‘এ যেন প্রকৃতির প্রতিশোধ’

আপডেট : ০৮ এপ্রিল ২০২১, ২১:৩১

বিশ্ব সভ্যতার যতই উন্নতি হচ্ছে ততই প্রকৃতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। যতই বিশ্ব আধুনিকায়ন হচ্ছে ততই প্রকৃতি তার নিজস্বতা হারাচ্ছে। প্রতিদিনই আমরা বন উজাড় করছি। নির্বিচারে গাছ কাটছি। অরণ্য ধ্বংস করছি নিত্য। শুধুই কি অরণ্য? সঙ্গে পশু-পাখি যা আছে—সব শিকার করছি। আর নিজেদের উদর ভর্তি করছি। মানুষ রাক্ষসের চেয়ে কম না। সর্বভুক। সব খাচ্ছে নির্বিচারে। সাপ থেকে শুরু করে পোকামাকড় পর্যন্ত—একটাও বাদ দিচ্ছে না। (অবশ্য জাতি ভেদে) সব কিছুর একটা সীমা থাকা দরকার। সীমা লঙ্ঘন করলেই বিপদ; কিন্তু আমরা বিপদকে বিপদ মনে করছি না, ভাবছি না শেষ পরিণতির কথা। আর ভাবছি না বলেই আজ মহাসংকট এসে উপস্থিত হয়েছে। এই সংকট আমি, আপনি—সবার। পুরো বিশ্বের। এই বিপদ থেকে শিক্ষা না নিলে আরো ঘোর বিপদ এসে বিশ্বের সম্মুখে দাঁড়াবে। সেইদিন আর দূরে নয়, অতি সন্নিকটে।

আমরা কত কত বিস্ময়কর আবিষ্কার করছি, তার ইয়ত্তা নেই; কিন্তু আমরা একটা ওষুধ বানাতে পারছি না। এর থেকে বুঝা যায়, এই বিশ্ব চিকিত্সাবিজ্ঞানে কত পিছিয়ে! আজ করোনা সবাইকে গিলে খাচ্ছে। রোজ হাজার হাজার মানুষ পৃথিবী থেকে বিয়োগ হচ্ছে। এখন পুরো বিশ্বের চিকিত্সাবিজ্ঞানীরা এক হয়ে কাজ করার সময়।

আসলে এটা প্রকৃতির প্রতিশোধ। রোজ আমরা বায়ুদূষণ করছি, কলকারখানার বর্জ্য নদী-সাগরে ফেলে পানিদূষণ করছি, মাটিতে প্লাস্টিক ফেলে মাটিদূষণ করছি। মেশিনারি, গাড়ি বা যানবাহনের বিকট শব্দে শব্দদূষণ করছি। ফলে প্রকৃতিতে পড়ছে বিরূপ ছায়া। যার ফলে অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, বন্যা, খরা, জলোচ্ছ্বাস, ভূমিকম্প, সুনামি, ঘূর্ণিঝড়—সর্বোপুরি বিভিন্ন রোগের পাদুর্ভাব, মহামারি হয়ে দেখা দিয়েছে কাল থেকে কালে। বন উজাড়ের ফলে খরার সৃষ্টি হচ্ছে। পশু-পাখি তার আবাসস্থল হারাচ্ছে। নানারকম পশু-পাখি বিলুপ্তি হয়ে যাচ্ছে। ফলে পরিবেশ নিয়ত ভারসাম্য হারাচ্ছে। পানিদূষণের ফলে জলাশয়ে আজ আর আগের মতো মাছ নেই। জলজ প্রাণীরাও হুমকির মুখে। যানবাহনের বিকট শব্দে রোজ কোটি কোটি মানুষের কানের সমস্যা থেকে শুরু করে উচ্চ রক্তচাপ, মাথাব্যথা, হার্টের সমস্যা দিনে দিনে প্রকট হচ্ছে। আর বিকট শব্দে বিভিন্ন পশু-পাখি ভয়ে দূরে সরে যাচ্ছে। কিংবা বিলুপ্তির পথে। আমরা রোজ নির্বিচারে বালি উত্তোলন, পাথর উত্তোলন, কয়লা উত্তোলন ও পাহাড় কেটে ভূমির বারোটা বাজাচ্ছি। যার ফলে ভূমিকম্পের মাত্রা বেড়ে যাচ্ছে আর সুনামি হাত বাড়িয়ে ডাকছে। তাহলে দেখুন আমরাই আমাদের সুখের জন্য, বেশি আরামের জন্য, বেশি লোভের জন্য প্রকৃতিকে রোজ আঘাত করছি। যার ফলে প্রকৃতিও আজ আমাদের বিরুদ্ধে চলে গেছে।

একটু খেয়াল করে দেখুন, যে পশু-পাখিকে আমরা খাঁচায় বন্দি করে রেখে চিড়িয়াখানা নামক খাঁচা বানিয়ে তাদের সেখানে ভরে অর্থ উপার্জন করি, সেই পশু-পাখি কিন্তু আজ বাইরে। মুক্ত আকাশে উড়ে বেড়াচ্ছে। আর আমরা বন্দি। আমার রুমের সামনের বেলকনিতে এই লকডাউনে রোজ একঝাঁক চড়ুই এসে কিচিরমিচির করে চলে যায়, আবার আসে। আর আমি বন্দি খাঁচার ভেতর থেকে পাখির নাচন দেখি, ওড়াউড়ি দেখি। মাঝেমধ্যে মনে হয়, পাখিগুলো বোধহয় আমাকে লজ্জা দিতে আসে। মনে মনে যেন তারা বলে, দেখ কেমন লাগে বন্দি থাকতে। এতদিন যে আমাদের বন্দি করে রেখেছিস কিংবা দেখলেই গুলি মারিস। এখন দেখ আমরা স্বাধীন, আমরা মুক্ত আর তোরা মানুষরা বন্দি! আমার মনে হয় পাখিরাও আজ আমাদের উপহাস করছে।

আমাদের নিষ্ঠুরতার জন্য করোনা অভিশাপ হয়েই মানবকুলে নেমেছে ধ্বংস করতে। আমাদের এবার সতর্ক হতে হবে। প্রকৃতির ওপর। যতই আমরা প্রকৃতিপ্রেমী হব ততই দেশের কল্যাণ হবে। দেশ, বিশ্ব ফুলে ফলে, পশু-পাখিতে ভরে উঠবে। অক্সিজেন নির্মল হবে। কার্বন ডাইঅক্সাইডের পরিমাণ কমবে। প্রকৃতি দূষণমুক্ত হলে আমরাই নিরোগ থাকব। তাই প্রকৃতিকে ভালোবাসতে হবে। পশু-পাখিকে নিজের করে রাখতে হবে। পুরো বিশ্বকে পশু-পাখির জন্য অভয়ারণ্য করে গড়ে তুলতে হবে। নদী, সাগর দূষণ থেকে মুক্ত রাখতে হবে।

আমরা একটু খেয়াল করলেই দেখতে পাব লকডাউনের তৃতীয় দিনে বাংলাদেশের কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত জনশূন্য হওয়ায়, দূষণমুক্ত হওয়ায় শত শত ডলফিন তীরে এসে খেলা করছে। কেননা পানি পরিষ্কার হওয়ায় ডলফিনরা ফিরে এসেছে তীরে। চলুন এই লকডাউন থেকে শিক্ষা নিয়ে কমপক্ষে মাসে দুই দিন পুরো বিশ্ব লকডাউন করি। প্রতি মাসের ১৫ তারিখ একবার, ৩০ তারিখ একবার। তাহলেই অন্তত পরিবেশ-প্রকৃতি একটু হাফ ছেড়ে বাঁচবে। আসুন পরিবেশ বাঁচাই, বিশ্ব বাঁচাই। নির্মল অক্সিজেনে ভরে উঠুক এই পৃথিবী। এই বসুধায় নেমে আসুক সহস্র কোটি বছরের জন্য বসন্ত।

n লেখক: শিক্ষক