বিশ্বপ্রবাহ ডেস্ক
মিয়ানমারে ১ ফেব্রুয়ারি সামরিক অভ্যুত্থানের পর দেশটি বিক্ষোভে উত্তাল রয়েছে। প্রত্যেক দিনই সেখানে কোনো না কোনো শহরে বিক্ষোভ হয়েছে। এ পর্যন্ত ৬ শতাধিক বিক্ষোভকারী নিহত এবং ৩ হাজার লোক আটক হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র দেশটির ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। বহির্বিশ্ব থেকে ক্রমেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে মিয়ানমার। এসব কিছুর পরও নমনীয় হয়নি সামরিক জান্তা। বিষয়টি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠতে পারে।
পর্যবেক্ষক সংস্থা অ্যাসিস্টেন্স অ্যাসোসিয়েশন ফর পলিটিক্যাল প্রিজনারসের দেওয়া তথ্য মতে ৮ এপ্রিল পর্যন্ত ৬১৪ জন বিক্ষোভকারী নিহত এবং ২ হাজার ৮৫৭ জন আটক হয়েছে। টাপমাটো নামে পরিচিত মিয়ানমারের সেনাবাহিনী এখনো পর্যন্ত আন্তর্জাতিক চাপের কাছে নতি স্বীকার না করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। শহরে নগরে ছড়িয়ে পড়া এই বিক্ষোভে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে সশস্ত্র জাতিগোষ্ঠীগুলো। সারাদেশে এরকম অন্তত ২০টি সশস্ত্র জাতিগোষ্ঠী রয়েছে। মিয়ানমারে নিযুক্ত জতিসংঘের বিশেষ দূত সম্প্রতি সতর্ক করে ?দিয়ে বলেছেন পরিস্থিতি গৃহযুদ্ধের দিকে গড়াতে পারে। বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ মিয়ানমারে স্বাধীনতার পর বহুবার জাতিগত সংঘাতে জড়িয়েছে।
সশস্ত্র গ্রুপগুলোর দাবি তারা নিজ নিজ জাতিগোষ্ঠীগুলোর প্রতিনিধিত্ব করে। সীমান্ত অঞ্চল জুড়ে এসব জাতিগোষ্ঠীর অবস্থান। বেশিরভাগ অঞ্চলই স্বায়ত্তশাসিত। পর্যবেক্ষকদের মতে বেশিরভাগ সশস্ত্র গোষ্ঠীতেই জোরপূর্বক যোদ্ধা নিয়োগ করা হয়ে থাকে। অনেক গ্রুপেই শিশুযোদ্ধাও রয়েছে। মাদক চোরাচালানই মূলত গোষ্ঠীগুলোর রাজস্ব আয়ের প্রধান উত্স। সশস্ত্র গ্রুপগুলো ইএও (এথনিক আর্মড অর্গানাইজেশন) নামেও পরিচিত। যুগ যুগ ধরে ইএওগুলো বিশেষ রকম স্বাধীনতা ভোগ করে এসেছে, যাদের ওপর কেন্দ্রীয় সরকারের তেমন নিয়ন্ত্রণ নেই। বর্তমান পরিস্থিতিকে সেনাবাহিনী ইএওগুলোর ক্ষমতা খর্ব করার সুযোগ হিসাবে কাজে লাগাতে পারে। অং সুচির নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি) ক্ষমতায় থাকার সময় জাতিগোষ্ঠীগুলোর বিষয়ে সংস্কার কর্মসূচি গ্রহণ করে নাই বা করলেও অত্যন্ত ধীরগতিতে করেছে। ফলে দীর্ঘদিনের পুরোনো সমস্যাটি ঝুলেই থাকে। এনএলডির সঙ্গে ইএওর সম্পর্ক ভালো ছিল। ২০২০ সালের নভেম্বরে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনেও ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীগুলো দলটিকে ব্যাপকভাবে ভোট দিয়েছে। কারণ তারা জান্তা সরাসরি শাসনামলে ব্যাপক দমন পীড়নের শিকার হয়েছিল। ইএওগুলোর মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী কারেন ন্যাশনাল ইউনিয়ন (কেএনইউ)। ২০১৫ সালে কেএনইউ-এর সঙ্গে এনএলডি সরকারের একটি অস্ত্রবিরতি চুক্তি হয় যা ন্যাশনওয়াইড সিজফায়ার অ্যাগ্রিমেন্ট (এনসিএ) নামে পরিচিত। চুক্তি হওয়ার পরও এর বাস্তবায়নে সরকারকে তত্পর হতে দেখা যায়নি। আরেকটা প্রভাবশালী ইএও ইউনাইটেড ওয়া স্টেট আর্মি (ইউ ডব্লিউ এস এ) এই সময়ের মধ্যে চীনের কাছ থেকে গোপনে প্রচুর অস্ত্রশস্ত্র পেয়েছে। চীন সরকারিভাবে এ সহায়তা করেনি। বরং চীনের ইউনান প্রদেশে তত্পর ইউ ডব্লিউএস এর মাধ্যমে অস্ত্র তাদের হস্তগত হয়। গ্রুপটি ফেব্রুয়ারির অভ্যুত্থানের পরও খুব একটা উচ্চবাচ্চ্য করেনি। ধারণা করা হচ্ছে চীনের ইঙ্গিতে তারা নীরব রয়েছে।
সর্বশেষ অভ্যুত্থানের পর ইএওগুলোর সঙ্গে সেনাবাহিনীর সাবেক স্থিতাবস্থা বদলে যেতে পারে। কারণ সেনাবাহিনী সঙ্গত কারণেই ইএও-এর ওপর নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে চাইবে। ১ ফেব্রুয়ারি রক্তপাতহীন অভ্যুত্থানের মাধ্যমে মিয়ানমারের ক্ষমতা দখল করে দেশটির সেনাবাহিনী। এর পর থেকেই জান্তা সরকারের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ অব্যাহত রেখেছে দেশটির জনগণ। ইতিমধ্যে বিক্ষোভে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে অন্তত ৬০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছে।
এদিকে ৯ এপ্রিল প্রথমবারের মতো মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ক্ষমতা হস্তান্তরের সম্ভাব্য সময়সীমা ঘোষণা করে বলে আগামী দুই বছরের মধ্যে নির্বাচিত সরকারের কাছে এটি করা হবে। সেনাবাহিনীর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জ মিন তুন এ কথা বলেন। তিনি জানান, শিগিগরই খুলে দেওয়া হবে ব্যাংকগুলো। তিনি আরো বলেন, জরুরি অবস্থা আরো দীর্ঘায়িত হতে পারে। দায়িত্ব যদি শেষ না হয়, সেক্ষেত্রে জরুরি অবস্থা ছয় মাস বা প্রয়োজনে আরো বাড়ানো হবে। সর্বশেষ শনিবার সেনাবাহিনী ইয়াঙ্গনের নিকটবর্তী বাগো শহরে ৮০ জনের বেশি বিক্ষোভকারীকে হত্যা করে বলে পর্যবেক্ষক গ্রুপ অ্যাসিস্ট্যান্স অ্যাসোসিয়েশন ফর পলিটিকাল প্রিজনার্স জানায়। এর ফলে ক্ষমতা হস্তান্তরে জান্তার সময়সীমা ঘোষণাকে প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
