আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বলিয়াছেন—‘থাকব না কো বদ্ধ ঘরে, দেখব এবার জগত্টাকে।’ তাই তো! জগেক না জানিলে কী করিয়া প্রকৃত জ্ঞান অর্জন করা সম্ভব হইবে? এই জন্য জগদিবখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং বলিয়াছেন—‘মাটির পানে নহে, নক্ষত্রপানে তাকাও। মহাবিশ্বের অস্তিত্ব লইয়া বিস্মিত হও, যাহা দেখো তাহা লইয়া ভাবো। কৌতূহলী হও!’ ঠিকই তো! কৌতূহলী না হইলে জ্ঞানের বিকাশ কী করিয়া হইবে? আমরা যদি ক্রিটিক্যালি দেখিতে, পড়িতে ও বুঝিতে না শিখি, তাহা হইলে আমাদের জ্ঞানের নদীতে সে াত বহিবে কী করিয়া? সুতরাং জগত্টাকে একটু ক্রিটিক্যালি দেখার চেষ্টা করা যাউক।
আমরা ইতিমধ্যে জানিয়াছি চন্দ্র, সূর্য ও গ্রহদের কথা। জানিয়াছি মহাবিশ্বের কথা। আমরা চাঁদে পা রাখিয়াছি, মঙ্গলে রোবট পাঠাইয়াছি, নভোযান ছুটাইয়াছি সূর্যের কাছাকাছি। সৌরজগতের শেষ সীমানা ছুঁইয়া আমাদের মহাকাশযান ছুটিয়া গিয়াছে অসীমপানে। ইহারা দিয়াছে কতশত বিস্ময়কর ছবি আর তথ্য! হাবল টেলিস্কোপের ছবি আমাদের অভিভূত করে, কৃত্রিম উপগ্রহের অত্যাধুনিক কাণ্ডকারখানা আর তথ্যপ্রযুক্তির সুবিধা আমাদের হতবিহ্বল করে। বলা যায়, জ্ঞানবিজ্ঞানের এক মহাবিপ্লব ঘটাইয়া দিয়াছি আমরা। এখন যদি কোনো এক জাদুবলে কয়েক শত বত্সর পূর্বের কোনো মানুষকে এই একুশ শতকে লইয়া আসা যাইত, তাহা হইলে সে নির্ঘাত মনে করিত—মানবজাতি জ্ঞানের শেষ সীমানায় পৌঁছাইয়া গিয়াছে। কী বিস্ময়কর এই বিজ্ঞান প্রযুক্তির দুনিয়া! আকাশে উড়া, হাজার হাজার মাইল দূরে থাকিয়াও ভিডিও কলে খোশগল্প করিবার বিচিত্র সকল প্রযুক্তির সুবিধা রূপকথার কল্পনার জগেকও হার মানায়।
কিন্তু এত বিশাল জ্ঞানপ্রযুক্তির বিস্ফোরণের মধ্যেও আমরা যে গভীরতর জ্ঞানবোধে কতখানি ক্ষুদ্র—,তাহা আমরা ভুলিয়াই যাই। সেই যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলিয়াছেন, দেখিতে গিয়াছি পর্বতমালা, দেখিতে গিয়াছি সিন্ধু।/দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া, ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া/একটি ধানের শীষের উপরে, একটি শিশির বিন্দু।’ আমরাও তেমনি অনেক কিছু দেখিয়াছি; কিন্তু চক্ষু মেলিয়া দেখি নাই আমাদের ভিতরকার শিশিরবিন্দু, আমাদের অস্তিত্ব, উত্সকে। মহামতি সক্রেটিস এই ক্ষেত্রে বলিয়াছেন, ‘সত্যিকারের জ্ঞান আমাদের সকলের নিকটই আসে, যখন আমরা বুঝিতে পারি যে আমরা আমাদের জীবন, আমাদের নিজেদের সম্পর্কে এবং আমাদের চারিপাশে যাহা কিছু আছে তাহার সম্পর্কে কত কম জানি।’ সক্রেটিসের এই কথার মতোই বলিতে হয়—আমরা অজ্ঞ। আমাদের জ্ঞানচক্ষু সামান্যই খুলিয়াছে। সিন্ধু লইয়া মাতিয়াছি; কিন্তু বিন্দুর কিছু জানি না। অনেক পুরাতন ভাবনা ইহা। গ্রিক দার্শনিক লুক্রেটিয়াস খ্রিষ্টপূর্ব প্রথম শতকে বলিয়াছিলেন, এই যে আমাদের চারিদিকের প্রকৃতি—চাঁদ, তারা, সূর্য, পৃথিবী, গাছপালা, পশুপাখি, মানুষজন—এই সকল কিছু আসিল কোথা হইতে? সবচাইতে বড় প্রশ্ন হইল—কে আমি? কোথা হইতে আসিয়াছি, কোথায় তাহার শেষ? আমাদের চারিপাশে যাহা দেখিতেছি তাহা কি সত্যি নাকি মিথ্যা? আত্মা কী? দেহের সহিত আত্মা বা মনের সম্পর্ক কী? আত্মা কী অমর? জ্ঞান কী? জ্ঞানের বিষয়বস্তু কী?
বিস্ময় হইল জ্ঞানের শুরু। সেই বিস্ময় ক্রিটিক্যাল দৃষ্টিতে না দেখিলে বুঝিতেই পারিব না, কেমন করিয়া একটি মাত্র কোষ হইতে আমরা প্রায় ৩০ হাজার বিলিয়ন কোষের পূর্ণাঙ্গ শরীরে পরিণত হই। বহিঃশত্রু হইতে কী করিয়া নিজেকে রক্ষা করে আমাদের শরীর! মস্তিষ্কের লক্ষ-কোটি নিউরন কোন জটিল ব্যবস্থাপনায় নিজেকে গঠিত করে এবং পরিচালিত করে শরীরের অতি জটিল সিস্টেমকে? আমরা জানি বটে কিছু কিছু; কিন্তু উহা যেন শরীরের জ্ঞানসমুদ্রে নুড়ি কুড়াইবার মতো জ্ঞান। এই শরীরজ্ঞানের গভীরতর জগতের ছোট্ট একটি কুয়ার মধ্যে বসিয়া ভাবিতেছি, আমরা বুঝি অনেক কিছুই জানি! অথচ আমরা ঐ কুয়ার একটি ব্যাঙ মাত্র। সুতরাং ‘নো দাইসেলফ’ কথাটি শুনিতে শুনিতে এখন অনেক ক্লিশে মনে হইলেও আমরা আসলে জানিই না আমাদের কী জানিতে হইবে। আর মৃত্যু? মৃত্যু-পরবর্তী জগত্? এই কৌতূহল উদ্ঘাটনের ইচ্ছা যেন তেঁতুল পাতার উপর বসিয়া একটি পিপীলিকার প্রশান্ত মহাসাগর পাড়ি দেওয়ার আকাঙ্ক্ষার মতোই। সুতরাং আত্মঅহমিকার কিছু নাই। উহা অজ্ঞতার নামান্তর।
