আত্মোপলব্ধি করিতে হইবে—আমরা কারা?

আপডেট : ১১ এপ্রিল ২০২১, ২২:১০

নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী অ্যারনা সোলব্যার্গ দেশটির করোনা-বিধি অমান্য করিয়াছেন বিধায় পুলিশ তাহাকে ২০ হাজার নরওয়েজিয়ান ক্রোন জরিমানা করিয়াছে। কয়েক দিন পূর্বে খবরটি প্রকাশের পরপরই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকেই সোত্সাহে বলিয়াছেন, ‘দেখো দেখো—ইহাকেই বলে আইনের শাসন!’

ইহা ঠিক যে, নিয়ম তো নিয়মই। উহা মানাটাই দস্তুর। কিন্তু সকল কিছুর দৃষ্টান্ত প্রদানের ক্ষেত্রে আমরা যেন ভিনদেশের দিকে তাকাইয়া থাকি। যেন আমাদের নিজেদের বলিয়া কিছু নাই। অথচ বাস্তবিক অর্থে জগতের সকল কিছুই নিজস্ব বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী পরিচালিত হয়। একবার একজন শৌখিন ব্যক্তি স্ক্যানডিনেভিয়ান দেশ হইতে খুব সুন্দর একটি ফুলগাছের বীজ কিনিয়া আনিলেন। ঐ ফুল নরওয়েতে গ্রীষ্মকালে সন্ধ্যার সময় ফোটে। দেখা গেল সেই ফুল বাংলাদেশে ফুটিতেছে না। কেন ফুটিতেছে না? বাংলাদেশের দোষ কোথায়? জানা গেল, নরওয়েতে গ্রীষ্মকালে সন্ধ্যা হয় রাত ১১টার সময়। ফুলগাছটিতে ফুল ফুটিবার জন্য ২০ ঘণ্টার সূর্যালোক লাগে। এই পরিবেশ বাংলাদেশে কোথায়? অন্যদিকে বাংলাদেশের অনেক সুন্দর বৃক্ষরাজি স্ক্যানডিনেভিয়ান দেশে বাঁচিবেই না। তাহার মানে কি এই যে, ঐ গাছের কোনো মূল্য নাই? সেই যে ইশপের গল্পে একটি চালাক শিয়ালের লেজ কাটা গিয়াছিল বলিয়া সে ঘোষণা করিল—লেজ অতি বিচ্ছিরি জিনিস, উহা শরীরকে নোংরা করে, দেখিতেও যাচ্ছেতাই। অর্থাত্ কিছু ব্যাপার থাকে পরিবেশের স্বকীয়তা দ্বারা নির্ধারিত। আর কিছু ব্যাপার থাকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। কিন্তু কোনো ক্ষেত্রেই আমরা নিশ্চিত করিয়া বলিতে পারি না—বিষয়টি সকলের জন্য প্রযোজ্য।

আরো স্পষ্ট একটি উদাহরণ দেওয়া যাউক। একটি পুকুরে যদি বেশ কিছুসংখ্যক সাদা ও কালো রাজহাঁস ছাড়িয়া দেওয়া হয়, দেখা যাইবে, সাদা ও কালো রাজহাঁস পরস্পর হইতে দূরে থাকিয়া নিজেদের মতো দল বাঁধিয়া বিচরণ করিতেছে। অর্থাত্ উহারাও নিজেদের স্বকীয়তা দ্বারা পরিচালিত। অর্থাত্ প্রকৃতিই আমাদের শিক্ষা দেয় যে, আমরা ভিনদেশিদের মতো নহি, তাহারাও আমাদের মতো নহে। কিন্তু আমরা খারাপ, তাহারাই কেবল ভালো—ইহাও সর্বক্ষেত্রে প্রযোজ্য নহে। সুতরাং আমাদেরই ঠিক করিতে হইবে আমরা কী করিব। ঢাকায় তো এখন ইউরোপের দামি ব্র্যান্ডের চুলদাড়ি কাটিবারও সেলুন রহিয়াছে। অনেকেই সেইখানে গিয়া চুল কাটিবার বাহিরে অন্য কোথাও নরসুন্দরের নিকট যাইবার কথা ভাবিতেও পারেন না। অথচ দেখা যাইবে এক-দুই প্রজন্ম পূর্বেও মফস্সলের কোনো এক কাঁঠালগাছের নিচে ইটের উপর বসিয়া তাহাদের পিতৃপুরুষ চুলদাড়ি কাটিয়াছে। মনে রাখিতে হইবে, আমাদের অনেক কিছুই রহিয়াছে আমাদের মতো করিয়া। কিন্তু আমরা হাঁস হইয়া শজারুর অর্ধেক শরীরে প্রোথিত করিয়া সুকুমার রায়ের খিচুড়ি ছড়ার মতো ‘হাঁসজারু’ হইয়াছি। এই কারণে অনেকেই মনে করেন, তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলি এক অর্থে নিজেদের চিনিতে পারিল না। দেখা যায় যে, আমাদের সকল কিছুই কোথাও না কোথাও হইতে ধার করিয়া আনা। এমনকি নিয়ম পালনের উদাহরণও আমাদের বিদেশ হইতে ধার করিতে হয়। দেখা যাইতেছে আমাদের নেতারাও কেমন হইবে, তাহার ডেফিনেশনটিও পশ্চিমা বই হইতে পড়িয়া জানিতে হয়। অর্থাত্ নেতা আমাদের কিন্তু তাহা তৈরি হইবে অন্যদের সংজ্ঞা অনুযায়ী। আমরা বরং ভাবিয়া দেখিতে পারি, তৃতীয় বিশ্বে যেই সকল নেতা আছেন, তাহারা ডেফিনেশন অনুযায়ী নেতা হইবার যোগ্য কি না।

এইরকম অনেক উদাহরণই দেওয়া যায়। এমনকি বই পড়িবার সময়ও আমরা লেখকের সহিত দ্বিমত পোষণ করিতে পারি না। এইখানেও নষ্ট হইয়া যাইতেছে আমাদের নিজস্বতা। বইয়ে মুদ্রিত সকল কথা বিনা বাক্যে মানিয়া লইয়া বিনা প্রশ্নে আমরা কেবল মুখস্থ করিতে শিখিয়াছি। কিন্তু আমরা যদি ক্রিটিক্যালি পড়িতাম তাহা হইলে সম্যকভাবে বিষয়বস্তুর গভীরে প্রবেশ করিতে পারিতাম। তখন নকল দূরের কথা, মুখস্থ করিবারও প্রয়োজন পড়িত না। সুতরাং আত্মোপলব্ধি করিতে হইবে—আমরা কে?