স্বস্তির মধ্যে অস্বস্তির খবর

আপডেট : ০৪ এপ্রিল ২০২১, ২২:২৯

সৌদি আরব কর্তৃপক্ষ প্রায় ৭০ বছর ধরে চলা কাফালা পদ্ধতি বাতিল করেছে। ফলে সৌদি আরবে প্রবাসী শ্রমিকদের মানবাধিকার অনেকটাই নিশ্চিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এখন থেকে যারা সৌদি আরবে কাজ করার জন্য গমন করবেন তাদের কোনো কফিলের নিয়ন্ত্রণে থাকতে হবে না। উল্লেখ্য, কাফালা হচ্ছে একধরনের স্পনসরশিপ। যারা সৌদি আরবে কাজ করার জন্য গমন করেন তাদের নির্দিষ্ট ব্যক্তির অধীনে থাকতে হয়। তারা ভালো কোনো চাকরির প্রস্তাব পেলেও কফিলের অনুমতি ছাড়া তা গ্রহণ করতে পারেন না।

কাফালা বাতিলের খবরে সৌদি প্রবাসী বাংলাদেশিরা সবচেয়ে বেশি খুশি হয়েছিলেন। কিন্তু মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে সৌদি প্রবাসী বাংলাদেশিদের আনন্দ কর্পূরের মতো উবে গেছে। জানা গেছে, আগামী জুন মাস থেকে সৌদি আরবে অদক্ষ ও অপ্রশিক্ষিত শ্রমিক নিয়োগ বন্ধ করে দেওয়া হবে। বর্তমানে যারা দেশটিতে কর্মরত আছেন তাদের দক্ষতা উন্নয়ন ও নিশ্চিতকরণ পরীক্ষা দিতে হবে। যারা এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারবেন শুধু তারাই সেখানে কাজ করার সুযোগ পাবেন। যারা দক্ষতা উন্নয়ন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারবেন না, তাদের সেদেশে কাজ করার কোনো সুযোগ দেওয়া হবে না। কিন্তু যারা এই পরীক্ষায় ব্যর্থ হবেন তাদের সেদেশে কাজ করার সুযোগ না দিয়ে নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হবে। সৌদি আরব তাদের দেশে কাজ করার জন্য একমাত্র দক্ষ লোকদেরই সুযোগ দেবে। দক্ষতা উন্নয়ন পরীক্ষা হবে আরবি, হিন্দি, ইংরেজি, ফিলিস্তিনি ভাষাসহ ছয়টি ভাষায়। দক্ষতা উন্নয়ন পরীক্ষা নেওয়ার একটি উদ্দেশ্য হলো সৌদি নাগরিকদের সেদেশের শ্রম বাজারে বেশি করে যুক্ত হওয়ার সুযোগ দেওয়া। সৌদি আরব দক্ষতা উন্নয়নের জন্য যে পরীক্ষা গ্রহণ প্রথা অনুসরণ করার উদ্যোগ নিয়েছে তাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন বাংলাদেশি শ্রমিকরা। বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানির সবচেয়ে বড় গন্তব্য হচ্ছে সৌদি আরব। সৌদি আরবে বর্তমানে প্রায় ১ কোটি বিদেশির কর্মসংস্থান রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৩৯ লাখ বাংলাদেশি। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে বাংলাদেশ থেকে যারা সৌদি আরব বা অন্যান্য দেশে গমন করেন, তাদের বেশির ভাগই অশিক্ষিত এবং অদক্ষ শ্রমিক। বাংলাদেশ থেকে সৌদি আরবে পেশাজীবী এবং দক্ষ জনশক্তি রপ্তানির হার খুবই কম। বিশেষ করে, যারা সৌদি আরবে গমন করেন তারা মাতৃভাষা ছাড়া অন্য কোনো ভাষায় দক্ষতা থাকে না। ফলে তারা সৌদি আরবে গিয়ে সমস্যায় পড়েন। ভারত ও পাকিস্তানের লোকজন সৌদি আরবে গিয়ে বাংলাদেশিদের তুলনায় বেশি সুযোগ-সুবিধা পান।

এই অবস্থায় সৌদি শ্রমবাজার হারানোর শঙ্কা অত্যন্ত প্রকট হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্ব জনশক্তি রপ্তানির ক্ষেত্রে শীর্ষ ১০টি দেশের অন্যতম। বাংলাদেশ প্রতি বছর যে বিপুলসংখ্যক জনশক্তি রপ্তানি করে তার মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের ছয়টি মুসলিম দেশে সবচেয়ে বেশি জনশক্তি রপ্তানি করে। এমনকি বাংলাদেশ থেকে যে মহিলা জনশক্তি রপ্তানি করা হয় তার ৩৮ শতাংশেরও বেশি যায় সৌদি আরবে। অর্থনীতিবিদ এবং জনশক্তি রপ্তানি বিশেষজ্ঞগণ অনেক দিন ধরেই প্রশিক্ষিত জনশক্তি এবং পেশাজীবীদের বিদেশে পাঠানোর প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছিলেন। কিন্তু বিষয়টি কর্তৃপক্ষীয় পর্যায়ে তেমন কোনো গুরুত্ব পায়নি। আর জনশক্তি রপ্তানির মতো গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক খাতটি কার্যত বেসরকারি উদ্যোগে পরিচালিত হয়। ফলে খাতটি নানাভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। একশ্রেণির অর্থলোভী মানুষ বিদেশে জনশক্তি রপ্তানির নামে কর্মীদের সঙ্গে প্রতারণা করে থাকেন। এছাড়া অদক্ষ মানুষকেও ভুয়া সার্টিফিকেট দিয়ে বিদেশে পাঠিয়ে থাকে। ফলে বিদেশে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। আগামী দিনে সৌদি আরবের মতো অন্যান্য দেশও দক্ষ এবং প্রশিক্ষিত কর্মী ছাড়া তাদের দেশে কাজ করার সুযোগ নাও দিতে পারে। সেই অবস্থায় জনশক্তি রপ্তানি খাতের স্বাভাবিক অবস্থা বজায় রাখার জন্য অত্যন্ত জরুরি ভিত্তিতে বিদেশ গমনেচ্ছুদের জন্য বিদেশি ভাষা শিক্ষাসহ দক্ষতা উন্নয়নের জন্য কারিগরি প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বৃদ্ধি করার ওপর জোর দিতে হবে।       

উল্লেখ্য, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসী বাংলাদেশিরা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন। বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের ক্ষেত্রে এখনো পণ্য রপ্তানি খাত প্রথম স্থানে রয়েছে। তবে পণ্য রপ্তানি খাত থেকে যে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয় তার মধ্যে ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশই আবার কাঁচামাল ও ক্যাপিটাল মেশিনারিজ আমদানিতে চলে যায়। রেমিট্যান্স বৈদেশিক মুদ্রা আহরণের ক্ষেত্রে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। তবে জাতীয় অর্থনীতিতে মূল্য সংযোজনের ক্ষেত্রে জনশক্তি রপ্তানি খাতের অবদান তুলনামূলকভাবে বেশি। এ খাতের জন্য কোনো কাঁচামাল এবং মেশিনারিজ আমদানি করতে হয় না। ফলে অর্জিত অর্থের প্রায় শতভাগ জাতীয় অর্থনীতিতে মূল্য সংযোজন করে। এছাড়া বেকার সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে এই খাতের অবদান গুরুত্বপূর্ণ। গত অর্থবছরেও বাংলাদেশ জনশক্তি রপ্তানি খাত থেকে ১৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি অর্থ আয় করেছে। জনশক্তি রপ্তানি খাত বাংলাদেশি শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।

চলতি অর্থবছরে দেশের অর্থনীতির প্রতিটি সেক্টর ক্ষতিগ্রস্ত হলেও জনশক্তি রপ্তানি খাতের আয় বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। অর্থনীতিবিদগণ মনে করেন, মূলত কয়েকটি বিশেষ কারণে প্রবাসী আয়ে উচ্চ প্রবৃদ্ধি অব্যাহত আছে। চলতি অর্থবছর থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রবাসী আয়ের ওপর ২ শতাংশ নগদ প্রণোদনা দিচ্ছে। এই প্রণোদনার কারণে অনেকেই এখন আর হুন্ডির মাধ্যমে রেমিট্যান্স প্রেরণ করছেন না। এছাড়া করোনার কারণে হুন্ডি ব্যবসায়ীদের কার্যক্রম অনেকটাই স্থিমিত রয়ে পড়েছে। প্রবাসী বাংলাদেশিদের অনেকেই কর্মচ্যুত হয়েছেন। তারা দেশে প্রত্যাবর্তনের সময় স্থানীয়ভাবে সঞ্চিত পুরো অর্থ একযোগে দেশে নিয়ে আসছেন। একই সঙ্গে করোনার কারণে স্থানীয় সুবিধাভোগীদের অর্থের চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে তারা আগের তুলনায় বেশি অর্থ দেশে প্রেরণ করছেন।

বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানি কার্যক্রম মূলত সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের ছয়টি মুসলিম দেশকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। সীমিতসংখ্যক দেশের ওপর এভাবে অতিমাত্রায় নির্ভরতা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। এছাড়া জনশক্তি রপ্তারি ক্ষেত্রে পেশাজীবী এবং ট্রেডভিত্তিক দক্ষ শ্রমিকদের প্রাধান্য দেওয়া প্রয়োজন। রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর প্রতারণা বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। কোনোভাবেই তারা যেন অদক্ষ শ্রমিকদের দক্ষতার সার্টিফিকেট দিয়ে বিদেশে পাঠাতে না পারে তা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে জনশক্তি রপ্তানির সম্ভাবনাময় নতুন নতুন গন্তব্য খুঁজে বের করতে হবে।

n লেখক : অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংক কর্মকর্তা