ইরান-ইসরাইল দ্বন্দ্বের নতুন ফ্রন্ট সিরিয়া?

আপডেট : ২৭ জানুয়ারি ২০১৯, ২২:০৬

 

ইসরাইল সম্প্রতি সিরিয়ায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা বাড়িয়েছে। বলা হচ্ছে সিরিয়ায় ইরানী অবস্থান লক্ষ্য করে এসব হামলা চালানো হচ্ছে। সিরিয়া থেকেও ইসরাইল অধিকৃত গোলান মালভূমি টার্গেট করে পাল্টা হামলা চালানো হয়েছে। তবে দেশটির আয়রন ডোম ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কার্যত ওসব হামলা নস্যাত করে দিয়েছে।

সিরিয়ার যেসব স্থানে ইসরাইল ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে তার মধ্যে দামেস্ক আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছাকাছি একটি গুদাম যেখানে ইরানী অস্ত্রশস্ত্র মজুত করে রাখা হয়েছে বলে ইসরাইলের দাবি। এছাড়া রয়েছে সিরিয়ার সামরিক বাহিনীর বিমান প্রতিরক্ষা ব্যাটারির একটি লাইন। এগুলোর মধ্যে রাশিয়ায় তৈরি কিছু সরঞ্জামাদি ও স্থাপনাও রয়েছে। পর্যবেক্ষকদের দেওয়া হিসেব মতে, ইসরাইলী হামলায় এ পর্যন্ত ২১ জন নিহত হয়েছে। এর মধ্যে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের ১২ জন সদস্য, ছয়জন সিরিয়ার সামরিক বাহিনীর সদস্য ও পাঁচজন বেসামরিক সিরীয় নাগরিক রয়েছেন। জবাবে ইরান ইসরাইলকে মানচিত্র থেকে মুছে ফেলার ও সিরিয়া তেলআবিব বিমানবন্দরে হামলা চালানোর হুমকি দিয়েছে। এদিকে রাশিয়া ২৪ জানুয়ারি ইসরাইলকে একটি সার্বভৌম দেশের অভ্যন্তরে না চালাতে বলেছে। চলমান উত্তেজনার মধ্যেই ইসরাইল রাজধানী তেলআবিবের নিরাপত্তা বাড়াতে সেখানে আয়রন ডোম ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষার আওতা সম্প্রসারিত করেছে। ইরান ও ইসরাইলের মধ্যে ছায়া যুদ্ধ নতুন কিছু নয়। কিন্তু গত কয়েক সপ্তাহে ইসরাইল সিরিয়ায় যেভাবে হামলার পরিসর বাড়িয়েছে তাতে সিরিয়াকে কেন্দ্র করে দেশ দুটির মধ্যে সংঘাত বেধে যাওয়ার আশঙ্কা বেড়েছে।

ইসরাইলের প্রতিরক্ষা বাহিনী তাদের টুইটারে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ভিডিও প্রকাশ করেছে। এতে গোলান মালভূমির হারমন পর্বতকে ইসরাইলের উত্তরাঞ্চলীয় একটি অংশ হিসেবে দেখান হয়েছে। কিন্তু সেটি আন্তর্জাতিকভাবে ইসরাইলের অংশ হিসেবে স্বীকৃত নয়। ১৯৬৭ সালের আরব ইসরাইল যুদ্ধে ইসরাইল গোলান মালভূমির বেশিরভাগ অংশ দখল করে নেয়। ১৯৮১ সালে সেটি নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ বলে ঘোষণা দেয়। গোলান মালভূমির এ অংশটি মূলত সিরিয়ার ছিল। দুই দেশের মধ্যে এ বিষয়ে কোনো চুক্তি না হওয়ার দেশ দুটি অলিখিত যুদ্ধাবস্থায় ছিল। বাস্তবে এ নিয়ে এতকাল সংঘাতের খবর তেমন একটা পাওয়া যায়নি। ২০১১ সালে সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ শুরুর পর ইরান দেশটির শাসক বাশার আল আসাদের পক্ষে দাঁড়ায়। আসাদের সরকারের সম্ভাব্য পতন ঠেকাতে ইরান সক্রিয়ভাবে যুদ্ধে অংশ নেয়। বিষয়টি সিরিয়া ও ইসরাইলের পুরনো দ্বন্দ্বকে নতুন করে উসকে দিয়েছে।

সিরিয়ায় বাশার আল আসাদের পরিবারের চার দশকের শাসনের বিরুদ্ধে যারা লড়ছে, সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলো তাদের আর্থিকভাবে সহায়তা করছে। যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক হার্ভার্ডের কেনেডি স্কুল অব গভর্নমেন্টসের ইরান প্রজেক্টের ডিরেক্টের পায়াম মোহসেনি মনে করেন সিরিয়ার মাটিতে ইসরাইলের সীমান্তের কাছে ইরানের বাহিনীর উপস্থিতি যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। সিরিয়ায় ইরানের উপস্থিতি প্রতিবেশী লেবাননে প্রভাবশালী শিয়া মিলিশিয়া গ্রুপ হিযবুল্লাহর মনোবল চাঙ্গা করবে। ফলে চাপ বাড়বে ইসরাইলের ওপর। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ২০১৭ সালে বলেছিলেন, ‘ইরান সিরিয়াকে নিজের সামরিক ঘাঁটি বানাতে চায়।’ ওই বছর ইরান ও রাশিয়ার যৌথ হস্তক্ষেপে ক্ষমতায় টিকে যান আসাদ। নেতানিয়াহু বলেছিলেন, ‘ইরান ইসরাইলকে মানচিত্র থেকে মুছে ফেলার ঘোষিত লক্ষ্য অনুযায়ী সিরিয়া ও লেবাননকে ঘাঁটি বানিয়ে হামলার ছক কষছে’। তিনি বলেন, তার দেশ এটি কখনোই হতে দিতে পারে না। ইরান অবশ্য সিরিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে সামরিক ঘাঁটি গড়ার কথা অস্বীকার করে বলেছে, তারা কেবল সামরিক উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করছে।

ক্যালিফোর্নিয়া ভিত্তিক র্যান্ড করপোরেশনের সহযোগী রাষ্ট্রবিজ্ঞানী আরিয়ান তাবাতাবায়ি বলেন, সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ শুরুর পর এ পর্যন্ত সেদেশের মাটিতে অন্তত দুই হাজার ইরানী নিহত হয়েছেন। বিগত কয়েক দশকের মধ্যে নিজস্ব ভূখণ্ডের বাইরে ইরানকে এমন তত্পর হতে দেখা যায়নি বলে তিনি মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ইরান আসাদের অনুগত সিরিয়ার বিদ্রোহী গ্রুপগুলোকে পরামর্শ নয় কেবল প্রশিক্ষণ দিয়েও সহায়তা করছে।