জর্ডানের সাবেক যুবরাজ প্রিন্স হামজা বিন হুসেইন এক ভিডিও বার্তায় জানিয়েছেন, তাকে গৃহবন্দি করে রাখা হয়েছে এবং এটা দেশের বর্তমান নেতাদের সমালোচকদের ওপর এক ক্র্যাকডাউনের অংশ। প্রিন্স হামজা হচ্ছেন জর্ডানের বাদশাহ আবদুল্লাহর সত্-ভাই। তাকে ছাড়া আরো ২০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে। প্রিন্স এবং গ্রেফতারকৃতরা বাদশাহকে ক্ষমতাচ্যুতের ষড়যন্ত্রের চেষ্টা করেছিলেন বলে সেনাবাহিনীর একটি সূত্র জানিয়েছে। খবর বিবিসি ও আলজাজিরার
জর্ডানে সম্প্রতি উচ্চপর্যায়ের বেশ কিছু লোককে গ্রেফতার করা হয় যা একটি কথিত অভ্যুত্থানপ্রচেষ্টার সঙ্গে সম্পর্কিত বলে বলা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী পত্রিকা ওয়াশিংটন পোস্ট মধ্যপ্রাচ্যের গোয়েন্দা সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, আরো অন্তত ২০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে তারা বাদশাহকে ক্ষমতাচ্যুত করার ষড়যন্ত্র করছিলেন।
জর্ডানের সামরিক বাহিনী এর আগে প্রিন্স হামজাকে গৃহবন্দি করার কথা অস্বীকার করেছিল। তবে তারা বলেছে, জর্ডানের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা ক্ষুণ্ন হতে পারে এমন কিছু কার্যকলাপ বন্ধ করার জন্য প্রিন্স হামজাকে আদেশ দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি প্রিন্স হামজা কিছু উপজাতীয় নেতার সঙ্গে দেখা করেছিলেন যাদের মধ্যে থেকে তিনি কিছু সমর্থন পেয়েছেন বলে জানা গেছে। প্রিন্স অবশ্য এ ধরনের অন্যায় করার কথা অস্বীকার করে বলেছেন, তিনি কোনো ষড়যন্ত্রের অংশ ছিলেন না।
এর মধ্যে মিশর ও সৌদি আরবের মতো আরব বিশ্বের আঞ্চলিক শক্তিগুলো বাদশাহ আবদুল্লাহর প্রতি সমর্থন প্রকাশ করেছে। যুক্তরাষ্ট্র বাদশাহ আবদুল্লাহকে এক জন গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বর্ণনা করে তার প্রতি তাদের পূর্ণ সমর্থন প্রকাশ করেছে। সেনাবাহিনী সূত্র জানিয়েছে, প্রিন্স হামজাসহ উচ্চপদস্থ কয়েকজন কর্মকর্তা সেনা ‘অভ্যুত্থানচেষ্টায়’ জড়িত। এজন্য তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে।
ভিডিও বার্তায় যা বলেছেন প্রিন্স হামজা
শনিবার রেকর্ড করা ভিডিওটিতে প্রিন্স হামজা বলেন, জর্ডানের সেনাপ্রধান তাকে জানিয়েছেন, তিনি বাড়ি থেকে বেরোতে পারবেন না এবং লোকজনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারবেন না। কারণ তিনি উপস্থিত ছিলেন এমন কিছু সভায় সরকার ও বাদশাহর সমালোচনা করা হয়েছে। তবে তিনি নিজে এরকম সমালোচনা করেছেন এমন অভিযোগ তার বিরুদ্ধে আনা হয়নি। তবে প্রিন্স হামজা বলেন, ‘গত ১৫-২০ বছরে জর্ডানের প্রশাসন যেভাবে ভেঙে পড়েছে, সরকার কাঠামোয় যে অদক্ষতা ও দুর্নীতি দেখা গেছে তার জন্য তিনি দায়ী নন। জনগণ যে তাদের প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলেছে তার জন্যও আমি দায়ী নই’।
তিনি আরো বলেন, পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে গেছে যে, কেউ কথা বলতে পারে না, নিগ্রহ-হুমকি-হয়রানি-গ্রেফতারের শিকার না হয়ে কেউ মতপ্রকাশ করতে পারে না। প্রিন্স হামজা বলেছেন, তার সব কর্মচারীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তিনি ও তার পরিবারকে আম্মানের বাইরে আল-সালাম প্রাসাদে গৃহবন্দি করা হয়েছে এবং তার যোগাযোগ ব্যবস্থা সীমিত করে দেওয়া হয়েছে। ভিডিওতে তিনি বলছেন, দেশে এক ভীতিকর পরিবেশ তৈরি হয়েছে যেখানে কেউ সরকারের সমালোচনা করলেই গোপন পুলিশের হাতে গ্রেফতার হওয়ার আতঙ্কে থাকতে হয়। রাজপরিবারের ভেতরে উত্তেজনা চলছিল
জর্ডানের সাংবাদিক রানা সোয়েইস বিবিসিকে বলেন, বেশ কিছুদিন ধরেই রাজপরিবারের ভেতরে উত্তেজনা চলছিল। তিনি বলেন, সাবেক যুবরাজ হামজাকে জনপ্রিয় বলে মনে করা হয়। তার সঙ্গে বাদশাহ হুসেইনের চেহারার অনেক মিল, তিনি স্থানীয় উপজাতিগুলোর মধ্যেও জনপ্রিয়। জর্ডানে মহামারি শুরু হওয়ার পর থেকেই দেশটির শক্তিধর গোয়েন্দা সংস্থাকে অতিরিক্ত ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল এবং এজন্য মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো এর সমালোচনা করছিল। তবে জর্ডানে উচ্চস্তরের রাজনৈতিক লোকদের গ্রেফতারের ঘটনা খুবই বিরল।
বিবিসির বিশ্লেষক ফ্র্যাংক গার্ডনার বলছেন, মনে হচ্ছে রাজপরিবারের এই সংকট নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। তিনি বলছেন, দেশটির অর্থনীতি কোভিড মহামারির আগে থেকেই খারাপ অবস্থায় ছিল এবং সেখানে এখন গণঅসন্তোষ বাড়ছে। দেশটির প্রয়াত বাদশাহ হুসেইনের ছেলে এখন যেভাবে ভিডিও বার্তায় সরকারের সমালোচনা করছেন তা অনেকটা দুবাইয়ের বন্দি প্রিন্সেস লতিফার বার্তার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। শনিবার জর্ডানে আরো যারা গ্রেফতার হয়েছেন তার মধ্যে আছেন সাবেক অর্থমন্ত্রী বাসেম আওয়াদাল্লাহ এবং রাজপরিবারের এক জন সদস্য শরিফ হাসান বিন জায়েদ।
