কার্নিভাল ওয়াইফাই হাটে গ্রামাঞ্চলের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের দিন বদলের গল্প

আপডেট : ০৬ এপ্রিল ২০২১, ২০:৫৭

মো. রবিউল ইসলাম

 

মানিক মিয়া সুরমা নদীর ওপারে মুদি দোকানদারি করেন আজ ১৪ বছর হতে চলল। ঢাকা থেকে আট ঘণ্টার পথ পেরিয়ে সুনামগঞ্জের ছাতক। সেখানে সুরমা পেরিয়ে ওপারে গণেশপুর গ্রাম। নৌকা দিয়ে পার হওয়া ছাড়া অন্য পথ নেই। গণেশপুর বাজারে পৌঁছাতেই মানিক মিয়ার সুন্দর ছিমছাম মুদি দোকান, আর সাথে চায়ের টঙ। দোকানের সামনে কার্নিভাল ওয়াইফাই হাটের ব্যানার ঝুলছে। চায়ের কাপের টুংটাং আর টুকটাক মুদি দোকানদারিতেই তার দিন কাটে। বছরখানেক আগে কার্নিভাল ওয়াইফাই হাট বসালেন, কার্ড বিক্রি করা শুরু করলেন। এখন লোকজন চা খেতে এসে কার্ড কিনে ঘণ্টা দুয়েক ইন্টারনেট চালায়, কার্ডও বেঁচা হয়, দোকানের মাল বিক্রিরও কমতি নেই। গ্রামের ছেলেপেলে অনলাইনে লেখাপড়া করার জন্য সারা মাসের ইন্টারনেট একেবারে কিনে নিয়ে যায়। মাঝেমধ্যে রাত ১০ টার দিকে কল আসে কার্ডের জন্য, বাপ ছেলের সাথে কথা বলবে বিদেশে। মানিক মিয়া কার্ড পাঠিয়ে দেন। তার ব্যবসা বেড়ে গেছে দেখে তার বড় ভাইও এখন কার্নিভাল হাটের লাইন নিয়েছেন।

মানিক মিয়ার কথায়- ‘ওয়াইফাই হাট দেওনের পর দোকানের বেচা বিক্রি ভালোই চলে। গেরামের লোকজন ২ ঘণ্টা, ১ দিনের কার্ড কিনি দোকানের সামনে বসি বসি ইন্টারনেট ইউস করে আর বিস্কুট, কেক, আইসক্রিম, ঠাণ্ডা কিনি খায়। আগে তো কাস্টমার দোকানে আইসা বেশিক্ষণ বসত না আর এহন সবসময় আর দোকানে কাস্টমার থাকে। একবার লাইন টা ডিসটাব দিছিল লগে লগে লোক পাঠাইয়া লাইন ঠিক করি দিছে।’

এরকম অনেক গল্প নিয়েই কার্নিভাল ওয়াইফাই হাট। গ্রামগঞ্জের চায়ের দোকান, বেকারি কিংবা টেলিকম দোকানগুলোতে কাজ করছে হাটগুলো। ছোট ছোট দোকানগুলো হয়ে উঠছে ইন্টারনেটের আলোয় আলোকিত। মাত্র ৭ টাকায় একজন গ্রাহক যেকোন ওয়াইফাই হাট থেকে কার্ড কিনে ২ ঘণ্টা আনলিমিটেড ইন্টারনেট ব্যবহার করার সুযোগ পাচ্ছেন। এতে যেমন গ্রাহক উপকৃত হচ্ছেন, তেমনি গ্রাহক সমাগম বাড়ায় দোকানের কেনাবেচাও বেড়ে গেছে আগের চেয়ে অনেক বেশী, এতে দোকানিও বেশ উপকৃত হচ্ছেন।

সৃজনশীল এই উদ্যোগের ব্যাপারে জানতে আমরা কথা বলেছিলাম কার্নিভাল ইন্টারনেটের পরিচালক জামান খানের সাথে, যার হাত ধরে কার্নিভাল ইন্টারনেট যাত্রা শুরু করে আজ সারাদেশে বিস্তৃতি লাভ করেছে।

প্রান্তিক পর্যায়ের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কাছে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট পৌঁছানোর মাধ্যমে তাদের নতুন ব্যবসার সুযোগ তৈরির চিন্তাভাবনা আপনাদের কিভাবে আসল?

আমাদের ডটলাইন্স গ্রুপের চেয়ারম্যান মাহবুবুল মতিন বর্তমান সরকারের ‘রূপকল্প ২০২১’ এর ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ এবং ২০১৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে উল্লিখিত ‘গ্রাম হবে শহর’ এ অনুপ্রাণিত হয়ে শহর এবং গ্রামের মানুষের ভেতর ডিজিটাল বিভাজন কমিয়ে আনার জন্য  ‘কার্নিভাল গো রুরাল’ প্রকল্পটি চালু করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এ প্রকল্পের উদ্দেশ্য হল অপটিকাল ফাইবারের মাধ্যমে প্রান্তিক পর্যায়ে হাই স্পিড ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট কানেকশন নিশ্চিত করা। মানুষ যেন গ্রামে থেকেই শহরের মানের শিক্ষা, বিনোদন, অর্থনৈতিক কার্যক্রমের বিভিন্ন সুবিধা পেতে পারে। বর্তমান সরকার উপজেলা এবং বেশ কিছু এলাকায়  ইউনিয়ন লেভেল পর্যন্ত ইন্টারনেট সেবার জন্য যে অবকাঠামো তৈরি করেছে তার উপর ভিত্তি করেই কার্নিভাল ইন্টারনেট এই প্রকল্পটি চালু করেছে।  ইতোমধ্যে কার্নিভাল এই সেবা নিয়ে পৌঁছে গেছে দেশের ৪৮ জেলার ১৮২ উপজেলার সাড়ে এগারো হাজার গ্রামে। এক লক্ষ গ্রাহক পরিবার এবং প্রায় পাঁচ লক্ষ ওয়াইফাই হাট গ্রাহক এখন আমাদের সাথে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্নের ডিজিটাল বাংলাদেশ নির্মাণের পথে আমরা এখন অনেকদূর পৌঁছে গেছি। পরীক্ষামূলক প্রকল্প থেকে আমাদের যে স্বপ্নের শুরু হয়েছিল, সে স্বপ্নকে আমরা ছড়িয়ে দিতে চাই বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রামে।

ইতোমধ্যে আমরা এর সুফলও দেখতে পাচ্ছি। এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে আমাদের উদ্যোগ বেশ কার্যকরী হবে বলেই আমি মনে করি। গ্রামগুলো এখন আরও বেশী উত্পাদনশীল  আগের চেয়ে। সবার হাতেই এখন ইন্টারনেট আছে, তাই মানুষ  প্রচলিত পদ্ধতি থেকে বের হয়ে এসে প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকছে। অর্থনীতিবিদরা যেখানে আশাবাদী যে বাংলাদেশ ২০৫০ সালের মধ্যে শীর্ষ আয়ের দেশে পরিণত হবে, আমরা বিশ্বাস করি, দ্রুতগতির ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট আরও সহজলভ্য করার মাধ্যমে তথ্যপ্রযুক্তি কে ব্যবহার করে আরও বড় বিপ্লব নিয়ে আসা সম্ভব, এবং ২০৫০ সালের আগেই আমরা শীর্ষ আয়ের দেশে পরিণত হব।

ক্ষুদ্র এবং মাঝারী ব্যবসা কার্নিভালের মাধ্যমে কিভাবে বিস্তার লাভ করছে?

ফাইবার ব্রডব্যান্ড  আসার  ফলে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের মধ্যে একটা বড় বিপ্লব চলে এসেছে। দেখা যাচ্ছে একজন মুদি বা টঙ দোকানদার আগে শুধু চা-বিস্কুট বা ছোটখাট নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বিক্রি করতেন। মানুষ এসে শুধু কেনাকাটার সময়টুকুই ব্যয় করত বা শুধু চা-বিস্কুট খাওয়ার সময়টুকুই বসত দোকানে। চা খাওয়া শেষ হয়ে গেলে উঠে যেত। ওয়াইফাই হাট আসার পর এখন লোকজন মাত্র ৭ টাকায় ২ ঘণ্টা আনলিমিটেড ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছে। তাই কার্ড কিনে লোকজন আগের চেয়ে আরও বেশী সময় দোকানে ব্যয় করছে। যতবেশী সময় ব্যয় করছে, ততক্ষণ দোকানের পণ্য বিক্রিও বেশী হচ্ছে। কারণ অভ্যাসবসত মানুষ তখন চা-বিস্কুট বেশী নিচ্ছে। দোকানে আগের চেয়েও লোকসমাগম বেশী এখন। ফলে দোকানির আয়ও আগের চেয়ে অনেক বেড়ে গেছে। স্বাভাবিকভাবেই এতে অন্য ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা উত্সাহী হচ্ছেন। সবাই চায় তাদের গ্রাহক বাড়ুক, আয় বাড়ুক। তাই সফল কার্নিভাল হাট ব্যবসায়ীদের দেখাদেখি অন্য উদ্যোক্তারাও ওয়াইফাই কার্ড বিক্রি করতে আগ্রহী হচ্ছেন, লাভবানও হচ্ছেন। তারা নিজেরাও অন্য ব্যবসায়ীদের কার্নিভাল হাট নেয়ার জন্য উত্সাহ দিচ্ছেন। শুধু এক এলাকায়ই না, সাফল্যের গল্প সব গ্রাম বা এলাকায়ই ছড়ায়। দেখা যাচ্ছে কার্নিভাল হাট ব্যবসায়ীদের সাফল্যের গল্প পাশের গ্রাম বা এলাকা পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। তখন সেই এলাকার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও আগ্রহী হচ্ছেন। সামগ্রিকভাবে কার্নিভাল হাট উদ্যোক্তাদের একটা কমিউনিটি গড়ে উঠছে প্রতিনিয়ত, যেখানে একে অন্যের ব্যবসায় সহযোগিতাও করতে পারছেন। একটা পরিপূর্ণ ইকোসিস্টেম গড়ে ওঠায় ক্ষুদ্র এবং মাঝারী সব ব্যবসায়ীই লাভবান হচ্ছেন।

আগামীতে ওয়াইফাই হাট উদ্যোক্তাদের নিয়ে কার্নিভালের পরিকল্পনা কি?

ওয়াইফাই হাটকে আমরা আরেকটু বড় পরিসরে নিয়ে যাওয়ার চিন্তাভাবনা করছি। আমাদের নতুন এই উদ্যোগটির নাম ‘কার্নিভাল পয়েন্ট’। কার্নিভাল ইন্টারনেট ছাড়াও ডটলাইন্স বাংলাদেশের আরও অনেকগুলো ব্র্যান্ড আছে। এর মধ্যে ইনস্যুরেন্স নিয়ে কাজ করছে কার্নিভাল এশিওর। প্রান্তিক অঞ্চলের মানুষের জন্য একদম সহজে এবং কম খরচে বীমা সুবিধা দেয় কার্নিভাল এশিওর। অনলাইনে পড়াশুনা এবং প্রফেশনাল কোর্স শিক্ষার্থীদের জন্য একদমই সুলভ মূল্যে পৌঁছে দিচ্ছে আমাদের ঘুড়ি লার্নিং নামক এডুকেশনাল প্ল্যাটফর্মটি। এছাড়া বাংলাদেশের  যেকোন জায়গায় সবধরনের পণ্য ডেলিভারি করার জন্য আমাদের আরেকটি ব্র্যান্ড কাজ করছে, ইকুরিয়ার। এবং ব্যবসায়ীদের পণ্যগুলোকে আরও সহজে অনলাইনে সবার কাছে নিয়ে যাওয়া এবং রেফার করার জন্য আমাদের একটি প্লাটফর্ম হচ্ছে লাট্টু। কার্নিভাল পয়েন্টে প্রাথমিকভাবে এই ব্র্যান্ডগুলোর সার্ভিস পাওয়া যাবে। ওয়াইফাই হাটগুলো কার্নিভাল পয়েন্ট হয়ে গেলে ওয়াইফাই কার্ড ছাড়াও বাকি ব্র্যান্ডগুলোর সার্ভিস পাওয়া যাবে। এতে করে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ব্যবসা আরও বৃদ্ধি পাবে।