এক দেশে দুই প্রেসিডেন্ট!

আপডেট : ২৭ জানুয়ারি ২০১৯, ২১:৫৯

 

গত বছর একটি সংবাদ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে আলোড়ন তুলেছিল। তাহলো ভেনিজুয়েলার সুন্দরীরা দেশ ছাড়ছেন। কারণ দেশের অর্থনীতি দুর্বল হওয়া। মিস ভেনিজুয়েলার মতো প্রতিযোগিতার হাত ধরে যে নারীরা এতদিন কর্মসংস্থান পেতেন, অর্থনীতির পতনের ফলে সেই সুযোগ হারিয়ে দেশ ছাড়ছেন সুন্দরীরা। সেই দেশটি শাসন করছেন বামপন্থি নিকোলাস মাদুরো। তার পূর্বসূরী হুগো শাভেজও ছিলেন বামপন্থি যার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি দেশকে একটি অর্থনৈতিক মন্দার দিকে ঠেলে দিয়েছিলেন। কিন্তু দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে মাদুরোকে। তার বিরুদ্ধে বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠেছে দেশ। তরুণ বিরোধী নেতা ও পার্লামেন্টের স্পিকার হুয়ান গুয়াইদো নিজেকে দেশের অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করেছেন। এক দেশের দুই প্রেসিডেন্টকে সমর্থন দেওয়া নিয়ে বিভক্ত হয়ে পড়েছে বিশ্ব।

আন্তর্জাতিক সমর্থনে দুই প্রেসিডেন্ট: বিশ্লেষকরা ভেনিজুয়েলার বিক্ষোভকে আরব বসন্তের সঙ্গে তুলনা করে ‘কারাকাস বসন্ত’ বলেও মনে করছেন। এই বসন্তে বিদায় নিতে হতে পারে মাদুরোকে। দেশটিতে এখন একজন বিতর্কিত প্রেসিডেন্ট এবং একজন স্বঘোষিত প্রেসিডেন্ট আছেন। তাদের নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে। ২৩ জানুয়ারি মাদুরোর বিরুদ্ধে ক্ষমতা দখলের অভিযোগ করে গুয়াইদো অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে নতুন নির্বাচনেরও ঘোষণা করেন। পেট্রোলিয়াম সমৃদ্ধ দেশ হওয়া সত্ত্বেও ভেনিজুয়েলার চরম আর্থিক দুর্দশা ও অস্বাভাবিক মূল্যস্ফীতির প্রেক্ষাপটে তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানান। উল্লেখ্য, ভেনিজুয়েলার সংবিধান অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট পদ খালি হলে ৩০ দিনের মধ্যে নতুন নির্বাচনের আয়োজন করতে হবে। এই সময়ে কংগ্রেস বা পার্লামেন্টের প্রধান অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট হিসেবে কাজ করবেন।

বলা বাহুল্য, ঘরে-বাইরে কোণঠাসা হয়ে পড়লেও হার মানতে রাজি নন বিতর্কিত নির্বাচনে জয়ী মাদুরো। কারণ সুপ্রিম কোর্ট পার্লামেন্টের সব পদক্ষেপকে বেআইনি ঘোষণা করেছে। সামরিক বাহিনী এখনো পর্যন্ত মাদুরোর প্রতি আনুগত্য দেখিয়ে এসেছে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেনারেল ভ্লাদিমির পাদ্রিনো লোপেজ এবং ৮ জন জেনারেল মাদুরোর প্রতি পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করেছেন। তবে সেনাবাহিনীর নীচের কিছু সৈন্য তার প্রতি বিদ্রোহ করেছে যাদের কয়েকজনকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। মাদুরোর দাবি, বিরোধীরা আমেরিকার মদদে অভ্যুত্থান করার চেষ্টা করছে।

অন্যদিকে বিরোধী নেতা ও স্বঘোষিত অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট হুয়ান গুয়াইদো নিজের কর্তৃত্ব কায়েম করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও লাতিন আমেরিকার দেশসহ আন্তর্জাতিক শক্তির সমর্থন নিয়ে সরাসরি মাদুরোকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছেন গুয়াইদো। রাজপথে এই দুই নেতার সমর্থকদের প্রতিবাদ বিক্ষোভের জের ধরে নিহতের সংখ্যা প্রায় ৩০ বলে বেসরকারি সংস্থা জানিয়েছে। মার্কিন প্রশাসনের বিরোধী শক্তির প্রতি জোরালো সমর্থন এবং প্রয়োজনে সামরিক হস্তক্ষেপের ইঙ্গিত দেওয়ায় বেজায় ক্ষুব্ধ হয়েছেন মাদুরো। তিনি মার্কিন কূটনীতিকদের দেশ ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছেন এবং যুক্তরাষ্ট্র থেকে তার দেশের কূটনীতিকদের ফিরিয়ে আনার ঘোষণা দিয়েছেন। মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দূতাবাসের বেশিরভাগ কর্মীকে ভেনিজুয়েলা ছাড়ার নির্দেশ দিলেও ৭২ ঘণ্টার মধ্যে তাদের বহিষ্কারের নির্দেশ পালন করতে প্রস্তুত নয়। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রশাসন জানিয়েছে, অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট গুয়াইদোর প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে কূটনীতিকরা ভেনিজুয়েলায় অবস্থান করবেন। ভেনিজুয়েলার পেট্রোলিয়াম বিক্রির অর্থ থেকে মাদুরোকে বিচ্ছিন্ন করার উদ্যোগও নিচ্ছে ওয়াশিংটন। সেই অর্থ গুয়াইদোর প্রশাসনের হাতে তুলে দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন মার্কিন জাতীয় উপদেষ্টা জন বোল্টন। তবে তিনি স্বীকার করেছেন, এমন প্রক্রিয়া অত্যন্ত জটিল। ভেনিজুয়েলার তেল থেকে আয়ের নগদ অর্থের ৭৫ ভাগ আসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। মার্কিন জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে, কারাকাস গত বছর প্রতিদিন যুক্তরাষ্ট্রে ৫ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি করেছে। গত নভেম্বরে ভারত তেল আমদানিতে দ্বিতীয় স্থানে ছিল। ফলে মাদুরো সরকার ভারতসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে তেল রপ্তানি বাড়াতে পারে।

রাশিয়া, চীন ও তুরস্ক মাদুরো প্রশাসনের প্রতি তাদের সমর্থন ব্যক্ত করেছে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন টেলিফোনে মাদুরোর সঙ্গে কথা বলেছেন। বাইরে থেকে ভেনিজুয়েলায় সংকট সৃষ্টি করা হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। চীনও ভেনিজুয়েলার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের অভিযোগ করেছে। উল্লেখ্য, রাশিয়া ও চীন অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত ভেনিজুয়েলাকে প্রয়োজনীয় ঋণ ও অস্ত্র সরবরাহ করে। বিশেষ করে চীন দেশটিতে বিশাল মাত্রায় বিনিয়োগ করে এসেছে। পেট্রোলিয়াম শিল্পেও চীনের বড় অবদান আছে। মেক্সিকো, কিউবা ও বলিভিয়ার বামপন্থি প্রশাসনও মাদুরোর প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। তুরস্কের সঙ্গেও মাদুরো প্রশাসনের ঘনিষ্ঠ বাণিজ্যিক সম্পর্ক বিদ্যমান। এমন পরিস্থিতিতে কারাকাসের সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধানের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। ট্রাম্প প্রশাসনের সমর্থন পাওয়ায় দেশের মধ্যে অনেকে বিরোধী নেতা হুয়ান গুয়াইদোকে আমেরিকার চর হিসেবে তুলে ধরছে। অন্তর্কলহ বন্ধ করে তিনি বিরোধী শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করতে সমর্থ হলেও সামরিক বাহিনীর সমর্থন আদায় করতে ব্যর্থ হয়েছেন। তবে মাদুরোর প্রতি তিনি কিছুটা সহযোগিতার হাতও বাড়িয়ে দিয়েছেন। মাদুরো স্বেচ্ছায় ক্ষমতা ছাড়লে তার জন্য সাধারণ ক্ষমার ব্যবস্থার চেষ্টা করবেন বলে জানিয়েছেন গুয়াইদো। এমন অবস্থায় কারাকাস অভূতপূর্ব রাজনৈতিক সংকটের মুখে পড়েছে। বিরোধীরা এক সমান্তরাল প্রশাসন গড়ে তোলায় মাদুরোর শাসনযন্ত্রের সঙ্গে সংঘাতের আশংকা দেখা দিয়েছে।

কেন এই সংকট: হুগো শাভেজের মুকুট এবং বোঝা দুই-ই পেয়েছেন মাদুরো। ভেনিজুয়েলার ক্যারিসমেটিক প্রেসিডেন্ট হুগো শাভেজ ২০১৩ সালে মৃত্যুবরণ করার পর উত্তরসূরী হিসেবে প্রেসিডেন্ট হন মাদুরো। পরে তিনি সামান্য ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়ে ছয় বছর দায়িত্ব পালন করেন। বলা হয়, শাভেজের শাসনকালে ভেনিজুয়েলার লাখ লাখ অধিবাসী চরম দারিদ্র্য থেকে পরিত্রাণ পেয়েছে। কিন্তু তিনি ভেনিজুয়েলার অর্থনীতিকে যে অবস্থায় রেখে গেছেন তাকে আশাজনক বলা যায় না। এমনকি ভেনিজুয়েলা তার নিজের জনগণের মুখে অন্ন তুলে দেবার মতো অবস্থায় কিনা তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। মুদ্রাস্ফীতি, মান্ধাতার আমলের শিল্প-কারখানা, বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ তো দূরের কথা, সেই ঋণের সুদ পরিশোধ করাটাই দুঃসাধ্য হয়ে উঠেছে। এসবই শাভেজের উত্তরাধিকার।

ক্ষমতায় আসার পর পরই শাভেজ বিশেষভাবে লাভজনক খনিজ তেল শিল্পসহ বিভিন্ন শিল্পসংস্থাকে রাষ্ট্রীয় মালিকানায় আনা শুরু করেন। অপরদিকে শাভেজ তেলনির্ভর অর্থনীতিকে আরো তেল নির্ভরতার দিকে ঠেলে দিয়েছেন। অন্যান্য শিল্পের বিকাশ ঘটানোর কোনো চেষ্টা করেননি। ভেনিজুয়েলার মোট রপ্তানির ৯৬ শতাংশ রাষ্ট্রীয় খনিজ তেল উত্পাদক সংস্থা পিডিভিএসএ’র                  হাত দিয়ে যায়। তা সত্ত্বেও আবার দেশটিকে জ্বালানি তেল আমদানি করতে হয়, কেননা দেশের মান্ধাতার আমলের পরিশোধনাগারগুলো অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে সমর্থ নয়। তবে বড় কথা হলো দৈনন্দিন ঘাটতি এবং অনটন: ময়দা, মাংস, চিনি, রান্নার তেল, এমনকি ওষুধপত্র সবকিছুর আকাল। আসলে ভূমি সংস্কার হয়েছে বড় খামার মালিকদের কাছ থেকে ফেলে রাখা জমি নিয়ে ছোট চাষিদের দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তার ফলে খাদ্য আমদানির উপর নির্ভরতা কিছুমাত্রায় কমেনি। বিশ্লেষকরা বলছেন, মাদুরোবিরোধী বিক্ষোভ চাঙ্গা হওয়ার মূল কারণ অর্থনৈতিক মন্দা। গত দুই বছরে তেলের দাম কমে যাওয়া,                   রাজস্ব ঘাটতি, অতিরিক্ত মুদ্রাস্ফীতি, আমদানিকৃত নিত্য ব্যবহার্য পণ্যের ঘাটতি,