হেফাজতে ইসলামের টানা তিন দিনের তাণ্ডবে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে অন্তত ৩০টি প্রতিষ্ঠানে হামলা-ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগ এবং ১০ জনের প্রাণহানির পর স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পরিবেশ। শহরে মানুষের উপস্থিতি বেড়েছে। হামলা ও সহিংসতার ঘটনা তদন্তে পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে গঠন করা হয়েছে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি।
সাত দিনের মধ্যে কমিটিকে রিপোর্ট দিতে বলা হয়েছে। আর হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় এ পর্যন্ত সাতটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এসব মামলায় আসামি করা হয়েছে ৭ হাজার জনকে। গ্রেফতার করা হয়েছে ১৪ জনকে।
হেফাজতের তাণ্ডবের ঘটনার সময় প্রশাসন ও পুলিশের ভূমিকা নিষ্ক্রিয় ছিল বলে অভিযোগ করেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি র আ ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী।
ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার ও চট্টগ্রাম রেঞ্জ ডিআইজির
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করেছেন চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার এ বি এম আজাদ এনডিসি এবং চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি মো. আনোয়ার হোসেন। সোমবার সকালে চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আনোয়ার হোসেন বলেন, প্রতিটি ঘটনার জন্যই মামলা হবে। তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। তিনি আরো জানান, বিষয়টি তদন্তের জন্য চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি জাকির হোসেনকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো
হেফাজতের তাণ্ডবে ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলস্টেশন, সুরসম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ সংগীতাঙ্গন, জেলা শিল্পকলা, আলাউদ্দিন খাঁ পৌর মিলনায়তন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রেসক্লাব, পৌরসভা কার্যালয়, শহিদ ধীরেন্দ্র নাথ দত্ত ভাষা চত্বরসহ বহু স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সাত মামলা দায়ের
হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে অজ্ঞাত ৬ হাজার ৫০০ জনকে আসামি করে তিনটি মামলা করেছে। এছাড়া ইউনিভার্সিটি অব ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হামলার ঘটনায় অজ্ঞাত ২৫০ জনকে আসামি করে মামলা করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার আহসান হাবীব। আনসার ও ভিডিপি অফিসে হামলার ঘটনায় আনসার ও ভিডিপির এক কর্মকর্তা অজ্ঞাত ৪৫০ থেকে ৫০০ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেছেন।
আশুগঞ্জ সৈয়দ নজরুল ইসলাম সেতুর ওপর টোল প্লাজা ও টোল প্লাজার পুলিশ ফাঁড়িতে হামলার ঘটনায় আশুগঞ্জ থানায় দুটি মামলা করা হয়েছে বলে আশুগঞ্জ থানার ওসি জাবেদ মাহমুদ জানিয়েছেন।
‘প্রশাসন ও পুলিশের ভূমিকা নিষ্ক্রিয় ছিল’
গত সোমবার দুপুরে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি র আ ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রেসক্লাবের সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে বলেন, হেফাজতের তাণ্ডবের ঘটনার সময় প্রশাসন ও পুলিশের ভূমিকা ছিল নিষ্ক্রিয়। তিনি আরো বলেন, ‘আমার জানাজার নামাজ তারা (হেফাজত) পড়াক আমি তা চাই না। আর কোনো মুসলমানের জানাজার নামাজ পড়াতে কোনো মৌলভি সাহেবের প্রয়োজন নাই। এইখানের মোল্লারা নাকি বলেছেন, ছাত্রলীগের জানাজা নাকি পড়াবেন না। এখানে ছাত্রলীগের যারা আছে, তাদের ঘাবড়ানোর কিছু নাই। আমরা হেফাজতের কাছে যাব না, হেফাজতের লোকেরা আমাদের কাছে আসে।’ তিনি বলেন, ‘অনেকে আমাকে দোষারোপ করার চেষ্টা করছেন। নিজেদের অপারগতা-ব্যর্থতা ঢাকতে তারা এখন আমার ঘাড়ে দোষ চাপানোর চেষ্টা করছেন। আমি কোনো উসকানিমূলক কথা বলিনি।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমি ৭০ বছরের জীবনে বহু হরতাল দেখেছি। কিন্তু কোনো রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের বাড়িতে হামলা হতে দেখিনি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিষ্ক্রিয় ছিল সেদিন। সদর থানা থেকে মাইকিং করে হেফাজতের উদ্দেশে বলেছে, আমাদের ওপর হামলা চালাবেন না। আমরা আমাদের কাজ করছি, আপনারা আপনাদের কাজ করুন।’
সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় বিক্ষোভ
হেফাজতে ইসলামের হরতাল চলাকালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রেস ক্লাবে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর এবং ক্লাবের সভাপতিসহ সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রেস ক্লাবের উদ্যোগে এ কর্মসূচি পালিত হয়। এ কর্মসূচি থেকে হেফাজতে ইসলাম ও এর সহযোগী সব ধর্মীয় সংগঠনের সংবাদ বর্জনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ব্রাহ্মণবাড়িয়া জুড়ে চলা তাণ্ডবের ঘটনায় বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সংবাদিকেরা।
