীরাও। ধাওয়া পাল্টার ধাওয়ার সময় বায়তুল মোকাররমের সামনে কয়েকটি মোটরসাইকেল পুড়িয়ে দেওয়া হয়। এ সময় বায়তুল মোকাররমের অভ্যন্তরে অবস্থান নেওয়া মুসল্লিদের হাতে লাঠি দেখা গেছে। তারা পুলিশকে উদ্দেশ্য করে জুতা, ইটপাটকেল ছুড়ে মারেন।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল পুলিশ ক্যাম্পের পরিদর্শক (ওসি) বাচ্চু মিয়া জানিয়েছেন, বায়তুল মোকাররমে সংঘর্ষের ঘটনায় ৪০ জন ঢামেকে চিকিত্সা নিয়েছেন। আহতদের মধ্যে সাংবাদিক, পথচারী, আওয়ামী লীগের কর্মী, মুসল্লি ও রিকশাচালক রয়েছেন। কয়েক জন ভর্তি রয়েছেন, তার মধ্যে দুই জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। ঢাকা মহানগর পুলিশের মতিঝিল বিভাগের উপকমিশনার সৈয়দ নুরুল ইসলাম জানিয়েছেন, সংঘর্ষের ঘটনায় কাউকে আটক করা হয়নি। বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। এদিকে বৃহস্পতিবার মতিঝিলে বিক্ষোভ মিছিলের সময় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের মামলায় ৩০ বিক্ষোভকারীকে রিমান্ডে পাঠিয়েছেন ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট বেগম ইয়াসমিন আরা।