বইমেলায় যথাযথভাবে স্বাস্থ্যবিধি মানার প্রয়োজনে যা যা করণীয় আমরা তা করেছি —হাসানাত লোকমান

আপডেট : ০১ এপ্রিল ২০২১, ২০:৪০

কবি হাসানাত লোকমান বাংলা একাডেমির সচিবের দায়িত্ব পালন করছেন ২০২০ সাল থেকে। করোনাজনিত দুর্যোগের কারণে এবারের একুশে গ্রন্থমেলা ফেব্রুয়ারিতে আয়োজন করা সম্ভব হয়নি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীকে সামনে রেখে এবারের বইমেলা শুরু হয়েছে ১৮ মার্চ থেকে। এসব প্রসঙ্গ নিয়ে কবি হাসানাত লোকমানের সঙ্গে কথা বলেছেন তরুণ কবি বোরহান মাসুদ

এ বছরের একুশে গ্রন্থমেলা শুরু হয়েছে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী মার্চ মাসে। এবারের মেলায় নতুন কী যোগ হয়েছে?

হাসানাত লোকমান : ধন্যবাদ আপনাকে। এবারের বইমেলার আয়োজন আমাদের জন্য কঠিন বাস্তবতাকে পরাভূত করে বাঙালির অজেয় মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ। একুশের চেতনাকে ধারণ করে স্বাধীনতার মাসে বইমেলার আয়োজন—এটি একটি নতুন অধ্যায়। এবারের মেলার আঙ্গিক ও সাজসজ্জায় ভাষা আন্দোলন ও স্বাধীনতার ভাবগাম্ভীর্য মূর্ত হয়ে উঠেছে। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে বিশেষ চিত্রপ্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের স্বাধীনতা স্তম্ভ ও লেকে নান্দনিক আলোকসজ্জা করা হয়েছে।

প্রকাশক ও বইপ্রেমীদের দীর্ঘদিনের দাবি পূরণ হয়েছে। রয়েছে ব্যক্তিগত গাড়ি রাখার সুবিধা। নতুনভাবে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট সংলগ্ন-গেট মেলায় আগতদের আসা-যাওয়ার জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে।

মার্চ-এপ্রিল মাস বাংলাদেশের জন্য ঝড়-বৃষ্টির মৌসুম। এজন্য আমরা মেলার স্টলগুলোর কাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে দুর্যোগ সহনশীলতাকে গুরুত্ব দিয়েছি। এছাড়া প্রাকৃতিক বিপর্যয়কালীন মেলায় আগতদের সুবিধার্থে তিনটি অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র তৈরি করা হয়েছে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে।

 

বাংলা একাডেমি এবার জাতির পিতার জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে অনেক বই প্রকাশ করছে বলে জানি। কী ধরনের বই বের হয়েছে?

হা. লো. : বাংলা একাডেমি দীর্ঘদিনে প্রায় সাত হাজার শিরোনামের বই প্রকাশ করেছে। এসবের মধ্যে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আমার দেখা নয়াচীন, New China 1952, কারাগারের রোজনামচা, Prison Diaries অন্যতম।

বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে ১০০ বই প্রকাশের ঘোষণা অনুযায়ী একাডেমি ইতোমধ্যে ২৮টি বিশেষ গ্রন্থ প্রকাশ করেছে। বঙ্গবন্ধুর বীরগাথা, বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ : বহুমাত্রিক বিশ্লেষণ, বঙ্গবন্ধু নানা বর্ণে নানা রেখায়, বঙ্গবন্ধু ও চলচ্চিত্র, ডাকটিকিট ও মুদ্রায় বঙ্গবন্ধু, বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় বিপ্লব : কী ও কেন, রাজনীতিতে হাতেখড়ি ও কলকাতায় শেখ মুজিব, বঙ্গবন্ধুর আন্দোলন কৌশল ও হরতাল, বঙ্গবন্ধু ও ভাষা আন্দোলন, বঙ্গবন্ধু গণপরিষদ সংবিধান, বঙ্গবন্ধুর সমবায় ভাবনা, মুক্তিযুদ্ধ বঙ্গবন্ধু ও বাংলা একাডেমি, বঙ্গবন্ধুকে নিবেদিত কবিতা, বঙ্গবন্ধুকে নিবেদিত ছড়া ইত্যাদি বিশেষভাবে উল্লেখ করা যায়।

 

বর্তমানে করোনা সংক্রমণের হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে। এ অবস্থায় মেলায় করোনা ঝুঁকি এড়াতে কী কী পদক্ষেপ নিয়েছেন?

হা. লো. মেলা আয়োজনে করোনার ঝুঁকি ও প্রতিকূল প্রভাবের বিষয়টি সর্বাধিক গুরুত্ব পেয়েছে। করোনা ঝুঁকি এড়াতে প্রথম পদক্ষেপ যদি বলি, তা হলো আমাদের এবারের মেলার নকশা ও আঙ্গিক। বড়ো পরিসর, সুপ্রশস্থ রাস্তা, খোলামেলা পরিবেশ কিছুটা হলেও মেলায় আগতদের স্বস্তি দিচ্ছে। তবে এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড়ো পদক্ষেপ হচ্ছে—ব্যক্তিসচেতনতা ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার মানসিকতা। আমরা মেলার প্রবেশপথগুলোতে অটোমেটিক তাপমাত্রা পরিমাপক যন্ত্র বসিয়েছি, হাত জীবাণুমুক্ত করার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা রয়েছে। বই বিক্রয়-কর্মীরা স্বাস্থ্যবিধি মেনে সেবা প্রদান করছেন। মেলায় যথাযথভাবে স্বাস্থ্যবিধি মানার প্রয়োজনে যা যা করণীয় আমরা তা করেছি। করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকারি সকল উদ্যোগ বাস্তবায়নে বাংলা একাডেমি সচেষ্ট রয়েছে। যেহেতু বইমেলা আয়োজনের বিষয়টি বাংলা একাডেমির একক সিদ্ধান্তে হয়নি, সেহেতু এ বইমেলা সংক্রান্ত যেকোনো সিদ্ধান্ত মেলা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে চূড়ান্ত হবে। বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় বাংলা একাডেমি মেলার সময়সীমা পরিবর্তন করেছে। এখন মেলা চলছে বিকেল তিনটা থেকে সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত। কঠোরভাবে স্বাস্থ্যবিধি বিষয়ে সরকারি নির্দেশনাবলি পালন করা হচ্ছে। বইমেলার চিরায়ত ঐতিহ্য প্রতিদিনের সেমিনার কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে।

 

স্বাধীনতার ৫০ বছর উপলক্ষে বাংলা একাডেমির প্রকাশনায় বিশেষ কোনো গ্রন্থ অথবা স্মারক প্রকাশনা থাকছে?

হা. লো. : স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে বাংলা একাডেমি প্রথিতযশা লেখকদের অংশগ্রহণে একটি স্মারকগ্রন্থ প্রকাশের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।

বইমেলা ছাড়াও বাংলা একাডেমির একটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি হচ্ছে প্রকাশনা, বই প্রকাশের ক্ষেত্রে তরুণ লেখকদের নিয়ে কি একাডেমির কোনো পরিকল্পনা আছে?

হা. লো. : বই প্রকাশের ক্ষেত্রে একাডেমির মানদণ্ড বয়স নয়, মানদণ্ড হচ্ছে ভালো মানের পাণ্ডুলিপি। সেক্ষেত্রে তরুণরাও যদি তাদের রচিত পাণ্ডুলিপি একাডেমিতে প্রকাশের জন্য জমা দেয় তা একাডেমির প্রাজ্ঞজনদের নিরপেক্ষ মূল্যায়নে প্রকাশযোগ্য হলে অবশ্যই প্রকাশের উদ্যোগ গ্রহণ করে থাকে। আর তরুণ লেখকদের বিষয়ে বিশেষভাবে বলতে গেলে বলব, একাডেমি ১৯৯৫—২০১২ সাল পর্যন্ত কয়েক ধাপে তরুণ লেখক প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। আগামীতেও এ ধরনের সময়োপযোগী উদ্যোগ গ্রহণ করতে একাডেমি প্রয়াস পাবে। এ প্রকল্প থেকে গড়ে ওঠা অনেক লেখক আজ দেশের প্রতিষ্ঠিত লেখকদের সারিতে নিজেদের দাঁড় করিয়েছে। তাদের বই বাংলা একাডেমি প্রকাশ করেছে এবং ভবিষ্যতেও করবে।

 

বাংলা ভাষা আন্তর্জাতিকভাবে একটা বিশেষ মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত। বিশ্বসাহিত্যের অঙ্গনে বাংলা সাহিত্যের অবস্থান কতটুকু জোরালো? বাংলা সাহিত্যকে ভিন্ন ভাষার পাঠকদের কাছে পৌঁছে দিতে একাডেমি কী ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে?

হা. লো. : বিশ্ব সাহিত্যাঙ্গনে বাংলা সাহিত্যের একটি অবস্থান তৈরিতে প্রণিধানযোগ্য ভূমিকা রেখেছেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, কবি কাজী নজরুল ইসলামসহ আরো অনেক স্বনামধন্য লেখক। বাংলা একাডেমি প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে অনুবাদ সাহিত্যের মাধ্যমে সে ধারাকে অব্যাহত রেখেছে। একাডেমি বিভিন্ন সময়ে ইংরেজি, ফরাসিসহ বিভিন্ন ভাষায় মৌলিক ও অনুবাদ গ্রন্থ প্রকাশ করেছে এবং করছে। বাংলা একাডেমি সাম্প্রতিককালে অনুবাদক সৃষ্টির লক্ষ্যে একটি প্রকল্প গ্রহণ করেছে। যা বাংলা ভাষা ও সাহত্যিকে উত্তরোত্তর বিশ্ববাসীর কাছে সমাদৃত ও সুপরিচিত করে তুলবে।

 

বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বিকাশে বাংলা একাডেমির ভবিষ্যত্ পরিকল্পনা কী?

হা. লো. : আপনি জানেন যে, বাংলা একাডেমি ১৯৫৫ সালে প্রতিষ্ঠা পেয়ে অদ্যাবধি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বিকাশে আন্তরিকতা, দায়িত্বশীলতা ও দায়বদ্ধতার সাথে নিরন্তর কাজ করে চলছে। একাডেমি দেশবরেণ্য কবি-সাহিত্যিকদের তাঁদের সৃজনশীল সৃষ্টির স্বীকৃতিস্বরূপ এবং তাঁদেরকে প্রণোদিত করার অভিপ্রায়ে বিভিন্ন শিরোনামে গৌরব ও সম্মানজনক সাহিত্য পুরস্কার প্রদান করে থাকে। একাডেমির নিত্যনৈমিত্তিক কার্যাবলির মধ্যেই বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রাগ্রসরতা দিনদিন দীপ্যমান হয়ে থাকবে বলেই আমার প্রতীতি।