পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন

নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছাড়া বিকল্প নেই বিজেপির জন্য!

আপডেট : ১১ এপ্রিল ২০২১, ২১:৫১

তালেব রানা

 

ভারতে একই সময়ে চারটি রাজ্য ও একটি ইউনিয়ন টেরিটরি স্টেটে (কেন্দ্রশাসিত রাজ্যে) বিধানসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। কিন্তু এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচনা হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন নিয়ে। মোট আট ধাপে এই রাজ্যে ভোটগ্রহণ হবে। ২৯৪ আসনের মধ্যে এরই মধ্যে ১৩৫টি আসনে ভোটগ্রহণ শেষ হয়েছে। এসব আসনে তুলনামূলক ভোটও এবার বেশি পড়েছে। রাজনৈতিক নেতাদের বাগ্যুদ্ধের পাশাপাশি সহিংসতার মাত্রাও বেড়ে চলেছে। এরই মধ্যে নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতায় অন্তত ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। শেষ দফার ভোটগ্রহণ হবে ২৯ এপ্রিল। আগামী ২ মে সব রাজ্যের ভোটের ফল ঘোষণা করা হবে। অন্য রাজ্যের তুলনায় এবার পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনের উত্তাপ সবচেয়ে বেশি। কারণ এবার মূল লড়াইটা হচ্ছে রাজ্যের ক্ষমতাসীন দল তৃণমূল কংগ্রেস এবং কেন্দ্রের ক্ষমতাসীন দল বিজেপির মধ্যে।

তৃণমূল কংগ্রেসের নেতৃত্ব দিচ্ছেন রাস্তার লড়াকু নেত্রী মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। তিনি এবারও মুখ্যমন্ত্রী প্রার্থী। অন্যদিকে বিজেপি তাদের মুখ্যমন্ত্রী প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেনি। মমতা ব্যানার্জিকে ঠেকাতে মাঠে মূল নায়কের ভূমিকা পালন করছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নিজেই। আর তার সঙ্গে রয়েছেন বিজেপির সাবেক সভাপতি ও বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। ভারতে টানা দুইবার বিজেপির ক্ষমতায় আসার জন্য এই মোদি-অমিত জুটিকেই কৃতিত্ব দেওয়া হয়।

এই পশ্চিমবঙ্গ দীর্ঘ সময় ধরে বামদের ঘাঁটি ছিল। সেই বামদের সরিয়ে পরপর দুইবার ক্ষমতায় রয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। তৃতীয়বারের মতো ক্ষমতায় আসতে জোর চেষ্টা ও প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে দলটি। পশ্চিমবঙ্গে সর্বশেষ বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস ২১১টি বিধানসভা আসনে জয়লাভ করে। অন্যদিকে ২০১১ সালের নির্বাচনে বিজেপি একটি আসনও পায়নি। ২০১৬ সালে তারা পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভায় তিনটি আসনে জয়লাভ করে। কিন্তু ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে ৪২টি আসনের মধ্যে ১৮টিতে জয়লাভ করে। তারা মোট ভোটের ৪০ দশমিক ৬৪ শতাংশ ভোট পেয়েছে। এই সফলতা বিজেপিকে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে। তারা এবারের নির্বাচনে তাই সর্বশক্তি দিয়ে লড়ছে।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সব মিলিয়ে ৪০ দিনে পশ্চিমবঙ্গে ৩৪ নির্বাচনি সভা করবেন বলে জানা গেছে। আগামী বেশ কয়েকটি ধাপের নির্বাচনের দিনই পশ্চিমবঙ্গে প্রচারণা চালাবেন তিনি। ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি জেপি নাড্ডাও পশ্চিমবঙ্গ চষে বেড়াচ্ছেন। সব মিলিয়ে বিজেপি শীর্ষ নেতারা ১২০টির বেশি নির্বাচনি সভা করবেন। এছাড়া এরই মধ্যে তৃণমূল কংগ্রেসের বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা দলত্যাগ করে বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন। তারা এবার বিজেপির প্রার্থী হয়ে লড়ছেন। আর বিজেপিকে ঠেকাতে পালটা দিনে তিন থেকে চারটি করে জনসভা করছেন মমতাও।

দুই দফা নির্বাচনের পর জয়ের ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন মমতা ব্যানার্জি। অন্যদিকে নরেন্দ্র মোদি বলছেন, বিজেপিই পশ্চিমবঙ্গে সরকার গড়বে। সেই প্রত্যয় ব্যক্ত করে নতুন সরকারের জন্য এখন থেকেই রাজ্য সরকারি কর্মীদের কাজ শুরু করতে আহ্বান জানিয়েছেন।

যদিও টাইমস অব ইন্ডিয়ার এক খবরে বলা হয়েছে, মমতা ব্যানার্জিকে ক্ষমতা থেকে সরাতে হলে বিজেপির অবশ্যই এবারের নির্বাচনে ‘নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা’ পেতে হবে। কারণ বিজেপি সবচেয়ে বেশি আসন পাওয়ার পরও যদি ঝুলন্ত বিধানসভা হয় সেক্ষেত্রে বিজেপিকে বিরোধীদলই হতে হবে। কারণ জোট সরকার গড়ার জন্য তারা শরিকদল খুঁজে পাবে না।

খবরে বলা হয়েছে, এবার পশ্চিমবঙ্গে তিনটি সম্ভাবনা রয়েছে। হয় বিজেপি, না হয় তৃণমূল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে। নইলে ঝুলন্ত বিধানসভা হবে। যদি এই দুই দলের কেউ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় অর্থাত্ ১৪৭টির বেশি আসন পায়, তাহলে তাদের সরকার গড়তে কোনো সমস্যা হবে না। আবার ঝুলন্ত বিধানসভা হলে আর তৃণমূল সবচেয়ে বেশি আসন পেলে তাদের সরকার গড়তে সমস্যায় পড়তে হবে না। কারণ তারা সহজেই কংগ্রেস এবং বামদের সমর্থন পাবে সরকার গড়তে। কংগ্রেসের লোকসভা এমপি এবং পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সভাপতি অধীর রঞ্জন চৌধুরী এ ব্যাপারে এরই মধ্যে ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, রাজনীতিতে সব কিছুই সম্ভব। এ কারণে বিজেপি তৃণমূলের মতো সুবিধাজনক অবস্থানে নেই। কংগ্রেস ও বামদের পক্ষ থেকে বিজেপির এ সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনা নেই।

২০১৮ সালে কর্ণাটকে ঝুলন্ত বিধানসভা হয়। ২২২ আসনের মধ্যে বিজেপি ১০৪টি আসন পায়। আর কংগ্রেস ৭৮টি এবং জেডি (এস) ৩৭টি আসন পায়। রাজ্যের গভর্নর বিজেপির বিএস ইয়েদুরাপ্পাকে সরকার গঠনের জন্য আমন্ত্রণ জানায়। কিন্তু তিনি বিধানসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণে ব্যর্থ হন। পরবর্তী সময় কংগ্রেসের সমর্থন নিয়ে জেডি (এস) এর এইচডি কুমারাস্বামী সরকার গঠন করেন।

একই অবস্থা হয়েছিল ১৯৯৬ সালে লোকসভায়। ঝুলন্ত পার্লামেন্টে বিজেপি সবচেয়ে বেশি ১৬১ আসন পায়। অন্যদিকে কংগ্রেস পেয়েছিল ১৪০টি। অটল বিহারী বাজপেয়ী সরকার গঠন করেন। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ এমপির সমর্থন না থাকায় তিনি ফ্লোর টেস্টের আগেই পদত্যাগ করেন। তাই সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জিততে না পারলে পশ্চিমবঙ্গেও বিজেপির একই দশা হতে পারে।