প্রতিবন্ধীদেরও প্রতিভা আছে

আপডেট : ০৫ এপ্রিল ২০২১, ২২:০৩

আমাদের চারপাশে এমন অনেক মানুষ আছেন, যারা ত্রুটিপূর্ণ অবস্থায় জীবন যাপন করছেন। যাদেরকে সমাজ প্রতিবন্ধী নামে চিহ্নিত করেছেন। যারা আমাদের কাছে প্রতিবন্ধী হিসেবে পরিচিত। পৃথিবীতে শারীরিক যোগ্যতার ভিত্তিতে দুই ধরনের মানুষ পরিলক্ষিত হয়। এক শ্রেণির মানুষ নিখুঁত দেহ-বৈশিষ্ট্যের অধিকারী, অন্য শ্রেণি ত্রুটিপূর্ণ। আর এই দ্বিতীয় শ্রেণির মানুষকে বলা হয় প্রতিবন্ধী। প্রতিবন্ধী শব্দের অর্থ বাধাগ্রস্ত ব্যক্তি। মানবদেহের নানা ত্রুটিপূর্ণ অবস্থার কারণে প্রতিবন্ধীতার কয়েকটি শ্রেণিতে বিভাজন করা যায়। যেমন—দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী, মূক ও বধির প্রতিবন্ধী, মানসিক প্রতিবন্ধী প্রভৃতি। আমরা জানি যে প্রতিবন্ধী বা পঙ্গু ও বিকলাঙ্গ ব্যক্তিরা সমাজের বড় ধরনের কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করতে পারে না। তারা নিজেদের সমস্যা নিজেরা সমাধান করতে সাধারণত অক্ষম। অন্যের ওপর নির্ভরশীলতা তাদের জীবনের পরম নিয়তি। এ কারণে প্রতিবন্ধীদের প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি সহানুভূতিপূর্ণ নয়। তবে সাম্প্রতিক কালে ব্যাপক প্রচারণা, প্রতিবন্ধীদের নানা প্রশিক্ষণ প্রদান, তাদের বিভিন্ন কর্মে অংশগ্রহণ ইত্যাদি কারণে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটছে। প্রতিবন্ধীরাও মানুষ, এই মানবিক আবেদন তাদের প্রতি সাধারণ মানুষকে কেবল সহানুভূতিই নয় বরং কর্তব্যমুখীও করে তুলছে।

জাতিসংঘের বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার জরিপকৃত হিসাব অনুযায়ী বিশ্বের মোট জনসংখ্যার শতকরা প্রায় ১০ ভাগ মানুষ কোনো না কোনোভাবে প্রতিবন্ধী। মানুষ প্রতিবন্ধী হয় নানা কারণে। যেমন—পঙ্গুত্ব  নিয়েই জন্মগ্রহণ, অপুষ্টির কারণে পঙ্গুত্ব বরণ, রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে প্রতিবন্ধী হয়ে ওঠা অথবা দুর্ঘটনার কারণে। গর্ভকালীন সময়ে অপুষ্টি বা মায়ের অনিয়মজনিত কারণে শিশু পঙ্গু হয়ে জন্মগ্রহণ করে। পোলিও, টাইফয়েড, নিউমোনিয়া, রিকেট ইত্যাদি রোগ প্রতিবন্ধিতার অন্যতম কারণ। স্নায়ুগত সমস্যা, হাড় বা অস্থির অসম অবস্থান, অঙ্গহানি, দুর্ঘটনা ইত্যাদি কারণেও শিশু বা ব্যক্তি প্রতিবন্ধী হয়। আজ থেকে প্রায় ৩০ বছর আগে বাংলাদেশে প্রচ্ছন্ন ও প্রকৃত প্রতিবন্ধীর সংখ্যা ছিল প্রায় অর্ধকোটির মতো। এর মধ্যে শিশুদের সংখ্যাই ছিল বেশি। বর্তমানে এ সংখ্যা মোটামুটি ১ কোটি ২০ লাখের কাছাকাছি। বস্তুত, এ চিত্র কোনোভাবেই সুখকর নয়। জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং সরকারি প্রয়াসে প্রতিবন্ধীদের জন্য নানামুখী কর্মসূচি প্রণীত হয়েছে। অন্ধদের জন্য টঙ্গীতে গড়ে উঠেছে প্রশিক্ষণকেন্দ্র। সারা দেশে আছে বোবা ও বধিরদের জন্য স্কুল ও প্রশিক্ষণকেন্দ্র।

বিশেষ শিক্ষা নীতিমালা-২০০৯ জাতিসংঘ ঘোষিত প্রতিবন্ধী ব্যক্তিবর্গের অধিকার সনদ (ইউএনসিআলপিডি)-এর প্রতি সমর্থন প্রদানকারী প্রথম সারির দেশসমূহের উদ্যোগে ২০০৯ সাল থেকে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মসূচি বাস্তবায়িত হচ্ছে। প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আওতায় এযাবত্ অটিস্টিক শিশুসহ ৫০০ জন বিভিন্ন শ্রেণির প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং তাদের পিতা-মাতা/অভিভাবকদের প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। এছাড়াও জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের প্রথম পৃষ্ঠপোষকমণ্ডলীর সভায় ফাউন্ডেশনের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো শক্তিশালী করার লক্ষ্যে ফাউন্ডেশনকে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি পূর্ণাঙ্গ সরকারি অধিদপ্তরে রূপান্তর করার পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।

প্রতিবন্ধীরা আমাদেরই সন্তান, আমাদের প্রতিবেশী, আমাদেরই আপনজন। সুতরাং তাদের প্রতি আমাদের উদাসীনতা প্রদর্শন না করে তাদের উন্নতির জন্য মনোনিবেশ করা কর্তব্য। বাংলাদেশে প্রতিবন্ধীদের উন্নয়ন প্রকল্প জাতীয় প্রতিবন্ধী ফোরাম প্রণয়ন করেছে জাতীয় নীতিমালা। কিন্তু এ নীতিমালা তেমন একটা কার্যকর হয়নি। অনেক প্রতিবন্ধীকে সরকারি, বেসরকারি ও প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানে কর্মে নিযুক্ত দেখা গেলেও তা দেশের বিশাল প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর তুলনায় অত্যন্ত অনুল্লেখযোগ্য। এ ব্যাপারে পেশাভিত্তিক কর্মকৌশল প্রণয়ন করা প্রয়োজন।

প্রতিবন্ধী মানুষের প্রতি ভালোবাসা প্রদর্শন, তাদেরকে যোগ্যতা অনুযায়ী সম্মান প্রদান, সুষ্ঠুভাবে, আনন্দ ও সাহায্য-সহযোগিতার মধ্য দিয়ে জীবনযাপনে সহযোগিতা করা আমাদের সকলের দায়িত্ব ও কর্তব্য। মনে রাখা আবশ্যক যে, একজন প্রতিবন্ধী মানুষ তার সেই অবস্থার জন্য নিজে দায়ী নয়, পরিস্থিতির শিকার মাত্র। সুতরাং দয়া, করুণা ও অবহেলা তার প্রাপ্য নয়। একজন প্রতিবন্ধীরও সুস্থ সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার অধিকার আছে। আমরা তাদেরকে আশাহত করতে পারি না। আমাদের সমাজের সবার উচিত তাদের পাশে দাঁড়ানো। তাদেরকে যে কোনো প্রয়োজনে সাহায্য-সহযোগিতা করা এবং তাদেরকে ভালোবাসা দেওয়া।

n  লেখক :শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়