গত একযুগে সারা দেশে ডজনখানেক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিসহ বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয়েছে। ভবিষ্যতে এ সংখ্যা আরো বাড়বে। বাড়বে লোকবল। তবে, সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর হচ্ছে— কারা শিক্ষাদান করবেন এ সব প্রতিষ্ঠানে। শিক্ষকদের শিক্ষাগত যোগ্যতাসহ অন্যান্য মানদণ্ড কী হবে? কারণ, নতুন শিক্ষকদের মাধ্যমে হাতেখড়ি হবে হাজার হাজার শিক্ষার্থীর। উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হবেন তারা। কিন্তু আমাদের দেশের উচ্চ শিক্ষার কী অবস্থা তা কেউ ভেবেছেন একবারও। উচ্চ শিক্ষার বর্তমান অবস্থা নিয়ে আমি শঙ্কিত।
উচ্চ শিক্ষার মানোন্নয়নে এই মুহূর্তে বাস্তব ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে ভয়াবহ অন্ধকারে নিমজ্জিত হবে এ জাতি। আমি দীর্ঘদিন ধরে এ বিষয়ে কথা বলে আসছি, জানি না কতটুকু আমলে নিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। বাংলাদেশে উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে পুঞ্জীভূত বিরাজমান যে সমস্যা তা দ্রুত সমাধান করা দরকার। আমি দারুণভাবে প্রত্যাশা করছি, উচ্চ শিক্ষার মানোন্নয়নে নবগঠিত বাংলাদেশ এ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিলকে (বি.এ.সি) কর্মময় ও সক্রিয় করতে কর্তৃপক্ষ অবশ্যই দ্রুত এগিয়ে আসবেন। কারণ শিক্ষার মানোন্নয়ন, গবেষণা ও সিলেবাস কারিকুলাম ডেভেলপমেন্টে এখনই হাত না দিলে ভবিষ্যতে এর দায় আমাদের নিতে হবে।
আমাদের দেশের উচ্চ শিক্ষার মান নিয়ে বিশ্বের অনেক দেশে প্রশ্ন আছে। দিনকে দিন সার্টিফিকেট মূল্যায়নে পিছিয়ে পড়ছি আমরা। এর মূল কারণ হলো গবেষণাহীন সেকেলে শিক্ষা, অগভীর ও অগোছালো শিক্ষা পদ্ধতি। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের তথ্যমতে, উচ্চশিক্ষার মানের দিক থেকে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে নিচে অবস্থান করছে বাংলাদেশ। আর বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে উচ্চশিক্ষার মানের দিক দিয়ে ১৩৬টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৮৪তম। এ ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে ভারত। বৈশ্বিক অবস্থানে ভারত ২৯তম। বাকি দেশগুলোর মধ্যে শ্রীলংকা ৪০, পাকিস্তান ৭১ ও নেপালের অবস্থান ৭৭তম। এটি সত্যিই উদ্বেগজনক চিত্র।
ব্যানবেইস-এর তথ্যমতে, উচ্চ শিক্ষায় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন কলেজগুলোতে আসন সংখ্যা প্রায় সাড়ে ছয় লাখের সামান্য বেশি। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আসন রয়েছে ৫৩ হাজার ২শ টি প্রায়। আর প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে ৩ লাখ ২৭ হাজার প্রায়। এর বাইরে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে বেশকিছু আসন রয়েছে। আমরা প্রায়ই দেখি দেশে হাজার হাজার শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষিত হওয়ার পরও বেকার হয়ে চাকরির জন্য ঘুরছে। এর মূল কারণ হলো মানহীন শিক্ষায় শিক্ষিত তাঁরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমনও দেখা গেছে, ১৯৭৭ সালের জনৈক শিক্ষার্থীর হ্যান্ড নোট নীলক্ষেত থেকে ফটোকপি করে পড়ছে ২০১৯ সালের শিক্ষার্থীরা। সেই নোট তোতা পাখির মতো ঠোঁটস্থ করে যাচ্ছে তারা। পাস করছে তারা, কিন্তু মেধাহীনভাবে। এখনও চার পাঁচ দশক আগের সিলেবাসে চলছে বেশ কিছু ডিপার্টমেন্ট। গবেষণার ধারেকাছেও নেই এগুলো। এ হলো আমাদের উচ্চ শিক্ষার একাংশের চিত্র। বিশ্ববিদ্যালয় কলেজগুলোর অবস্থা আরো ভয়াবহ।
দেশের প্রায় ৯০ ভাগ কলেজে এইচএসসি ও অনার্স-মাস্টার্স একই প্রতিষ্ঠানে পড়ানো হয়। এটি একটি অসঙ্গত ব্যাপার এই কারণে যে, একজন শিক্ষক এইচএসসি এবং অনার্স দুই লেবেলে পড়াচ্ছেন। এটা হতে পারে না। দুই লেভেলকে আলাদা করতে হবে আগে। প্রভাষক ও অধ্যাপক এই দুইকে এক করে ফেলছে আমাদের অদক্ষ সিস্টেম।
শিক্ষক নিবন্ধন পদ্ধতি আরো স্পষ্ট, যৌক্তিক, আধুনিক করতে হবে। সৃষ্টিশীল প্রশ্ন দ্বারা তাদের জর্জরিত করতে হবে। এতে করে বোঝা যাবে, বিষয়ভিত্তিক পড়াশোনায় তিনি কতটা চিন্তাশীল। শিক্ষকদের বেতন কাঠামো আরো উন্নত করতে হবে, যাতে মেধাবী শিক্ষার্থীরা শিক্ষকতা পেশায় আগ্রহী হন। আমরা যদি মানসম্মত শিক্ষক দিতে না পারি, তাহলে মানসম্মত শিক্ষা কখনোই দিতে পারব না। সে জন্য শিক্ষক নির্বাচনে সতর্ক হতে হবে, শিক্ষা ব্যয় বাড়াতে হবে, নিয়োগ পরীক্ষা সুষ্ঠু হতে হবে। আশার কথা হলো, এবার নির্বাচনী ইশতেহারে আওয়ামী লীগ শিক্ষাখাতে জিডিপি’র ৫ শতাংশ ব্যয় করবে বলে অঙ্গীকার করেছে। অতীতে ইউনেস্কোর সুপারিশ ছিল এ খাতে ৪ শতাংশ ব্যয়ের। বর্তমানে শিক্ষাখাতে ব্যয় হচ্ছে মাত্র ২ শতাংশ।
উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নে আরো একটি বড় বাধা শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতার অভাব। প্রথমে আমাদের নিয়োগ প্রক্রিয়াটির দিকে নজর দিতে হবে। অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় স্বজনপ্রীতি ও দলীয় চাপে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে অযোগ্য শিক্ষকদের। অনেক জায়গায় অর্থের বিনিময়ে নিয়োগ হয়, এমনটাও শুনেছি। উন্নত বিশ্বের কোথাও এমনটি হয় বলে আমার জানা নেই। আরো অবাক করার বিষয় হচ্ছে, মাত্র ৫-১০ মিনিট একটা ভাইভা নিয়েই নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষকদের। সময় পাল্টে গেছে, তাই এখন অনেক কিছু খতিয়ে দেখতে হবে। শিক্ষার্থীর একাডেমিক পুরো রেকর্ড ও ক্লাস রুম পারফরমেন্স দেখতে হবে এবং তার গবেষণাপত্রগুলো মানসম্মত কী না তা যাচাই করতে হবে। এ সমস্ত বিষয় দেখে সুস্পষ্ট, বিধিবদ্ধ নিয়মে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া উচিত। শুধু শিক্ষক নিয়োগ নয়, তাদের পদোন্নতির ক্ষেত্রেও স্পষ্টতা থাকা খুব জরুরি। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পদোন্নতির প্রত্যেক ধাপে ‘ওয়ব অব সাইন্স’ ‘স্কোপাস’-এ ইনডেস্ক করা আছে এমন জার্নালে অন্তত একটি করে প্রকাশিত আর্টিকেল থাকা বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে।
অনেকেই ভাইভা বোর্ডে অসংখ্য গবেষণা দেখিয়ে পদোন্নতি পান কিন্তু একটু সময় নিয়ে দেখলে বোঝা যাবে তা কতটুকু মানসম্পন্ন। যে সমস্ত জার্নালের ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর জিরো, কেউ পড়ে না, সাইটেশন নেই, এইচ ফ্যাক্টর বা এন ফ্যাক্টর ঠিক নেই, সেই সমস্ত বিষয়গুলোর দিকে আমাদের নজর দিতে হবে। ইন্টারনেটে সার্চ ইঞ্জিনগুলোতে জার্নাল কতখানি এভেইলএ্যাবল তা দেখতে হবে। অনেক জার্নাল প্ল্যাজারিজম চেক করে না। এ ক্ষেত্রে প্রত্যেকটা প্রবন্ধ প্রকাশের পূর্বে প্ল্যাজারিজম চেক বাধ্যতামূলক করা দরকার। কেউ মিশেল ফুকোর লেখা কপি করলে সেটা যুক্তরাষ্ট্র থেকে মেইল দিয়ে জানাতে হবে কেন? এটা মানসম্মত জার্নালে তো প্রকাশ-ই হওয়ার কথা না। এক্ষেত্রে সার্বিক পর্যবেক্ষণ ও উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নে সদ্য গঠিত বাংলাদেশ এ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিলকে সক্রিয় করার বিকল্প নেই। শিক্ষার মানোন্নয়নে বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে শিক্ষা বিষয়ক কাউন্সিল থাকলেও বাংলাদেশে এখনও অধরাই এ পরিকল্পনা।
শুধু মাস্টার্স পাস করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়েছেন, এমন নজির বিশ্বে বিরল। এমফিল, পিএইডি ও গবেষণায় অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। বর্তমানে যে প্রক্রিয়ায় বা পরীক্ষায় শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে তা উন্নত বিশ্বে অচল। আশির দশকের বিধি-নিয়মের আওতায় এখনও নিয়োগ দেওয়া হয়। যার কারণে মেধা যাচাই, সক্ষমতা নিরূপণ করা সম্ভব হচ্ছে না। গবেষণায় দক্ষতা বাড়াতে হবে। এগুলোর পাশাপাশি সরকারি, বে-সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অবকাঠামো সুবিধা, কারিকুলাম ডেভেলপমেন্ট, সিলেবাস, ফ্রেমওয়ার্ক দেখতে হবে। বছর শেষে শিক্ষককে মূল্যায়নের সংস্কৃতি চালু করতে হবে। কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে এ সংস্কৃতি চালু থাকলেও তা সার্বজনীন নয়।
আন্তর্জাতিক মানের প্রোগ্রামকে বিবেচনায় রেখে পড়াতে হবে। একজন শিক্ষার্থী এসব বিষয় কেন পড়বে, পড়ে কী অর্জন করবে, বিষয়ভিত্তিক কী পরিবর্তন আসবে ইত্যাদির দিকে দৃষ্টি দিতে হবে। মানহীন উচ্চ শিক্ষা নামের পাগলা ঘোড়ার লাগাম এখনই টেনে না ধরলে এর নেতিবাচক প্রভাব গ্রাস করে ফেলবে আগামী প্রজন্মকে। পরে এ খাতে যতই বাজেট বাড়ানো হোক না কেন, তা আর কোনো কাজেই তা আসবে না। তাই এখনই সময় উচ্চ শিক্ষার মানোন্নয়ন ও গবেষণার উপর তীক্ষ দৃষ্টি দেবার।
n লেখক: অধ্যাপক, গবেষক
