লবণাক্ত হয়ে উঠেছে কীর্তনখোলার পানি

আপডেট : ০৫ এপ্রিল ২০২১, ২২:৪৭

বরিশালের কীর্তনখোলা নদীর পানি লবণাক্ত হয়ে উঠেছে। ফলে নদী তীরবর্তী এলাকার মানুষ বর্তমানে এ নদীর পানি ব্যবহার করতে পারছে না। বরিশাল পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, ২০২০ সাল থেকে ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত কীর্তনখোলার পানির ইলেকট্রিক্যাল কন্ড্যাকটিভিটি স্বাভাবিক থাকলেও মার্চ মাসে তা কয়েকগুণ বেড়েছে। এতে পরিবেশ বিপর্যয়ের শঙ্কা রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, জলবায়ু পরিবর্তন এবং সঠিক সময়ে বৃষ্টিপাত না হওয়ার কারণে নদীর মিঠা পানি এখন লবণাক্ত হয়ে উঠেছে। এতে নদী মাছ শূন্য হয়ে পড়ার আশঙ্কা যেমন রয়েছে, সেই সঙ্গে নদীর পানি ব্যবহারকারীরাও ভুগতে পারেন নানা অসুখে।

স্থানীয় সূত্র জানায়, গত এক সপ্তাহ থেকেই কীর্তনখোলা নদীর পানি হঠাত্ করে লবণাক্ত হয়ে ওঠে। পানি ব্যবহার করে এবং পান করে স্থানীয়রা পানিতে লবণাক্ততার বিষয়টি টের পায় এবং বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। নদী তীরের বাসিন্দা সাফিন আহমেদ রাতুল জানান, গত সাত-আট দিন যাবত্ নদীর পানি ব্যবহার করা যাচ্ছে না। দোকানিরা জানান, নদীর পানি দিয়ে আগে চা তৈরি করলে কোনো সমস্যা হতো না, কিন্তু বর্তমানে পানি লবণাক্ত হওয়ায় চায়ের স্বাদ লবণ লবণ লাগে। তীরবর্তী এলাকার একাধিক বাসিন্দা জানান, নদীর পানির ওপর ভরসা করেই তাদের জীবন চলে। কিন্তু পানি লবণাক্ত হওয়ায় তাদের জীবনযাত্রা থমকে গেছে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন ও বাংলাদেশ নদী বাঁচাও আন্দোলনের বরিশাল বিভাগীয় সমন্বয়কারী রফিকুল আলম জানান, ২০১০ সাল থেকে পরবর্তী দুবছর যে সার্ভে করা হয়েছিল তাতে দেখা যায়, তেঁতুলিয়া নদী পর্যন্ত সাগরের পানি শুষ্ক মৌসুমে চলে আসে। তখন পরিবেশ অধিদপ্তরকে বিষয়টি জানানো হয়েছিল। তিনি বলেন, এখন থেকে ১০ বছর আগে উজান থেকে পানি আসত দেড় থেকে ২ লাখ কিউসেক মিটার পার সেকেন্ড। এখন সেটা কমে গেছে। উজানের পানি কমতে থাকলে সাগরের পানির চাপ বাড়তে থাকে। এজন্য উজানের পানি প্রবাহ বাড়াতে হবে।

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপকূল বিদ্যা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের চেয়ারম্যান ড. হাফিজ আশরাফুল হক জানান, কীর্তনখোলা নদীর স্যালাইনিটি তিনগুণ বেড়েছে। লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ার মূল কারণ জলবায়ুর পরিবর্তন। উজান থেকে পর্যাপ্ত পানি না এলে নদীর পানির উচ্চতা কমে যায়। পাশাপাশি সমুদ্রের পানি নদীতে চলে এলে লবণাক্ততা বেড়ে যায়। এবারে স্বাভাবিক বৃষ্টিপাতও হয়নি। এ কারণে লবণাক্ততা বেড়ে যেতে পারে। এতে করে ইলিশের ওপর প্রভাব পড়তে পারে। তাছাড়া এই পানি পান করলে মানুষের কিডনি অকেজোসহ নানা রোগ হতে পারে।

বরিশাল বিভাগীয় পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, প্রতি মাসেই নদীর পানি পরীক্ষা করা হয়। সে অনুযায়ী ফেব্রুয়ারি মাসে পানিতে লবণাক্ততার যে পরিমাণ ছিল তা মার্চ মাসে কয়েকগুণ বেড়েছে। ৭ ফেব্রুয়ারি কীর্তনখোলা নদীর ছয়টি স্থান থেকে পানি সংগ্রহ করা হয়। ফেব্রুয়ারিতে কীর্তনখোলা নদীর পানিতে ইলেকট্রিক্যাল কন্ড্যাক্টটিভিটির পরিমাণ কম থাকলেও মার্চ মাসে তা অস্বাভাবিক বেড়ে যায়। মার্চ মাসের ৭ তারিখে পানি পরীক্ষা করে দেখা যায়, নদী বন্দর সংলগ্ন তীরে পানিতে ইলেকট্রিক্যাল কন্ড্যাকটিভিটি ১ হাজার ৩৬০, নদীর মাঝে ১ হাজার ৩৬২। সাধারণত পানিতে ইলেকট্রিক্যাল কন্ড্যাকটিভিটি ১ হাজার ২০০’ পর্যন্ত থাকলে তাকে স্বাদু পানি বলা যেতে পারে। পরিবেশ অধিদপ্তরের বরিশাল বিভাগীয় ভারপ্রাপ্ত পরিচালক কামরুজ্জামান সরকার সাংবাদিকদের জানান, প্রতি মাসেই বরিশাল বিভাগের ১৫টি নদীর পানি পরীক্ষা করা হয়। বরিশালের কীর্তনখোলা নদীতে সমস্যার বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। নদীর কোনো স্থানে স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হতে পারে এবং সে কারণে এ ধরনের সমস্যা হতে পারে।