বাংলায় ‘চাপা মাইর’ খাওয়া বলিতে একটি কথা প্রচলিত আছে। এই চাপা মাইর কথাটির নানা ধরনের ব্যবহার থাকিলেও প্রধানত বুঝানো হয়—মুখ খুলিয়া সত্য অথবা ন্যায্য কথা বলিতে না পারিয়া নিজের মধ্যে আত্মগ্লানিতে ভুগিতে থাকার বিষয়টিকে। এই চাপা মাইর সাংসারিক জীবনে, বন্ধু মহল হইতে শুরু করিয়া প্রশাসনিক কাজ করিতে গিয়াও অনেককে খাইতে হয়। তবে সামাজিক চাপা মাইর খাইলে তাহা হয়তো অন্যের ক্ষতির কারণ নাও হইতে পারে; কিন্তু প্রশাসনিক ক্ষেত্রে চাপা মাইর খাইবার কোনো সুযোগ নাই। উহা শুধু নিজের নহে, দেশ ও জাতির ক্ষতির কারণ হইয়া দাঁড়াইতে পারে; কিন্তু দুঃখের সহিত আমরা লক্ষ করি, প্রশাসনের কর্মকর্তারা তাহাদের দায়িত্ব পালন করিতে গিয়া এই চাপা মাইর হজম করিয়া থাকেন।
এই চাপা মাইর খাইবার কিছু কারণও থাকে। যিনি নিজেকে দৃঢ় রাখিতে পারেন না, যিনি নিজেকে বিক্রয় করিতে পছন্দ করেন, তিনিই দৃঢ়ভাবে কথাও বলিতে পারেন না। ফলে কপালে জোটে চাপা মাইর। কেবল নিজেকে, নিজের মেরুদণ্ডকে শক্ত রাখিতে পারিলে, শক্ত করিয়া যে কোনো বিষয়ে জবাব দেওয়া যায় অথবা সিদ্ধান্ত লওয়া যায়। আর এই নিজের মেরুদণ্ড শক্ত রাখিতে সর্বাগ্রে প্রয়োজন আত্মবিশ্বাস। তবে সেই আত্মবিশ্বাস এমনিতেই আসে না। এই প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক অ্যাসোসিয়েট অ্যাটর্নি জেনারেল এবং নিউ ইয়র্কের সাবেক মেয়র রুডি গুলিয়ানির একটি উক্তি খুবই প্রাসঙ্গিক। তিনি বলিয়াছেন—‘আপনার দৃঢ় ধারণা থাকিতে হইবে, আপনি কে। আমি জানি আমি কে। জনগণের সহিত বা কোনো কিছুর সহিত সম্পৃক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে আমি আমার জানামতে সত্ থাকিতে চেষ্টা করিয়াছি। ইহাই আমার শক্তি।’ তাহার এই বক্তব্যটি অবশ্যই মূল্যবান। একই কথা বলিয়াছিলেন গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিস। তিনি বলিয়াছিলেন—‘নো দাইসেল্্ফ।’ অর্থাত্ নিজেকে জানো। ইসলামের হাদিস গ্রন্থেও বলা আছে, ‘যে নিজেকে জানিল, সে তাহার রবকে জানিল।’ সুতরাং এই নিজেকে জানিতে পারিলেই আত্মবিশ্বাস জাগ্রত হইতে পারে।
অবশ্য অনেকে আবার ধন্দে পড়িয়াও চাপা মাইর খাইয়া থাকেন। আমরা অনেক ক্ষেত্রেই দেখিয়া থাকি, উচিত কর্মটি করিতে গিয়া একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি করিতে পারেন না। তিনি জুজুর ভয় পান; কিন্তু জানেনই না যেই জুজুর ভয় তিনি পাইতেছেন, তাহার আদৌ অস্তিত্ব আছে কি না। তবে যাহারা চাপা এই মাইর খান তাহারা সর্বদাই যে জুজুর ভয়ে খান তাহা নহে। নিজেরাও একরকম স্বইচ্ছায় চাপা মাইর খাইয়া থাকেন। কখনো কখনো বদলির ভয়, আর্থিকভাবে লাভবান হইবার লোভ অথবা সামান্য সুবিধা লাভের ইচ্ছা তাহাদের সত্য বলিতে দেয় না। আমরা আশা করি, আমরা প্রত্যেকেই নিজেকে জানিব, আত্মবিশ্বাসের সহিত অর্পিত দায়িত্ব পালন করিব যাহাতে চাপা মাইর খাইতে না হয়। ইহাতে জুজুর ভয়ও থাকিবে না। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আশা করিয়াছিলেন, ‘ভারতবর্ষ তার আপন মনকে জানুক এবং আধুনিক সকল লাঞ্ছনা থেকে উদ্ধার লাভ করুক।’ আমরাও তাহার কণ্ঠে কণ্ঠ মিলাইয়া বলিতে পারি, দেশের সকল পেশাজীবী তাহাদের মনকে জানুক। তাহাতেই অনেকটা নিষ্কণ্টক হইবে আমাদের কর্তব্য কাজ।
