এদেশে যে ক’জন নাটক নির্মাণকে পেশা বা অর্থ উপার্জনের মাধ্যমের বাইরে নেশা বা ভালোবাসার জায়গায় রেখে কাজ করেন তাদের ভেতরে সকাল আহমেদ অন্যতম। নাটক নির্মাণের বর্তমান শর্টকাট মাধ্যমের যুগের নির্মাতা নন তিনি। তাই এই মাধ্যমের অবকাঠামো নিয়ে দারুণ কিছু কথা বললেন নিজের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা থেকে। সাক্ষাত্কার নিয়েছেন এ এম রুবেল
বর্তমান কাজ প্রসঙ্গে জানতে চাই—
আসন্ন ঈদকে কেন্দ্র করে এরইমধ্যে আবুল হায়াত, মোশাররফ, চঞ্চল চৌধুরী, জোভানসহ বেশ কয়েকজন আর্টিস্টকে নিয়ে অনেকগুলো নাটক, সিরিয়াল শেষ করলাম। গতকাল থেকে মিলনকে নিয়ে একটি কাজ শুরু করেছি।
করোনার প্রভাবে নাট্যাঙ্গন অনেকটাই কাবু। ঈদ নাটকের ভবিষ্যত্ কোনদিকে যাচ্ছে বলে মনে করছেন?
আমার দিক থেকে বলবো, আমার নাটকে কোনো প্রভাব পড়বে না। আমি অনেক আগে থেকেই কাজ শুরু করেছিলাম। বেশকিছু কাজ শেষ করেছি। তাছাড়া অন্যরাও শুটিংয়ের অনুমতি পাওয়ার পর থেকেই কাজ করছেন। প্রতিবছর রোজার শেষদিক পর্যন্ত কাজ করেন সবাই। কিন্তু নতুন করে করোনা বাড়ায় একটু প্রভাব পড়বেই। তবে গতবছরের মতো সবগুলেই প্রায় পুরনো কাজ অনএয়ার করা লাগবে না।
করোনার ঝুঁকির নিয়ে অনেকেই শুটিং করছেন। বিষয়টি কীভাবে দেখছেন?
দেখুন, করোনাকে মেনে নিয়ে অনেকেই কাজ করছেন, এটা খুবই রিস্কি। একটি নাটকের শুটিং মানে ২০-২৫ জন মানুষের একত্রে কাজ। একজন সংক্রমিত হলে সকলেরই ঝুঁকি থাকে। সাবধানতা অবলম্বন করে কাজ করলেও সেটা কতটা ফলপ্রসু হবে সেই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। এ অবস্থায় শুটিং বন্ধ রাখাই উচিত বলে মনে হয়।
জনশ্রুত আছে নির্মাতা বা প্রযোজকরা নিজেস্ব ঘরানার শিল্পীদের ছাড়া কাজ করেন না। এতে নতুনদের পথ রোধ হচ্ছে বলে মনে করছেন না?
একটা সময় বলা হতো পরিচালকরা জাহাজের চালকদের মতো। কিন্তু আমাদের ইন্ডাস্ট্রিতে শিল্পীরাই চালক! তারা যেভাবে চালাচ্ছেন সেভাবেই চলতে হচ্ছে। তাছাড়া প্রডিউসাররাও তাদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলছেন। কিন্তু সেই নাটকগুলোতে কতটা গল্প বলা হচ্ছে সেটা ভাবার বিষয়।
এক শ্রেণির আর্টিস্টদের পকেটে বাজেটের বেশিরভাগ টাকা চলে যাচ্ছে। বাকিদের বেকার বলা চলে। এ বিষয়ে কী বলবেন?
এটা আগে থেকেই ছিল। আমার মনে হয় এটা ঠিকই আছে। কারণ এই আর্টিস্টদের কারণেই কিন্তু বাজেট বেড়েছে। নতুন কাউকে নিয়ে কাজ করলে তো সেই বাজেট পাওয়া যায় না। তাছাড়া নিজেদের ঘরানার ছোট বা নতুন শিল্পীদের নেওয়া হয় বলে তাদের আয় বা কাজের পরিধি সীমিতই থাকছে।
নাটকে চরিত্র সংকট দিনদিন বাড়ছে। এতে একটি ভালো গল্প সঠিকভাবে তুলে ধরা কতটা সম্ভব হচ্ছে বলে মনে করেন?
বাজেট যদি কম হয় তাহলে একজন পরিচালক গল্প ঠিকভাবে তুলে ধরবেন কীভাবে! বাজেটের কারণে কম সময় ও কম আর্টিস্ট নিয়ে কাজ করতে হয়। তাড়াহুড়ো করে কাজ করলে তো গল্প সঠিকভাবে তুলে ধরতে সমস্যা একটু হবেই।
নাটক এখন বাণজ্যিক মাধ্যমে পরিণত হয়েছে। এর থেকে পরিত্রাণের উপায় হিসেবে কী বলবেন?
এই বাণিজ্য কিন্তু অডিওর যুগ থেকেই ইন্ডাস্ট্রিতে আছে। আগ যারা ফিতা বিক্রি করতো তারা এখন নাটক বাণিজ্য করছে। একজন আর্টিস্টের অ্যাকাউন্টে ১০-১৫ লাখ টাকা অগ্রীম দিয়ে বলছে আমার কাজ করবেন এটা থাকলো, পাশাপাশি এক্সট্রা রেভিনিউ পাবেন। এই বেনিয়া বাণিজ্য নাটককে ধ্বংস করার প্রধান একটি মাধ্যম। তবে টিভি চ্যানেলগুলো চাইলে এটা রোধ করা সম্ভব।
আমাদের দেশের নির্মাতারা সিরিয়ালের ধারাবাহিকতা রক্ষায় ব্যর্থ কেন?
এটা পরিচালকদের দোষ নয়। আমাদের কাজের কোনো নীতিমালা নেই। কিছু নিয়ম করা হলেও শুধু পরিচালক বা প্রোডাকশনের লোক ছাড়া কেউ মানে না। আর্টিস্টরা নির্ধারিত সময়ের পর আসবে, আড্ডা দেবে, তারপর একটি শট দেবে। অথচ পরিচালকের মাথায় থাকে নির্ধারিত সময়ের মাঝে একটি বা দুটি কাজ শেষ করতে হবে। আর্টিস্টরা এমন করলে বাজেট-সময় মিলিয়ে ধারাবাহিকতা রাখা সম্ভব হবে কীভাবে!
অনেকের মতে, ওটিটি মানেই অশ্লীলতা থাকতে হবে। এ বিষয়ে আপনার মতামত জানতে চাই—
এই বিষয়টিতে আমি ভিন্নমত পোষণ করি। ওটিটি মানেই যে, অশ্লীল সংলাপ, দৃশ্য থাকতে হবে এমন না। আমাদের অনেক ভালো গল্প আছে, সেগুলো সঠিকভাবে তুলে ধরলে দর্শকরা কিন্তু হতাশ করেন না।
