ডিজিটাল যুগে মানবতা ও মানবিকতার সংকট

আপডেট : ১০ জুলাই ২০২৬, ২০:০৮

প্রযুক্তির এই যুগে আমরা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি সংযুক্ত। পৃথিবীর এক প্রান্তে বসে অন্য প্রান্তের মানুষের সঙ্গে মুহূর্তেই যোগাযোগ করা যায়। জ্ঞান, শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা, গবেষণা ও প্রশাসন—সব ক্ষেত্রেই ডিজিটাল প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে সহজ করেছে। কিন্তু এই অগ্রগতির পাশাপাশি একটি নীরব সংকটও দিন দিন গভীর হচ্ছে। সেটি হলো মানবতা ও মানবিকতার সংকট। প্রযুক্তি যত এগোচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রে মানুষ যেন ততই মানুষ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।

আজ অনেকের দিন শুরু হয় মোবাইল ফোন দিয়ে, আবার শেষও হয় সেই মোবাইলের স্ক্রিনে চোখ রেখে। পরিবারের সদস্যরা একই ঘরে বসে থাকলেও একজন আরেকজনের সঙ্গে কথা বলার পরিবর্তে ব্যস্ত থাকেন নিজের ভার্চুয়াল জগতে। একসময় বিকেলে শিশুরা মাঠে খেলত, প্রতিবেশীরা একসঙ্গে বসে গল্প করত, আত্মীয়-স্বজনের খোঁজ নেওয়া ছিল একটি সামাজিক দায়িত্ব। এখন সেই জায়গা দখল করেছে স্ক্রিন, নোটিফিকেশন, রিলস ও শর্ট ভিডিও। প্রযুক্তি আমাদের কাছে এনেছে, কিন্তু হৃদয়ের দূরত্বও অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আজ তথ্য আদান-প্রদানের অন্যতম বড় মাধ্যম। কিন্তু দুঃখজনকভাবে এখানে সত্যের চেয়ে মিথ্যা অনেক দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। একটি গুজব, একটি সম্পাদিত ছবি কিংবা একটি বিভ্রান্তিকর ভিডিও কয়েক মিনিটের মধ্যে লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। অধিকাংশ মানুষ সত্যতা যাচাই না করেই তা বিশ্বাস করেন, মন্তব্য করেন এবং অন্যদের কাছে পাঠিয়ে দেন। ফলে নিরপরাধ মানুষ সামাজিকভাবে অপমানিত হন, পরিবার ভেঙে যায়, ব্যক্তির সম্মান নষ্ট হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও বিঘ্নিত হয়।

আজকাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মত প্রকাশের স্বাধীনতা অনেক সময় দায়িত্বহীনতায় পরিণত হয়েছে। ভিন্ন মত দেখলেই ব্যক্তিগত আক্রমণ, কটূক্তি, বিদ্বেষপূর্ণ ভাষা এবং অশালীন মন্তব্য যেন স্বাভাবিক আচরণে পরিণত হয়েছে। যুক্তির পরিবর্তে গালাগাল, তথ্যের পরিবর্তে আবেগ এবং শালীনতার পরিবর্তে বিদ্বেষ—এসবই এখন অনেক ক্ষেত্রে ডিজিটাল সংস্কৃতির অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ মতের ভিন্নতা গণতান্ত্রিক সমাজের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য; ভিন্নমতকে সম্মান করাই সভ্যতার পরিচয়।

আরেকটি উদ্বেগজনক প্রবণতা হলো 'ভাইরাল' হওয়ার অদম্য আকাঙ্ক্ষা। একসময় মানুষ সম্মান অর্জন করত জ্ঞান, সততা, পরিশ্রম ও সৃজনশীলতার মাধ্যমে। এখন অনেকেই কয়েক মিনিটের জনপ্রিয়তার জন্য এমন কাজ করেন, যা সমাজের জন্য ক্ষতিকর। কেউ অশালীন ভিডিও তৈরি করেন, কেউ মিথ্যা নাটক সাজান, কেউ অন্যকে অপমান করে আলোচনায় আসতে চান। জনপ্রিয়তার এই অসুস্থ প্রতিযোগিতা তরুণদের একটি অংশকে ভুল পথে পরিচালিত করছে।

এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির অপব্যবহার। এআই মানবজাতির জন্য একটি যুগান্তকারী আবিষ্কার। চিকিৎসা, শিক্ষা, গবেষণা, কৃষি, শিল্প, নিরাপত্তা ও প্রশাসনে এর অসাধারণ সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু একই প্রযুক্তি যখন অসৎ উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়, তখন তা ভয়াবহ ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

বর্তমানে অত্যন্ত সহজে কারও মুখ অন্য ছবিতে বসিয়ে ভুয়া ছবি তৈরি করা যায়। কারও কণ্ঠস্বর নকল করে মিথ্যা অডিও বানানো যায়। এমনকি এমন ভিডিও তৈরি করা সম্ভব, যা দেখে সাধারণ মানুষের পক্ষে সত্য-মিথ্যা আলাদা করা কঠিন। এই ডিপফেইক প্রযুক্তি ব্যক্তি, সমাজ এবং রাষ্ট্র—সব ক্ষেত্রেই নতুন ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করছে।

সবচেয়ে আশঙ্কার বিষয় হলো, আমরা যাচাইয়ের চেয়ে শেয়ার করতে বেশি আগ্রহী। একটি পোস্ট সত্য কি না, সেটি জানার আগেই আমরা সেটি ছড়িয়ে দিই। ফলে মিথ্যা তথ্য মুহূর্তেই সত্যের রূপ ধারণ করে। একটি ক্লিক কখনও কখনও একজন মানুষের বহু বছরের অর্জিত সম্মান ধ্বংস করে দিতে পারে। অথচ সেই ক্ষতির দায় কেউ নিতে চায় না।

মানবিকতার সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো অন্যের কষ্ট অনুভব করার ক্ষমতা। কিন্তু ডিজিটাল যুগে আমরা ধীরে ধীরে সেই অনুভূতিটাই হারিয়ে ফেলছি। সড়ক দুর্ঘটনায় আহত একজন মানুষকে হাসপাতালে নেওয়ার আগে অনেকে ভিডিও ধারণ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। বিপদগ্রস্ত মানুষকে সাহায্য করার পরিবর্তে ঘটনাটি 'লাইভ' করার প্রবণতা আমাদের সামাজিক মূল্যবোধের জন্য উদ্বেগজনক। মানুষের জীবন নয়, যেন ভিডিওর ভিউ-সংখ্যাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

আজ আমরা জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের চেয়ে অনেক বেশি সময় ব্যয় করি তুচ্ছ বিষয় নিয়ে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশ, জলবায়ু পরিবর্তন, কর্মসংস্থান কিংবা সড়ক নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু অনেক সময় উপেক্ষিত থাকে। অথচ কোনো তারকার ব্যক্তিগত জীবন, পোশাক বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি পোস্ট নিয়ে দিনের পর দিন আলোচনা চলে। এটি শুধু সময়ের অপচয় নয়, আমাদের সামাজিক অগ্রাধিকারেরও অবক্ষয়।

তরুণ প্রজন্ম আমাদের ভবিষ্যৎ। কিন্তু তাদের একটি অংশ ভার্চুয়াল স্বীকৃতির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। লাইক, কমেন্ট ও শেয়ার যেন আত্মবিশ্বাসের মানদণ্ডে পরিণত হয়েছে। বাস্তব জীবনের বন্ধুত্ব, পারিবারিক সম্পর্ক, বই পড়া, খেলাধুলা এবং সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের পরিবর্তে তারা অনেক সময় ভার্চুয়াল পরিচিতির পেছনে ছুটছে। এটি দীর্ঘমেয়াদে মানসিক স্বাস্থ্য ও সামাজিক বিকাশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।

তবে প্রযুক্তিকে দোষ দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। প্রযুক্তি নিজে ভালো বা খারাপ নয়; এর ব্যবহারই তাকে কল্যাণকর অথবা ক্ষতিকর করে তোলে। তাই আমাদের প্রয়োজন প্রযুক্তির পাশাপাশি নৈতিক শিক্ষা, ডিজিটাল সচেতনতা এবং মানবিক মূল্যবোধের চর্চা।

পরিবারকে শিশুদের শুধু স্মার্টফোন ব্যবহার শেখালেই হবে না; শেখাতে হবে সত্য-মিথ্যা যাচাই করা, অন্যকে সম্মান করা এবং অনলাইনে দায়িত্বশীল আচরণ করা।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ডিজিটাল সাক্ষরতা, মিডিয়া লিটারেসি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নৈতিক ব্যবহার সম্পর্কে শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা সময়ের দাবি। রাষ্ট্র, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম এবং নাগরিক সমাজকেও একযোগে কাজ করতে হবে যাতে সাইবার অপরাধ, গুজব ও ডিপফেইকের মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা যায়।

আমাদের প্রত্যেকেরই কিছু ব্যক্তিগত দায়িত্ব রয়েছে। কোনো তথ্য যাচাই না করে শেয়ার করব না। অন্যের সম্মান ক্ষুণ্ন হয়—এমন কোনো মন্তব্য বা ছবি প্রচার করব না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে বিদ্বেষ ছড়ানোর নয়, জ্ঞান, সচেতনতা ও মানবিকতা ছড়ানোর মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করব।

সবশেষে একটি কথাই বলতে চাই—প্রযুক্তির উন্নতি তখনই অর্থবহ হবে, যখন তার সঙ্গে মানবিকতার বিকাশ ঘটবে। আমরা যদি মানুষকে ভুলে শুধু যন্ত্রকে ভালোবাসি, তাহলে প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক, সমাজ কখনো উন্নত হবে না। একটি সভ্য জাতি গড়তে হলে আধুনিক প্রযুক্তির পাশাপাশি সত্য, সহমর্মিতা, সহনশীলতা এবং মানবিক মূল্যবোধকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

ডিজিটাল যুগ আমাদের অসংখ্য সুযোগ এনে দিয়েছে। এখন সিদ্ধান্ত আমাদের—আমরা কি প্রযুক্তিকে মানবকল্যাণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করব, নাকি অপপ্রচার, বিদ্বেষ ও বিভাজনের অস্ত্রে পরিণত করব? এই প্রশ্নের উত্তরই আগামী দিনের সমাজকে নির্ধারণ করবে। তাই আসুন, আমরা সবাই মিলে এমন একটি ডিজিটাল সমাজ গড়ে তুলি, যেখানে ভাইরালের চেয়ে সত্যের মূল্য বেশি, ঘৃণার চেয়ে ভালোবাসা শক্তিশালী এবং প্রযুক্তির চেয়ে মানুষ বড়।

লেখক: অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার, সিআইডি, ঢাকা

ইত্তেফাক/এটিএন