ইন্দ্রমোহন রাজবংশী। আমাদের সংগীত জগতে শিল্পীস্বত্বার পাশাপাশি দেশপ্রেম, দেশের জন্য লড়ে যাওয়া বীর রয়েছেন বেশ ক’জন। তাদের ভেতরে অন্যতম বরেণ্য সংগীত ব্যক্তিত্ব ইন্দ্রমোহন রাজবংশী। করোনার থাবায় তাকেও আমরা হারালাম। পরিতাপের বিষয় হলো অন্যান্য শিল্পীদের মতো তারও নিজেস্ব গানের কোনো সংরক্ষিত নথি নেই। নেই জীবনীভিত্তিক ডকুমেন্টারি। এদেশের এতগুলো চ্যানেল থাকা স্বত্ত্বেও এই তথ্য খুবই লজ্জার। প্রয়াত এই বরেণ্যকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করেছেন তার কাছের ক’জন সহকর্মী। বিনোদন প্রতিদিন পাঠকদের কাছে তা তুলে ধরা হলো—
তপন চৌধুরী
প্রায় ৪০ বছর ধরে তাকে চিনি। প্রথম দেখা হয়েছিল সত্য দা’র (সংগীত পরিচালক সত্য সাহা) সঙ্গে স্টুডিওতে। এত জানা-শোনা মানুষ এবং নিভৃতচারী। মুশকিল হলো আমরা এসব মানুষকে গণমাধ্যমে খুব বেশি পাইনি। কারণ উনি সত্যিকার অর্থেই ছিলেন প্রচারবিমুখ। আমার সঙ্গে সর্বশেষ দেখা হলো চ্যানেল আইয়ের একটি অনুষ্ঠানে। পারস্পরিক কুশল বিনিময় হলো। খুবই স্বাভাবিক, সুস্থ। কে জানতো তার কিছুদিন বাদে তাকে নিয়ে আমাকে এভাবে স্মৃতিচারণ করতে হবে। জীবনকে সত্যিই এখন অচৈনা মনে হয়। তাই এখন যার সঙ্গে হঠাত্ দেখা হয়, বলি হয়তো এটাই শেষ দেখা। ক্ষমা করে দিও ভাই। প্রিয় শ্রদ্ধেয় ইন্দ্র দাকে এই কথাটি আর বলতে পারলাম না। আমাদের সকলের প্রার্থনা এই করোনার অভিশাপ থেকে মুক্ত করো প্রভু। সত্যিই আর এত শোক নিতে পারছি না!
সংগীতশিল্পী ফাহমিদা নবী
ইন্দ্রমোহন চাচার সঙ্গে আমার অসংখ্য সুখস্মৃতি জড়িয়ে আছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মনে পড়ছে শেষ ওনার একটি লোকগানের কাজ করেছিলাম। আমার সুরে প্রথম গেয়েছিলেন উনি। গানটি গাওয়ার পর উনি যখন বললেন, ‘মায়ের সুরে ছেলে গান গাইলো।’ তখন মনে হয়েছিল জীবনে অন্যরকম একটি অর্জন যোগ হলো। অনেক জ্ঞানী একজন মানুষ ছিলেন উনি। সহজেই মানুষকে আপন করে নিতেন। আর একটি অবাক করা দিক চাচার ছিল। সেটা হলো-ওনার দম অনেক বেশি ছিল। একদিন প্রশ্ন করেছিলাম চাচা এই বয়সে এত দম পান কোথায়? উনি হেসে বলেছিলেন, ‘তুইও চেষ্টা করলে পারবি।’ ওনার মতো প্রখ্যাত একজন শিল্পীর মুখ থেকে এমন কথা সত্যি অনেক অনুপ্রেরণার ছিল। সবাইকে ভালো উপদেশ দেওয়া, নিজেও সুন্দর করে চলার বিশেষ গুণ ছিল তার ভেতরে। এভাবে তিনি চলে যাবেন মানতে পারছি না। আল্লাহ তাকে জান্নাত দান করুন।
ফোকশিল্পী ফকির শাহাবুদ্দিন
ইন্দ্রমোহনের মতো একজন কিংবদন্তী চলে যাওয়া মানে বাংলা সংস্কৃতির বিরাট অংশ ধসে গেল। ওনার সঙ্গে আমার প্রায় ৩০ বছর ধরে সম্পর্ক ছিল। বড়ভাই-ছোটভাই সম্পর্ক ছিল আমাদের। উনি ফোকশিল্পীদের অনেক পছন্দ করতেন তিনি। ওনার সঙ্গে ৯০-এর দিকে গোপালগঞ্জ গিয়েছিলাম বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা জানাতে। একটা প্রোগ্রামও ছিল। ভাই সেদিন এতটাই আপন করে নিয়েছিলেন যে, সেই ভালোবাসা আবারো পাওয়ার আক্ষেপ তৈরি হলো। শেষজীবনে আমাদের দেশের গুণী শিল্পীদের অবমূল্যায়ন করা হয়। ভাইয়ের সঙ্গেও এমনটা করা হয়েছে। এটা সত্যি কষ্টের। ভাইয়ের আত্মার শান্তি কামনা করছি।
ফোকশিল্পী ফকির আলমগীর
যেদিন ইন্দ্রমোহন অসুস্থ হন সেদিনও সঙ্গে ছিলাম। খুব কষ্ট হচ্ছে এটা ভেবে যে, ইন্দ্রমোহনের মতো স্বাধীনবাংলা বেতার কেন্দ্রের কণ্ঠযোদ্ধা, বাংলা সংস্কৃতির ধারক, গবেষককে অবমূল্যায়ন করা হয়েছে। হাসপাতালে একটি আইসিইউ পর্যন্ত তাকে দেওয়া হয়নি! ভাই অনেক অভিমান-অবহেলায় শেষবিদায় নিলেন। ভাইকে নিয়ে এমন কষ্টের স্মৃতিচারণ করতে হবে কখনো ভাবিনি। তার সঙ্গে এত এত স্মৃতি যে বলে বোঝানো যাবে না। সেসময় বুদ্ধিজীবীদের অনেক সফর সঙ্গী হয়েছি আমি আর ভাই। এরমাঝে একটি স্মৃতির কথা ভাবলেই চোখ ভিজে যাচ্ছে। যেদিন বাংলাদেশ স্বাধীন হয় সেদিন ভারতের মেদিনীপুর মহিষাদলের একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে স্বাধীনবাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে আমি আর ভাই অংশ নিয়েছিলাম। অনুষ্ঠান শেষ হতেই যখন শুনলাম দেশ স্বাধীন হয়েছে তখন ভাইকে জড়িয়ে ধরে আনন্দ আর মিষ্টি বিলানোর স্মৃতিটি সারাজীবন কাঁদাবে। ভাইয়ের চোখ-মুখে যে আনন্দ দেখেছিলাম তা চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছে। ভাই হারানোর কষ্ট মানতে পারছি না। আল্লাহ ভাইকে ভেহেস্ত দান করুন।
সংগীতশিল্পী পলাশ
ইন্দ্রমোহন রাজবংশী দাদা আমার অনেক সিনিয়র ছিলেন। এটাকে সিনিয়র গণ্ডিতে আবদ্ধ রাখাও ঠিক হবে না। আত্মার আত্মীয় ছিলেন দাদা। ওনার সঙ্গে আমার পরিচয় ছিল ক্লাস সিক্সে পড়ার সময় থেকে। প্রতিবছর চ্যানেলের বর্ষপূর্তি বা যেকোনো অনুষ্ঠানে দেখা হলে উনি যেভাবে কথা বলতেন, মনে হতো এই গতকালই ওনার সঙ্গে দেখা হয়েছে। এতটই আপন করে নিতেন যা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। এই স্মৃতিটা সারাজীবন আমাকে ভাবাবে। আমি ব্যাকস্টেজে অনেককিছু পেয়েছি তার কাছ থেকে। ওনার প্রয়াণে আমাদের লোকগান, বাংলা গানের অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেল। আল্লাহ ওনাকে অনেক শান্তিতে রাখুক, এই প্রার্থনা করছি।
