ঢাকা চেম্বারের ওয়েবিনার
ইত্তেফাক রিপোর্ট
বাংলাদেশে বাণিজ্য বিষয়ক বিরোধ নিষ্পত্তিতে সাধারণত প্রায় চার বছর সময় লেগে যায়। পৃথিবীর অনেক দেশ বাণিজ্য বিষয়ক আইনি প্রক্রিয়ার এ ধরনের দীর্ঘসূত্রতা হ্রাস করেছে। সংশ্লিষ্ট আইনের যথাযথ প্রয়োগ, কোর্ট কার্যক্রমের অটোমেশন, ইলেকট্রনিক পেমেন্ট সিস্টেমের প্রবর্তন, বিশেষায়িত বাণিজ্যিক কোর্ট চালুকরণ এবং এডিআর কার্যক্রমের সম্প্রসারণের ওপর জোর দিয়ে তারা বিরোধ নিষ্পত্তি কার্যক্রম দ্রুততর করেছে। ব্যবসা প্রতিযোগিতার সক্ষমতার সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান উন্নয়নে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন জাতীয় স্টিয়ারিং কমিটি গঠনের প্রস্তাব করেছেন ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) সভাপতি রিজওয়ান রাহমান।
ঢাকা চেম্বার আয়োজিত ‘বাংলাদেশের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা : ব্যবসা পরিচালন সূচকে অন্যতম অনুষঙ্গ’ শীর্ষক ওয়েবিনার গতকাল শনিবার অনুষ্ঠিত হয়। ওয়েবিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ বিষয়ক উপদেষ্টা সালমান ফজলুর রহমান এমপি। বিশেষ অতিথি ছিলেন আইন ও বিচার বিভাগের সচিব মো. গোলাম সারওয়ার। ওয়েবিনারের স্বাগত বক্তব্যে ডিসিসিআই সভাপতি বাণিজ্য বিরোধ নিষ্পত্তিতে আরো অধিক হারে এডিআর ব্যবহারকে উত্সাহিত করার আহ্বান জানান।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে সালমান ফজলুর রহমান এমপি বলেন, আমাদের জিডিপিতে করের অবদান খুবই কম এবং যত বেশি করের আওতা বাড়ানো যাবে ততই করের হার কমানো সম্ভব হবে এবং এটি আমাদের ব্যবসা পরিচালনা ব্যয় হ্রাসে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। তিনি জানান, গত অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) প্রায় ৫৫ হাজার নতুন করদাতাকে করের আওতায় নিয়ে আসতে পেরেছে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের সব বন্দরের সক্ষমতা বেড়েছে, তবে এ ক্ষেত্রে আরো উন্নয়নের জন্য আমাদের চেষ্টা অব্যাহত থাকবে। সরকার গৃহীত বৃহত্ অবকাঠামো প্রকল্প যেমন: বে-টার্মিনাল, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, কক্সবাজার দ্বিতীয় বৃহত্তম এয়ারপোর্ট, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেল যোগাযোগসহ পদ্মা সেতুর মতো বৃহত্ প্রকল্পসমূহের কাজ সম্পন্ন হলে আমাদের অর্থনীতিকে যুগান্তকারী পরিবর্তন পরিলক্ষিত হবে। তিনি মামলা পরিচালনার দীর্ঘসূত্রতা নিরসনকল্পে ‘মামলার সময় ব্যবস্থাপনা’ উন্নয়নের প্রতি জোরারোপ করেন।
মো. গোলাম সারওয়ার জানান, বাণিজ্য বিরোধ বিষয়ক মামলা পরিচালনায় ই-জুডিশিয়ারি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে যার আওতায় ই-ফাইলিং, প্রমাণাদি সংরক্ষণে ডিজিটাল ব্যবস্থার প্রবর্তন করা হবে, ফলে এ ধরনের বিরোধ দ্রুততম সময়ে নিষ্পত্তি করা সম্ভব হবে। তিনি আরো বলেন, বিদ্যমান দেউলিয়াত্ব আইন-১৯৯৭ সংশোধনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। বাণিজ্য বিরোধ নিষ্পত্তি সহজতর করার জন্য সরকার ঢাকা ও চট্টগ্রামে ‘কমার্শিয়াল কোর্ট’ ও কমার্শিয়াল এপিলেট কোর্ট স্থাপনের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।
ওয়েবিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সাত্তার অ্যান্ড কোম্পানির প্রধান মো. সামির সাত্তার। তিনি বলেন, কোম্পানিগুলোর বাণিজ্য বিরোধ নিষ্পত্তির সময়সীমা কমানোর লক্ষ্যে ‘সিভিল প্রসিডিউর কোড (সিপিসি)’-এর সংস্কার একান্ত জরুরি, সেই সঙ্গে মামলার ক্ষেত্রে ই-ফাইলিং প্রক্রিয়া ও কোর্ট ফি প্রদানের ক্ষেত্রে ই-পেমেন্ট ব্যবস্থার প্রবর্তন, ইলেকট্রনিক কেইস ম্যানেজমেন্ট প্রভৃতি চালু করা যেতে পারে। তিনি আরো বলেন, ব্যবসা পরিচালন সূচক-এ দেউলিয়ার বিরোধ নিষ্পত্তির বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, সে লক্ষ্যে একটি রেগুলেটরি ফ্রেমওয়ার্ক গঠনের প্রস্তাব করেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ফরেন এক্সচেঞ্জ ইনভেস্টমেন্ট বিভাগের মহাব্যবস্থাপক জগন্নাথ চন্দ্র ঘোষ, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) পরিচালক জীবন কৃষ্ণ সাহা রয়, জেট্রো বাংলাদেশের প্রতিনিধি কাজিমুরি ইয়ামাডা, প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের চেয়ারম্যান এবং সিইও আহসান খান চৌধুরী এবং ওরিক্স বায়ো-টেক লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডেভিড বাও ওয়েবিনারে নির্ধারিত আলোচক হিসেবে যোগদান করেন। তারা বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক এরই মধ্যে বেশ কিছু সংস্কার কার্যক্রম গ্রহণ করেছে, যার মধ্যে বিদেশি কোম্পানিগুলোর মুনাফা নিজদেশে নিয়ে যাওয়ার অনুমোদন, বাংলাদেশে ইন্টারন্যাশনাল ফ্যাক্টরিংয়ের কার্যক্রম চালুকরণ প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। আলোচকবৃন্দ ভ্যাট ব্যবস্থাপনা, বন্দরগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি ও কাস্টমস ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন, বন্ড প্রবর্তন প্রভৃতি বিষয়ের ওপর জোরারোপ করেন। পাশাপাশি বাণিজ্য বিষয়ক আইনসমূহের প্রয়োজনীয় সংস্কার, স্থলবন্দরগুলোতে সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি এবং ব্যাংক পরিষেবা বাড়ানোর প্রস্তাব করেন।
মুক্ত আলোচনায় চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান আসিফ ইব্রাহীম বলেন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয় ও সংস্থাসমূহের সমন্বয় খুবই জরুরি। তিনি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে উত্পাদনশীল খাতে ব্যবহারের তাগিদ দেন। বিল্ড-এর চেয়ারপারসন আবুল কাসেম খান বলেন, বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ বিষয়ক আইনি সংস্কার কার্যক্রম দ্রুততার সঙ্গে শেষ করতে না পারলে আমরা বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ব। তিনি বিদ্যমান কর এবং অডিট নীতিমালা যুগোপযোগী করার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে দ্রুত এসইজেড নীতিমালা প্রণয়নের ওপর জোরারোপ করেন।
