‘পথচলা শুধু নিজের পরিচয় সৃষ্টির জন্য নয়’

আপডেট : ০৪ এপ্রিল ২০২১, ১৯:৫১

  মহিলা অঙ্গন প্রতিবেদক

 

কামরুন নাহার সানজিদা। স্বত্বাধিকারী ‘পিদিম হাউজ’। আদিবাসী ঘরানার পণ্য নিয়ে কাজ করছেন। এই পথচলা শুধু নিজের পরিচয় সৃষ্টির জন্য নয়। এই পথচলা নিজের পাশাপাশি ছোট দুই ভাইকেও একসময় শক্ত অবস্থানে দাঁড় করানো। যারা বলেন, বাবা-ভাইয়ের সাহায্যে ঐ মেয়ে আজ প্রতিষ্ঠিত, তাদেরকে দেখিয়ে দেওয়া—চাইলে মেয়েরাও তাদের ভাইদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারে। কথা প্রসঙ্গে বলছিলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে তখন আমি তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী। এ সময়ে এমন এক বন্ধু পেলাম, যার বাড়ি ছিল রাঙ্গামাটি। প্রথমবারই রাঙ্গামাটি গিয়ে মুগ্ধ হয়ে যাই। সেই থেকে শুরু, এর মধ্যে শতবার যাওয়া হয়েছে রাঙ্গামাটিতে। সেখানে সাধারণ পর্যটকদের মতো ঘোরা হয়নি আমার। থেকে থেকে ঘুরেছি। প্রতিটি সৌন্দর্য উপভোগ করেছি। ফলে যা হওয়ার, তা-ই হলো। প্রেমে পড়ে গেলাম প্রকৃতির রানি রাঙ্গামাটির। সেই প্রেম থেকে আদিবাসী ঘরানার পণ্য নিয়ে আজ উদ্যোক্তা।

সানজিদা বলেন, আমার প্রথম উদ্যোগটা ছিল পাঁচ বছর আগে। চাকমা তরুণীদের ট্র্যাডিশনাল পোশাক পিনন-হাদির ডিজাইনে তৈরি পিনন শাড়ি নিয়ে শুরু করি আমার উদ্যোক্তা জীবন। পিনন-হাদি ছিল আমার খুব পছন্দের একটি পোশাক। কিন্তু চাইলেও সব অনুষ্ঠানে তা পরে যাওয়ার মতো ছিল না। তাই বাঙালি তরুণীদের পরার উপযোগী করে তৈরি এই শাড়ি নিয়েই শুরু করি। কোথাও গেলেই জিগ্যেস করত—কি রে, তোর ব্যবসা কেমন চলে?

ভালোই চলছিল। তবে এর মধ্যেই তা হঠাত্ বন্ধ করে দিতে বাধ্য হই। কারণ, তখনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী হলেও পুরোদমে সাংবাদিকতা পেশায় ব্যস্ত ছিলাম আমি। পার্টটাইম চাকরি, পড়াশোনার পাশাপাশি ব্যবসা পরিচালনা খুব একটা সহজ ছিল না। তাই বছর পরেই আবার মনোযোগ দিই আমার পুরোনো জীবনে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ দিকে জীবনে নতুন মোড় আসে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি আমার বাবা সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান। হঠাত্ তার চলে যাওয়া যতটা না শোকের, তার  চেয়ে বেশি ছিল উদ্বেগের। কারণ, তখনো আমি পার্টটাইমার এবং ছাত্রী। ভাই দুটোও ছোট। পরিবার কীভাবে এগিয়ে চলবে তা নিয়ে সবাই উদ্বিগ্ন ছিল। তাই বলে সমাধান আসেনি পরিবারে। কী করে এর পরের দিনগুলো পার হবে, খরচ কী করে চলবে, সেই চিন্তা থেকে আবারও মনে পড়ে আমার ফেলে আসা উদ্যোক্তা জীবনকে।

তাই আবার কাজ শুরু করি পিনন শাড়ি নিয়ে। সঙ্গে সঙ্গেই বুঝতে পারি, গুণীর কদর যেমন অন্য গুণী বোঝেন, ঠিক তেমনি দেশীয় ঐতিহ্যের সমঝদাররাও আদিবাসী সংস্কৃতিকে সম্মান করেন। এমনই একজন সমঝদারের চাহিদা জেনে তাই একদিন হুট করে সবচেয়ে দামি পিনন শাড়িটিও বুনতে দিই তাঁতিকে। পাশাপাশি চলতে থাকে আমার সিগনেচার আইটেম ‘পয়সা গহনা’। এ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি অর্ডার পেয়েছি শুধু এ গহনারই। এতকিছুর পরও স্বপ্ন দেখি জামদানি, মণিপুরি, টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ির পর একসময় দেশীয় এই ‘পিনন শাড়ি’ও বাংলাদেশের সবার কাছে পরিচিতি পাবে। আলমারিতে দামি জামদানি, মণিপুরির সঙ্গে সযতনে থাকবে একটি পিনন শাড়িও। আদিবাসীদের ধরে রাখা সহস্র বছরের দেশীয় ঐতিহ্যকে সম্মান করবে প্রতিটি বাঙালি।