একুশের বইমেলা মার্চ এপ্রিলে হয় কী করে

আপডেট : ২৮ মার্চ ২০২১, ২২:৪৩

বাংলা একাডেমি তার মূল কাজ বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের গবেষণা এবং প্রকাশনার দায়িত্বের বাইরে ফেব্রুয়ারি মাসব্যাপী ‘অমর একুশের গ্রন্থমেলার আয়োজন করে থাকে। এটা এখন আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে। বইমেলার আয়োজন করা বাংলা একাডেমির দায়িত্ব নয়, জেনেও আমরা এই বিশাল দায়িত্বটি বাংলা একাডেমির ওপরেই অর্পণে স্বস্তি বোধ করি। প্রতি বছরের এই আয়োজনে বাংলা একাডেমি মাসব্যাপী একটি সাংস্কৃতিক জাগরণ তৈরিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একুশের এই বইমেলাকে ঘিরেই বাংলা ভাষা-বাংলা সংস্কৃতির হাত ধরাধরি করে মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার চেতনায় নতুন করে উদ্দীপ্ত হয় বাঙালি। একুশের বইমেলা বাঙালির চেতনাকে শানিত করে। বাঙালির আত্মপরিচয়ের সংকট মোচনে বাংলা একাডেমির একুশের বইমেলার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। 

করোনার কারণে গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে পৃথিবী জুড়েই বিরাজ করছে অস্বাভাবিক অবস্থা। পৃথিবীর মানুষ ভীতসন্ত্রস্ত। কোভিড ১৯-এর ছোবলে পৃথিবী জুড়েই মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়েছে। করোনায় এ পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছেন প্রায় দেড় কোটি মানুষ। প্রাণ হারিয়েছেন লাখ লাখ মানুষ। 

অন্যান্য দেশের মতো আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোও বন্ধ। ক্লাস কিংবা পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছে অনলাইনে। মাস্ক ও সামাজিক দূরত্ব নামের দুটো বিষয় এখন প্রাত্যহিক জীবনের জরুরি এবং অবশ্যমান্য অংশ। এরকম পরিস্থিতিতে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে বইমেলার মতো একটি জনস্রোতের নিরাপদ আয়োজন কী করে সম্ভব? বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য অমর একুশে গ্রন্থমেলা ফেব্রুয়ারি মাসেই অনুষ্ঠিত হবে এবং সেটা হওয়াই ছিল যৌক্তিক। কিন্তু বিস্ময়কর ঘটনা—বাংলা একাডেমি এবার অমর একুশের গ্রন্থমেলাটির আয়োজন করল বা করতে বাধ্য হলো মার্চের ১৮ তারিখ থেকে! যা কিনা চলবে আগামী ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত! কী এমন ক্ষতি হতো মহামারিজনিত কারণে এক বছর বইমেলা না হলে? ফ্রাংকফুর্ট বইমেলাও তো অনুষ্ঠিত হয়নি! বন্ধ ছিল মুসলমানদের বৃহত্তম ধর্মীয় অনুষ্ঠান হজ-ও। পৃথিবীর সব উপাসনালয়ও তো বন্ধ রাখা হয়েছিল সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার নিমিত্তে। ফেব্রুয়ারির বইমেলা মার্চ-এপ্রিলে হলে সেটাকে কি ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা’ নামে আখ্যায়িত করা যায়, না করা উচিত? জাতির জনকের জন্মশতবর্ষ এবং স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষ্যে সীমিত পরিসরে বাংলা একাডেমি তার নিজস্ব ক্যাম্পাসে বিশেষ একটি বইমেলার আয়োজন করতেই পারত। এবং সেটার নাম হতে পারত ‘জাতির জনকের জন্মশতবর্ষ এবং স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষ্যে বাংলা একাডেমির বিশেষ বইমেলা’। কিন্তু সেটি না করে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান জুড়ে বিশাল পরিসরের একুশের গ্রন্থমেলার আয়োজন করে বাংলা একাডেমি কি তার এতদিনের সম্মান-মর্যাদা এবং ঐতিহ্য বজায় রাখতে পেরেছে? দুঃখজনক হলেও এর জবাব হচ্ছে—পারেনি। 

এবারের বইমেলায় না আছে ক্রেতা না আছে দর্শক! বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক সব ছাত্রাবাস বা ছাত্রীনিবাস বন্ধ। সুতরাং বইমেলা এখন বলতে গেলে জনশূন্য। বইমেলায় বই কিনতে আসে প্রধানত মধ্যবিত্ত শ্রেণিই। বিপদের সম্ভাবনা জেনে করোনা ঠেলে ছেলেমেয়েদের নিয়ে মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো কেন আসবেন বইমেলায়? 

প্রকাশক নেতারা কেন যে এরকম অবুঝ আচরণ করলেন! কেন যে তারা বইমেলা আয়োজনের পক্ষে অটল-অনড় থাকলেন! বইমেলায় এবার কিন্তু বরাবরের মতো শুক্র-শনিবারের শিশুপ্রহর নেই। বাংলা একাডেমির মূল মঞ্চে নেই কোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও। কেন নেই, সেটা বুঝতে বিদেশ থেকে ডিগ্রি অর্জন করা লাগে না। 

 চৈত্রের দাবদাহ এবং কালবোশাখির বিপুল ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কাকে হিসাবে না ধরে এরকম ভুল সময়ে বইমেলার আয়োজন করে বাংলা একাডেমি এবং সৃজনশীল পুস্তক প্রকাশক বিক্রেতা সমিতি যে ঠিক কাজটি করেনি, সেটা সময়ই বলে দেবে। আমরা বলে থাকি যে, একুশের বইমেলা আমাদের প্রাণের মেলা। প্রাণের মেলাটি প্রাণ সংহারের কারণ না হয়।

লেখক :ছড়াকার